স্মৃতিতিয়াস

ডাকপিয়ন ও চিঠি লেখার দিনগুলো

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

অলোক আচার্য

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কত কিছুই হারিয়ে যায়। হারানোর তালিকায় মানুষ নিজেই। সভ্যতার সূচনালগ্নে মানুষের কাছে যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু তখনো বিজ্ঞানের উত্তরণ শুরু হয়নি। যোগাযোগের জন্য মানুষ কত পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। কবুতরও ছিল যোগাযোগের মাধ্যম। এভাবে প্রতিনিয়তই মানুষ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করেছে। একসময় আসে চিঠির যুগ। হাতে লেখা চিঠি। মানুষের আবেগ প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ডাকবাক্স, ডাকঘর, ডাকপিয়ন বা ডাকহরকরা এবং তাদের বিলি করা চিঠি এস শব্দ আজকের যুগে খুব প্রয়োজনীয় না হলেও একসময় মানুষের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। দিনের পর দিন অপেক্ষা করে থেকেছে ডাকপিয়নের জন্য। তার সাইকেলের শব্দের জন্য। একটি এলাকায় সবচেয়ে পরিচিত ছিল এসব ডাকাপিয়নরা।

এ যুগের ছেলেমেয়েরা হয়তো এসব শব্দের সঙ্গে খুব পরিচিত না। পরিচিত হওয়ারও কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। জন্মের পরপরই যে শিশু মোবাইল, ট্যাব হাতে খেলনা নিয়ে বড় হয়, তার ডাক সম্পর্কে জানারও কথা নয়। যোগাযোগের জন্য ডাক আজ পুরাতন পদ্ধতি। কারণ এ যুগটাই আমাদের এসব শব্দ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। যুগটা যে বিজ্ঞানের। আধুনিকতার আলোতে পুরাতন সব স্মৃতিতে ঠাঁই নিয়েছে। তাই এসব আমাদের কাছে শুধুই স্মৃতি। কত শত মধুর স্মৃতি কতজনের আছে এই ডাকবাক্সকে কেন্দ্র করে তার হিসাব নেই। প্রেম, ভালোবাসা, বিরহ, কষ্টÑ এসব প্রকাশ পেত একমাত্র চিঠিতে। কালের অতল গভীরে হারিয়ে যেতে যেতে আজ প্রায় বিলিন হয়েছে। এখন ডাকপিয়নের সাইকেলের বেলের টুংটাং শব্দ হরহামেশাই শোনা যায় না। আগে যেমন পাড়ায় পাড়ায় প্রায় প্রতিদিনই কারো না কারো চিঠি বা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ছুটত সেগুলো বিলি করার জন্য, আজ আর তেমনটা চোখে পড়ে না। আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির কাছে হার মেনেছে সব। এটাই নিয়ম।

প্রকৃতি কেবল নতুন কিছু গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকে। অতীত থাকে বইয়ের পাতায়, স্মৃতির মণিকোঠায়। আধুনিক প্রজন্মে বেড়ে ওঠা অনেকের কাছে হয়তো ডাকপিয়ন শব্দটি কেবল বইয়ের পাতায়ই পড়েছে। বাস্তবে দেখেছে কি না সন্দেহ! আমরা যখন বড় হয়েছি তখন ‘রানার’ কবিতাটি পাঠ্য ছিল। এখনো নবম-দশম শ্রেণিতে আছে। রানার কে, রানারের দায়িত্ব কী ছিল, তা নিয়েই সুন্দর এই কবিতাখানি। এতই চমৎকার কবিতার বর্ণনা যে, চোখ বুজলেই আমি রানারকে দেখতে পেতাম। তার এক হাতে খবরের বোঝা ও অন্য হাতে তার লাঠি দেখতে পেতাম। চোখজুড়ে ব্যস্ততা। ঠিক সময়ে পৌঁছানোর ব্যস্ততা।

কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা এই কবিতার শুরুতে রয়েছেÑ ‘রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে/ রানার চলেছে, খবরের বোঝা হাতে/ রানার চলেছে রানার!/ রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার/ দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার-/কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার। রানার কবিতার কেবল এই কয়েক লাইন পড়লেই বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে রানারের কাজ বা কঠোর দায়িত্ববোধ। ডাকব্যবস্থার শুরুর পর বহু দিন রানাররা এভাবেই মানুষের অতি দরকারি, মহামূল্যবান খবরাখবর মানুষের কাছে পৌঁছে দিত। রাত জেগে সারা রাত ছুটে সেই খবর সে মানুষের জন্য বহন করে আনত। রানারের গুরুত্ব তাই অপরিসীম। যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল হাতে লেখা চিঠি। হাতে লেখা চিঠির জায়গায় আজ মোবাইলের মেসেজ, ম্যাসেঞ্জার, ই-মেইল বা কুরিয়ার স্থান দখল করে নিয়েছে। স্থান পরিবর্তনই প্রকৃতির নিয়ম। তবে এ কথা বলতে পারি চিঠিতে যে, আবেগ জড়ানো থাকে আজকের আধুনিক সরঞ্জামে বহন করা ডিজিটল সেই খবরে এত আবেগ জড়িয়ে থাকে না। থাকা সম্ভব না। কাগজের বই যে আবেগ বা ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে, ই-বুক দিয়ে কি সেই আবেগ প্রকাশ করা সম্ভব? একটি চিঠি লিখতে একজন প্রেমিক বা প্রেমিকার বা নববধূর যে সময়, যে শ্রম ব্যয় হতো আজ তার কিছুই হয় না। অনেকেই তার প্রিয়জনের কাছ থেকে প্রথম পাওয়া চিঠির কথা আজও মনে রেখেছে নিশ্চয়ই। এক চিঠির ভাঁজ খুলে বারবার করে পড়েছে অনেকেই। তারপর সযতনে সেই চিঠি নিজের কাছে গচ্ছিত রেখেছে। একটি চিঠি কেবল আবেগের বিষয়ই ছিল না। একটি চিঠিতে শেখার মতো অনেক কিছুও ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যক্তির হাতের লেখা এবং শব্দ ও ভাষার প্রয়োগ। ছেলে যদি বাবার কাছে চিঠি লিখত তাহলেও চিঠির যথাযথ নিয়ম মেনেই লিখত। এতে তার যোগাযোগের সঙ্গে সঙ্গে লেখাপড়ার কাজটিও অনায়াসেই হতো। আজ যেমন মোবাইলে ফোন করে অনায়াসেই বলে দেওয়া যায়, তখন তা চিঠির মাধ্যমে জানাতে হতো। যে চিঠি লিখত, সে সব সময় চাইত তার হাতের লেখা যেন যতটা সম্ভব সুন্দর হয়। কারণ সেটি কেউ পড়বে, এই চিন্তা থাকত তার মাথার ভেতর। আজ মেসেজে দু-চার লাইনে যা জানানো যায়, চিঠিতে সেই দু-চার লাইনে কিছুই প্রকাশ করা হতো না। ফলে চিঠি লিখতে গিয়ে অনেকেই অনেক কিছু শিখতে পেরেছে।

প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন থেকেও সেসব দিন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। একসময় হয়তো এইদিনের গল্প বলার জন্য কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। গল্প শোনার জন্যও কেউ থাকবে না। ব্যস্ততা যেভাবে মানুষের সময় গ্রাস করছে, তাতে অতীত নিয়ে স্মৃতিচারণ করা বোকামি। প্রতি বছর ডাক দিবস পালন করা হয়। একটি দিবস দিয়ে সেই দিবসের সবকিছু বোঝানো সম্ভব নয়। তবু ডাক দিবসের কথা মনে হলেই ওপরের শব্দ কটির কথা মনে পড়ে। ডাকদিবসের কথা মনে হলেই ডাকপিয়নের কথা মনে হয়। সাইকেলের টুংটাং শব্দ মনে হয়। সেই শব্দে বুকের মাঝে যে প্রশান্তি বয়ে যেত, সেই শান্তির কথা মনে হয়। চিঠির সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। প্রথমে যতœ করে চিঠি লেখা, তারপর সেই চিঠি হলুদ রঙের খামে ভরে ডাকঘরে যাওয়া এবং তারপর সেই চিঠি ডাকবাক্সে ফেলা। এরপর অপেক্ষা করা। অপেক্ষা করাও যে একধরনের আনন্দ, প্রতীক্ষার মিশ্র অনুভূতি দিতে পারে তা চিঠি না এলে বোঝা যাবে না। এ কথা স্বীকার করি যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ার ফলে মানুষের বহুবিধ উপকার সাধিত হয়েছে। আমরাও সে সুবিধা নিচ্ছি। আমাদের এগিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তাছাড়া আজকাল মানুষের কর্মব্যস্ততাও বেড়েছে। আমাদের চিঠি লেখার মতো সময়েরও আজ অনেক অভাব। এত সময় নিয়ে চিঠি লেখার চেয়ে কয়েক সেকেন্ডে সেটা মোবাইলে বলে দেওয়া যায়। এতে দুই পক্ষের কারো অপেক্ষা করতে হয় না। পেছনে ফেরার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। এত সময় নিয়ে, এত ধৈর্য নিয়ে চিঠি লেখা এবং তা ডাকবাক্সে ফেলার মতো সময়ও হয়তো মানুষের নেই। তাই চট করে অতি সংক্ষেপে মেসেজে জানিয়ে রাখাই উত্তম মনে করে। তাহলেও এত স্মৃতি যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তা টিকে থাক আজন্মকাল। সে লক্ষ্যে ডাক পরিসেবার মান ও কার্যপরিধি বৃদ্ধি করে ও এটি আধুনিকায়ন করে যুগোপযুগী করে গড়ে তোলা হোক, যাতে তা আধুনিকায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে পারে। বহু বছর পরেও যেন আমরা সেদিনের কথা মনে করে শান্তি পেতে পারি।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

[email protected]

"