মুক্তমত

অকালমৃত্যুর দায় কার

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর রোডের ফজর আলী মাতবরের বস্তি নামের একটি বস্তির পাশে প্রতিদিনই বেলুন বিক্রি করতে আসতেন মৃত্যুর ফেরিওয়ালা আবু সাঈদ। অন্যান্য দিনের মতো ৩০ অক্টোবর বিকালে বেলুন বিক্রি করতে এসেছিলেন তিনি। বেলুন ফোলানোর জন্য সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন একটি গ্যাস সিলিন্ডার। গ্যাস বেলুন কেনার জন্য তাকে ঘিরে ছিল ওই বস্তি ও এর আশপাশের ২০-২৫ জন শিশু। তাদের বয়স ৬ থেকে ৯ বছরের মধ্যে। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে আকস্মিক বিকট শব্দে বিস্ফোরণে ফেটে যায় গ্যাস সিলিন্ডারটি। আকাশের দিকে ওঠে যায় ধোঁয়া আর নিচে শিশুদের রক্তে ভেসে যায় রাস্তা। বেলুনের সুতা হাত ফসকে গেলে যেভাবে উড়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে; তেমনি শিশুগুলোও যেন গ্যাস বেলুনের মতো উড়ে গেল একেবারে নাগালের বাইরে। অকালে ও চিরদিনের মতো স্তব্ধ হয়ে গেলে ওই শিশুদের কোমল-নিষ্পাপ মুখগুলো।

বেলুনওয়ালার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এমন মর্ম¯পর্শী ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিভাবে প্রাণ হারিয়েছে পাঁচ শিশু। হাসপাতালে মারা গেছে আরো দুজন। নিহতরা হলো রমজান (৮), নূপুর (৭), শাহীন (৯), ফারজানা (৬), ফরহাদ হোসেন রুবেল (৯) ও রিয়ামনি (১০) ও নিহাদ (৮)। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে জামিলা (৮), অজুফা (৭), তানিয়া (৭), মিম (৮), মুরসালিনা (১১), রাকিব (১২), জনি (৯), মোস্তাকিন (৭), সিয়াম (১১), বায়েজিদ (৫), জান্নাত (২৬), জুয়েল (২৯), সোহেল (২৫) এবং পাঁচ বছর বয়সি নাম না জানা আরো এক শিশু।

দেশে গ্যাস বেলুনের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এবারই প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। নিরাপদ হিলিয়ামের পরিবর্তে ‘নিষিদ্ধ’ হাইড্রোজেন ব্যবহারের কারণে বছরের পর বছর ঘটছে গ্যাস বেলুনের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। এতে বাড়ছে শিশুর প্রাণহানিও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আজ থেকে আনুমানিক ২০০ বছর আগে বিশ্বের অন্যান্য দেশে হাইড্রোজেন দিয়ে বেলুন ফোলানোর ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। হিলিয়াম আবিষ্কারের পর নিরাপদ এই গ্যাস দিয়েই তারা বেলুন ফোলায়। অথচ বিশে^ বন্ধ হওয়ার ২০০ বছর পরও আমাদের দেশে ‘নিষিদ্ধ’ হাইড্রোজেন ব্যবহার করেই বেলুন ফোলানো হচ্ছে। এটি বন্ধ করার ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ আজও দেখা যায়নি। বরং দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাস বেলুনের নামে মৃত্যুর ফেরিওয়ালারা যেন প্রতিনিয়তই মৃত্যু ফেরি করে বেড়াচ্ছে!

দেশের বিভিন্ন খাতে গ্যাসের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কাজ করে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কো¤পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয় ও বিপণনের ক্ষেত্রে প্রধান বিস্ফোরক কর্মকর্তার দফতর থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। গ্যাস বেলুনে যে গ্যাস (হাইড্রোজেন) ব্যবহৃত হয়, তা বিভিন্ন রাসায়নিকের সংমিশ্রণে তৈরি। গ্যাস সিলিন্ডারের ভেতরে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সৃষ্ট হাইড্রোজেন গ্যাস দিয়ে ফোলানো হয় বেলুন। সব ক্ষেত্রেই বেলুন ফোলাতে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই করেন এসব বেলুন বিক্রেতারাই। রাসায়নিক সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান পর্যন্ত নেই। আইনে এভাবে গ্যাস তৈরি এবং তা বেলুনে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষেধ। তবু দেশের প্রায় সব এলাকাতেই আইন অমান্য করে যত্রতত্র ঝুঁকি নিয়ে এসব গ্যাস তৈরি করা হচ্ছে। এসব গ্যাস তৈরি, বিপণন ও বেলুনে ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কোনো পর্যায়ের কোনো কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে প্রতি বছরই বাড়ছে গ্যাস বেলুন ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মৃত্যুর মিছিল। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার শিশু।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, রাজধানীর রূপনগরে যে গ্যাস বিস্ফোরণ হয়েছে; সেটা বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত সিলিন্ডার গ্যাস বা যানবাহনে ব্যবহৃত গ্যাস নয়। এটা হাইড্রোজেন গ্যাস এবং দেশে এ গ্যাস ব্যবহারের কোনো অনুমতি নেই। অনুমতিহীন এসব গ্যাস দেশের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি করা হচ্ছে ব্যক্তি উদ্যোগে। একশ্রেণির কারবারিরা রাসায়নিক মিশিয়ে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করে দেশের সর্বত্র গ্যাস বেলুনের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে পুলিশের নাকের ডগায় অবৈধ এসব কারবার চলছেও পুলিশ আইনানুগ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যদিও এ ব্যাপারে বিস্ফোরক অধিদফতরের নির্দেশনা রয়েছে। বিস্ফোরক অধিদফতর পুলিশ প্রশাসনকে অসংখ্যবার চিঠি দিয়ে সতর্ক করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপাদনে অনেক প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হয়। কিন্তু যারা বেলুনে এ গ্যাস ব্যবহার করে তারা এলাকাভিত্তিক। বিভিন্ন এলাকায় শুধু অ্যাসিড এবং অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন ধাতু মিশিয়ে তারা হাইড্রোজেন গ্যাস বানায়। এগুলো আগুনের সংস্পর্শে এলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়।

বর্তমানে সারা বছর দেশের সর্বত্র বেলুন গ্যাসের অবাধ ব্যবহার চলছে। এ জন্য দুর্ঘটনাও রোধ করা যাচ্ছে না। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শেখদি বটতলা গুটিবাড়ীর একটি টিনশেড বাসায় গ্যাস বেলুন কারখানায় বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই দুজন মারা যায়। মার্চ মাসে রাজধানীর মিরপুর এক নম্বরের ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে বেলুনে গ্যাস ভরার সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বেলুন বিক্রেতা মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনায় আট খুদে শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। এপ্রিল মাসে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদে আয়োজিত উন্নয়ন মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে শিশু শিক্ষার্থীসহ ছয়জন আহত হয়। রাজধানীতে ছাত্রলীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত র‌্যালিতে যোগ দিতে যাওয়ার সময় ফার্মগেট এলাকায় বাসের মধ্যে গ্যাস বেলুন বিস্ফোরণে ১০ জন অগ্নিদগ্ধ হন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। ঘটনাগুলো ঘটার পর কিছুদিন এ নিয়ে মিডিয়া, প্রশাসন, কর্তৃপক্ষ সরগরম থাকলেও ধীরে ধীরে সব আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে। আবারও দুর্ঘটনা, আবারও সরগরম এ সাপলুডু খেলা চলে আসছে। এ খেলার যেন শেষ নেই। তবে এ থেকে পরিত্রাণের উপায় যে নেই, তা নয়। বেলুন ফোলানোতে হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার অত্যন্ত নিরাপদ। এতে বিপদের আশঙ্কা বা ঝুঁকি থাকে না। হিলিয়াম গ্যাসের মূল্য বেশি হওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা কম পুঁজিতে অধিক লাভের আশায় হাইড্রোজেন গ্যাস ব্যবহার করে থাকেন। এসব ব্যবসায়ীর কাছে জীবনের মূল্য থেকে নিজের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার দিকে শকুনে দৃষ্টি বেশি। বেলুন বিক্রেতারা নিজেরাই এসব হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করছে নিজেদের জানমালের মারাত্মক ঝুঁকি নিয়েই। ফলে বিস্ফোরণ ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কোনোভাবেই এড়ানো যাচ্ছে না।

রূপনগরের ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান পরিদর্শক সামসুল আলম গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে নিজের অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘এটি আসলে সিলিন্ডার নয়, গ্যাস প্রডিউসিং রিয়েক্টর। গ্যাস সিলিন্ডরকে মডিফাই করে সিলিন্ডারের ভেতরেই হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করার পদ্ধতি বানিয়েছে। সিলিন্ডারের ভেতরে কস্টিক সোডা ও অ্যালুমিনিয়াম পাউডার দিয়ে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করতে থাকে। এর সাহায্যে বেলুন ফোলাতে থাকে। এরমধ্যে কিছুক্ষণ ফোলানোর পরে কোনো কাস্টমার না থাকলে সাধারণত সিলিন্ডারের নবটি বন্ধ করে রাখে। এ সময়ের মধ্যে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি হতে থাকে। এতে সিলিন্ডারের ওপর গ্যাসের চাপ বাড়তে থাকে। আর তাতে ভেতরে ক্ষয় হতে থাকে। একপর্যায়ে গ্যাসের চাপ বেশি বেড়ে গেলে সিলিন্ডারটি গরম হয়ে নরম হয়ে যায়। এই অবস্থা যখন আবার বেলুনে গ্যাস ভরার জন্য নব খোলা হয়, তখনই বিস্ফোরণ ঘটে।’

এখন প্রশ্ন হলোÑ এই ধরনের রিঅ্যাক্টর একেবারে নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে দেশের কোথাও কোনো অভিযান চালানো হচ্ছে না কেন? এ ধরনের সিলিন্ডার যার কাছে পাবে তাকেই পুলিশের ধরা উচিত, কিন্তু তারা কি ধরা পড়ছে? দেশের আইন অনুযায়ী কোনো কারখানায় হাইড্রোজেন তৈরি হলে সিলিন্ডারে ভরে তা সরবরাহ করতে হবে। সিলিন্ডার থেকে বেলুন ফোলাবে। তারা তা না করে সরাসরি সিলিন্ডারের ভেতরেই হাইড্রোজেন তৈরি করে বেলুন ফোলানোর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজর নেই কেন? বারবার দেশে বিস্ফোরণে মানুষ মারা যাওয়ার পরও কর্তৃপক্ষ কেন কুম্ভুকর্ণের ঘুমে? দেশের সাধারণ মানুষের জীবন-সম্পদ ক্ষয়ক্ষতির দায় কার?

এখনো সময় আছে। আর কোনো প্রাণহানির আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাস বেলুনের নামে মৃত্যুও ফেরি করে বেড়ানো কারবারিদের লাগাম বা রাশ টেনে ধরা জরুরি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্যাস তৈরির কারখানাগুলো খুঁজে বের করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। এ ছাড়া দেশের সর্বত্র এ ধরনের বেলুন বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করাও এখন সময়ের দাবি।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

"