বিশ্লেষণ

কলঙ্কিত সেই নৃশংস জেলহত্যা-কাণ্ড

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ডা. এস এ মালেক

ভয়াবহ, মর্মান্তিক, নৃশংস, বর্বরোচিত জেলহত্যাকান্ড ঘটেছিল ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবারবর্গ ও নিকটাত্মীয় স্বজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ৮০ দিন পরে বিশ্বমানবতার ইতিহাসকে কলঙ্কিত করে, জেলখানায় বন্দি বাংলাদেশের প্রথম সারির চারজন রাজনীতিককে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা সফল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে তাদের কারাগারে বন্দি করা হয়। এই চার জাতীয় নেতা হলেন তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামান। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যকে শপথ নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। কেউ আগ্রহভরে, কেউবা বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে শপথ নিতে বাধ্য হন। শোনা যায়ন ফণিভূষণ মজুমদার শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে তাকে চড়-থাপ্পড় মারা হয়। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য ও তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত খুনি মোশতাকের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সামরিক অফিসার এই নৃশংস হত্যাকান্ড সংঘটিত করে। অবৈধ রাষ্ট্রপতি মোশতাকের নির্দেশ মোতাবেক বঙ্গভবন থেকে তখনকার পুলিশের আইজি প্রিজনকে হত্যাকারীদের গভীর রাতে জেলখানায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় এবং ওই নির্দেশনায় উল্লেখ ছিল প্রবেশকারী সামরিক অফিসাররা যা করতে চায়, তাতে যেন বাধা দেওয়া না হয়। তারা জেলখানায় প্রবেশের আগেই ওই চার জাতীয় নেতাকে একটি কক্ষে একত্রিত করা হয়। তার পরের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সবার জানা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সেই নিরাপদ জেলখানাতেই স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন বাংলা মায়ের জাতীয় চার বীর সন্তান।

এই নৃশংস হত্যাকান্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫-এ যারা নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে, হত্যা করেছিল তার শিশু সন্তান, সন্তানসম্ভবা পুত্রবধূ এবং নব পরিণিতা পুত্রবধূসহ গোটা পরিবারকে। পর্দার অন্তরালে থাকা জাতীয়-আন্তর্জাতিক ইন্ধন ও সঙ্ঘবদ্ধ দেশবিরোধী শক্তির ছত্রছায়ায় ওই হত্যাকান্ড সংঘটিত করে খুনি খন্দকার মোশতাক তাদের এমন ধারণা দিয়েছিল যে, বঙ্গবন্ধু ও তার কিছু আত্মীয়কে হত্যা করলেই রাষ্ট্রযন্ত্র খন্দকার মোশতাকের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, মন্ত্রিসভার কিছু সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাদের ধারণা ছিল, মন্ত্রিসভা ও সংসদ কার্যকর থাকলে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে কেউ তার সরকারের বিশেষ কিছু ক্ষতি করতে পারবে না অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুই তাদের জন্য একমাত্র বাধা। তাই হত্যার পর তারা সংসদ ও মন্ত্রিসভা কার্যকর রেখেই প্রথমে সংসদের বাজেট অধিবেশন খসড়া করতে চেষ্টা করেন। প্রথমবার মাত্র ৪২ জন এমপি খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে একত্রিত থাকেন। কিছুদিন পরে ২৬২ জন এমপিকে বঙ্গভবনে ডেকে আনা হয়। উদ্দেশ্য ছিল সংসদে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের অনুমোদন নেওয়া। কিন্তু অধিকাংশ সংসদ সদস্য এতে বাধা দেন। কুমিল্লার সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক খন্দকার মোশতাককে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেন কেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। অনেকে প্রতিবাদ করেন এবং বঙ্গভবনে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সেখানে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। ওইদিনের ঘটনাই প্রমাণ করে যে, খন্দকার মোশতাকের অধীনে সবকিছু স্বাভাবিক থাকার ব্যাপারটা সঠিক নয়। তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সিভিলিয়ানদের দ্বারা পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। তাই পর্দার অন্তরালে যে সামরিক ষড়যন্ত্রকারীরা ২ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত নানা ঘটনা ঘটিয়ে ট্যাংকের পিঠে চড়িয়ে প্রতিবিপ্লবের মূল নায়ক জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করে। এসব ঘটনাপ্রবাহের মূল লক্ষ্য ছিল মেজর জিয়াকে রাষ্ট্রশক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠিত করা। বিচারপতি সায়েমকে সাময়িক সময়ের জন্য রাষ্ট্রপতি করার বিষয়টিও ছিল নিছকই লোক দেখানো। জেনারেল জিয়াই পর্দার অন্তরালে বসে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে অনেক বিএনপি নেতা এখনো বলে বেড়ান রাজনৈতিক শূন্যতার কারণেই নাকি জিয়াকে ক্ষমতায় যেতে হয়। এটা সর্বৈব মিথ্যা। বরং জেনারেল জিয়াই সুকৌশলে দেশে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করে প্রতিবিপ্লবের মূল নায়ক হিসেবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন।

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিশেষ করে তথাকথিত বিচারের নামে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করা, খুনিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বিদেশে পাঠানো, বৈদেশিক দূতাবাসে চাকরি প্রদান, বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা প্রদান, সবশেষে সুযোগ বুঝে দেশে ফিরিয়ে এনে ফ্রিডম পার্টি গঠন করে তাদের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদানের ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে যে, জিয়া ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার মূলনায়ক। জাতীয় চার মহান নেতাকে জেলখানায় জীবিত রেখে আইনের শাসনের মাধ্যমে তাদের বিচার করা অসম্ভব ছিল বলেই সব বাধাবিপত্তি অগ্রাহ্য করে ক্ষমতা দখল এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তাদের জেলখানার মধ্যেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সুতরাং জেলহত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটাই ছিল ৭৫-এর প্রতিবিপ্লবের দ্বিতীয় পদক্ষেপ।

জেনারেল জিয়া ও খুনি মোশতাক ভালো করে জানতেন ওই জাতীয় চার নেতা বেঁচে থাকলে তাদের নেতৃত্বে ভবিষ্যতে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে উঠবে এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড নিয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি হবে; যার মোকাবিলা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। তাইতো প্রথমে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার এবং পরবর্তীতে জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় হত্যা করে এমন রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করা হয়েছিল; যাতে কোনো রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া না যায়। জেনারেল জিয়া সামরিক শাসন জারি করেন। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় এক গভীর চক্রান্তের অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতিতে মেজর জিয়ার ক্ষমতা দখল। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, মুক্তিযুদ্ধকালীন যাদের অবস্থান ছিল পাকিস্তানের পক্ষে; তারাই স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি কায়দায় সামরিক শাসন জারি করে।

যদি আকস্মিকভাবে জিয়ার অজান্তেই এসব হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়ে থাকে; তাহলে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ছিল জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচার করা। কেননা, এ বিচারকার্য সম্পন্ন করতে পারলে তার ক্ষমতার ভীত আরো দৃঢ় হবেÑ এটুকু বোঝার মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা জেনারেল জিয়ার ছিল। আসলে হত্যাকান্ডের সঙ্গে তার পরোক্ষ যোগসাজশ ছিল বলেই তিনি অত্যন্ত সুচতুরভাবে পরবর্তী পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করেন। হত্যার পরপরই তিনি খন্দকার মোশতাককে দিয়েই সবকিছু পরিচালনা করেন এবং খন্দকার মোশতাক যখন ক্ষমতাসীন সংসদে বঙ্গবন্ধু হত্যার অনুমোদন করিয়ে নিতে ব্যর্থ হন; তখনই ৭ নভেম্বরের ঘটনা ঘটিয়ে নিজেই ক্ষমতা দখল করেন। সামরিক বিভাগের এক কর্মকর্তা হিসেবে সুচতুরভাবে প্রথমে পর্দার অন্তরালে থেকে ও পরবর্তীতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে করে জিয়া নিজেই নিজেকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেন।

আজ স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তিকে বাস্তবতা উপলব্ধি করে সুকৌশলের সামনে এগোতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, বিরোধীদের একমাত্র লক্ষ্য শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে অপসারণ করা। শুধু শেখ হাসিনার কারণেই বর্তমানে তারা কোনো ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে পারছে না। যেভাবে তিনি দ্রুত এবং টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে নি¤œ মধ্য আয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্ব সভায় সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন এবং নতুন নতুন জনবান্ধব বৃহৎ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, যৌক্তিকভাবেই তিনি আজ আপামর বাঙালির শেষ ভরসাস্থল হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। ব্যক্তি শেখ হাসিনার প্রতি আপামর জনগণের যে আকুণ্ঠ সমর্থন, আস্থা ও বিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে, তা অগ্রাহ্য করে তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা অসম্ভব। তাই আমরা দেখতে পাই, বর্তমান বাংলাদেশে নানাবিধ বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার সৃষ্টি করার মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœœ করার নগ্ন অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আরেকটা ১৫ আগস্ট বা অনুরূপ কোনো ঘটনা ঘটার গোপন ষড়যন্ত্র আবার সক্রিয়। আজ বিরোধী দলের একমাত্র লক্ষ্য ক্ষমতা দখল। কখন-কীভাবে, কাদের জন্য তারা ক্ষমতায় যেতে চায়, বিরোধী শিবিরের জনবিচ্ছিন্ন আন্দোলনের কোনো পর্যায়েই তা বলা হচ্ছে না। প্রতিদিন প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলো দেখে সহজেই অনুমান করা যায় যে, ক্ষমতায় যেতে না পারাই বিরোধী দলের বিক্ষোভের প্রধান কারণ। দেশরতœ শেখ হাসিনা বিগত ১১ বছর ক্ষমতায় থেকে এবং সুপরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক যে আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছেন, তা আজ অনেকের কাছেই অসহনীয়। সুতরাং, দেশবিরোধী শক্তির দোসর যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে।

এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, ঐতিহাসিক জেলহত্যা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ঘৃণিত ও কলঙ্কিত অতীত। জাতীয় চার নেতা জীবিত থাকলে তারা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের বিচার করতে পারেনÑ এ ধারণা থেকেই বেইমান, বিশ্বাসঘাতক, মীরজাফর খন্দকার মোশতাক ও জেনারেল জিয়া এই জাতীয় চার নেতাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। জাতীয় চার নেতা জীবন দিয়েছেন কিন্তু তারা বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। তারা বেঁচে থাকলে হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হতো। তাদের এই মহান আত্মত্যাগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকলেই পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে অনন্তকাল। সুতরাং ১৫ আগস্ট হত্যাকান্ড, কারান্তরীণ জাতীয় চার নেতাকে হত্যা ও ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা একই সূত্রে গাথা এবং এসব ঘটনার নেপথ্যের কুশীলব একই।

লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট

"