পর্যবেক্ষণ

ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

এহসান বিন মুজাহির

ধান ভানার জন্য একসময়ের অপরিহার্য যন্ত্র ছিল ঢেঁকি। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক ধান ভাঙার ঢেঁকি এখন বিলুপ্তপ্রায়। একসময় ধান ভানার জন্য ছিল না মেশিন; তখন ধান থেকে চাল করতে একমাত্র উপায় ছিল ঢেঁকি। গ্রামের নারীরা সারা রাত ঢেঁকিতে ধান ভানতেন তখন। প্রায় দুই যুগের আগেকার সময়ে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই কম-বেশি ঢেঁকির দেখা মিলত। ধান ভাঙা, চালের গুঁড়ো, হলুদের গুঁড়ো, মরিচের গুঁড়ো আর চিড়া তৈরিসহ প্রায় সব কাজই করা হতো ঢেঁকি দিয়ে। কিছু কিছু কৃষাণ পরিবার ছাড়া এখন ঢেঁকি সচরাচর দেখা যায় না। দুই যুগ আগেও ঢেঁকি আমাদের কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জনপদে খুব প্রয়োজনীয় একটি উপকরণ ছিল। আগেকার যুগে গ্রামের প্রতিটি গৃহস্থ বাড়িতে ধান বানা ও চালের গুঁড়ো কিংবা চিড়া কোটার জন্য ঢেঁকির ব্যবহার হতো। গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশেও এর একটা বিশেষ গুরুত্ব ছিল। একসময় গ্রামগঞ্জসহ সর্বত্র ধান ভাঙা, চাল তৈরি, গুঁড়ো করা, চিড়া তৈরি, মসলাপাতি ভাঙানোসহ বিভিন্ন কাজের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো চিরচেনা ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি। তখন এটা গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। কুটিরশিল্প তথা পেশা হিসেবেও ঢেঁকিতে ধান বানা হতো। গ্রামীণ নারীরা চালের গুঁড়ো দিয়ে নানা রকম পিঠা যেমন চিতল পিঠা, রুটি পিঠা, ঝুরি পিঠা, চুঙ্গা পিঠা, তালের পিঠা, পাটিসাপ্টা পিঠা, নুনগরা, নুনরডোবা, পব, সমুচাসহ তৈরি করতেন হরেক রকমের পিঠাপুলি। এসব তৈরি হতো ঢেঁকিছাঁটা চালের গুঁড়ো দিয়ে। কালের বিবর্তনে এসব পিঠা তৈরিতে ঢেঁকিছাঁটা চালের গুঁড়ো তেমন আর ব্যবহার হয় না।

আধুনিকতার যুগে কর্মব্যস্ত মানুষগুলোর ব্যস্ততা যেমন বেড়েছে; তেমনি কম সময়ে বেশি কাজ করার প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ অতীতের ঐতিহ্যবাহী অনেক জিনিসপত্রের ব্যবহার পরিত্যাগ করেছে কিংবা পরিত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে আমাদের অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য সমাজ সংস্কৃতির অংশ ঢেঁকির ব্যবহার হারিয়ে গেছে। গ্রামগঞ্জে বিদ্যুতায়ন হয়েছে, ধান ভানার মেশিন এসেছে। মেশিন সহজলভ্য হয়ে আসার পর থেকে ঢেঁকির ব্যবহার কমতে শুরু করেছে, অনেক গ্রামেই ঢেঁকি এখন সুদূর অতীতের ঘটনা। ঢেঁকিছাঁটা বাদামি চাল দেখা যায় না, বিয়ে পালা পার্বনে ঢেঁকিতে পাড় দেওয়ার জন্য গ্রামের মহিলাদের ডাক পড়ে না। নতুন প্রজন্মের কাছে হয়তো রহস্য হয়েই থেকে যাবে কীভাবে পা দিয়ে ঢেঁকি চালিয়ে ধান থেকে চাল আর চাল থেকে চালের গুঁড়ো তৈরি করা হতো। ঢেঁকিছাঁটা চালের কদর এখনো কিন্তু কমেনি। কারণ ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাতের মজাই আলাদা। এ ছাড়া মসলাপাতি, চিড়া, আর চালের গুঁড়োর পিঠাÑ এসবের জন্য ঢেঁকির কোনো বিকল্প নেই।

নতুন প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়ে এই ঢেঁকির সঙ্গেও পরিচিত নন। এ সময়ে শহরে বেড়ে ওঠা বহু তরুণ-তরুণীকে প্রশ্ন করলে অনেকেই হয়তো কপালে তোলে উল্টো প্রশ্ন করবে ঢেঁকি আবার কী! ধানকল, আটাকলের ব্যাপক প্রসারের ফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ঢেঁকি। আজ সেই ঢেঁকি গল্পমাত্র। ফলে নতুন প্রজন্ম ঢেঁকি শব্দটি ভুলতে বসেছে। তারা জানে না ঢেঁকির সেই গৌরবময় অতীতের কথা। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকির কদর আগের মতো আর নেই। বিদ্যুৎ চালিত যান্ত্রিক জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঢেঁকি। সত্তরের দশকে সর্বপ্রথম দেশে রাইস মিল বা মেশিন দিয়ে ধান থেকে চাল বের করার প্রচলন শুরু হয়। তখন থেকেই ঢেঁকির প্রয়োজনীয়তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। শুধু ঢেঁকি কেন; ধীরে ধীরে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ি, ঘানিশিল্প, ধূপশিল্প, খয়েরশিল্প হারিয়ে যাচ্ছে। সময়ের ব্যবধানে আমরা হয়তো ঢেঁকিসহ অন্য গ্রামীণ ঐতিহ্য ব্যবহার করছি না, কিন্তু আমাদের উচিত গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের ধারক এই ঢেঁকিসহ সব ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা। অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য যাতে পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারে; সেজন্য প্রাচীন ঐতিহ্যের এসব উপকরণ সংরক্ষণ করা অতীব প্রয়োজন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"