পর্যালোচনা

শাসনতন্ত্র দিবস ও আমাদের সংবিধান

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

মো. কায়ছার আলী

রথযাত্রা লোকরণ্য মহাধুমধাম, ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিতে প্রণাম, পথ ভাবে ‘আমি দেব’ রথভাবে ‘আমি’। মূর্তিভাবে ‘আমি দেব’ হাসেন অন্তর্যামী। পথ, রথ এবং মূর্তিÑ এ তিনজনের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ? সবাই নিজেকে দাবি করছে। প্রকৃতপক্ষে শ্রেষ্ঠ হলেন বিধাতা। বিশ্বকবির এ উক্তিখানা পাঠ করলে মনে পড়ে যায় সরকারের আইন, বিচার ও শাসন বিভাগের মধ্যে কার ক্ষমতা বেশি বা কম অথবা সমানÑ এ বিতর্কের অবসান করতে পারে শুধু সংবিধান। উপমা দিয়ে বলা যায় যে, চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই। সূর্যের আলোয় চাঁদ আলোকিত ও উদ্ভাসিত। এখানে সূর্যকে সংবিধানের সঙ্গে দৃষ্টান্ত হিসেবে দেওয়া যায়। ছোট্ট কথায় সংবিধান হলো যেকোনো রাষ্ট্রের মূল ও সর্বোচ্চ আইন; যা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য লিখিত ও অলিখিত বিধিবিধানের সমষ্টি। অন্যভাবে বলা যায়, একটি রাষ্ট্রের দর্পণ বা প্রতিচ্ছবি। যার মধ্যে একটি জাতি, দেশ ও রাষ্ট্রের জীবন পদ্ধতি মূর্ত হয়ে ওঠে অর্থাৎ সরকারের ক্ষমতা চর্চার শাখাগুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটলের মতে, ‘সংবিধান হলো এমন একটি জীবন পদ্ধতি; যা রাষ্ট্র স্বয়ং বেছে নিয়েছে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধানই আইনের অনুশাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং নাগরিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করে।’ অধ্যাপক ফাইনারের মতে, ‘মৌল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সুষম ব্যবস্থাই সংবিধান।’ যেকোনো দেশের শাসনব্যবস্থা বা সরকারের ক্ষমতার উৎসই হচ্ছে সংবিধান। কোনো কিছু যেমন ভ্যাকুয়াম বা শূন্যতা হতে সৃষ্টি হতে পারে না বা শূন্যতার ভেতর কাজও করতে পারে না। এককথায় বলা যায়, সংবিধানবিহীন কোনো স্বাধীন, সার্বভৌম ও সভ্য রাষ্ট্র চলতে পারে না। ইতিহাস পাঠে জানা যায় যে, মানবসভ্যতার প্রথম সমাজ হিসেবে পরিগণিত গ্রিক সমাজে দাস প্রথা প্রচলিত ছিল এবং তা স্বাভাবিক হিসেবেও সমর্থিতও হয়েছিল। সেখানে দাসদের কোনো অধিকার ছিল না। দাসরা ছাড়া সব নাগরিকই শাসনকার্যে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করতেন। বিভিন্ন প্রাচীন গ্রিক নগর রাষ্ট্রের সংবিধানসমূহ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, যেসব বিশ্বাস এবং ধ্যানধারণা অনুযায়ী ওইসব সমাজ পরিচালিত হয়েছিল, তা সেখানকার সংবিধানগুলোতে প্রতিফলিত হয়। এথেন্স ও স্পার্টা নগরীর দুটির সংবিধানগুলোই এর দৃষ্টান্ত বিশেষ।

সামন্ততান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী সমাজের ও সংবিধান সেই ধরনের ক্ষমতাগত সম্পর্ক প্রকাশ করে। কিন্তু সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধানে সর্বহারাগণই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং বুর্জোয়াদের কোনো অধিকার নেই। সর্বহারাগণই সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভের অধিকারী হবেÑ এমনভাবেই সেখানে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংবিধান ভারতের আর ছোট সংবিধান (মাত্র ১৫-১৬ পাতা) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের; তবে ৬ হাজার শব্দের বেশি নয়। ১৭৭৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত তাদের সংবিধান ছাব্বিশ বার সংশোধিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের সংবিধান অলিখিত। আমাদের মহান ও পবিত্র সংবিধান লিখিত, দুষ্পরিবর্তনীয়, মৌলিক অধিকার দ্বারা স্বীকৃত, এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা, ১৫৩টি অনুচ্ছেদ, ১১টি ভাগ, ৪টি মূলনীতি, ৭টি তফসিল, ১টি প্রস্তাবনাসহ পরিপূর্ণ একটি সংবিধান। তবু কারণে বা অকারণে আজ পর্যন্ত এ সংবিধানে ১৫ বার সংশোধনী আনা হয়েছে।

প্রতি বছরের ৪ নভেম্বর সংবিধান দিবস হিসেবে পালন করা হয়। সংবিধান দিবস সম্পর্কে লিখতে গেলে এর পটভূমি লেখা অত্যন্ত জরুরি বা আবশ্যক। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের দিন। এ দিন ‘জয় বাংলা’ সেøাগানে মুখরিত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখে বাংলাদেশ ও ভারতের মিত্র বাহিনীর কাছে রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) প্রায় তিরানব্বই হাজার পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশ কার্যত স্বাধীন হয়। ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার মুজিবনগর হতে ঢাকায় এসে শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে’ তার ওপর অর্পিত ক্ষমতাবলে ‘আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ’ জারি করেন। এ আদেশ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর হয়। এ আদেশবলে পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামো থেকে প্রাপ্ত সব আইনকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অধীনে বৈধতা দান করা হয়। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ অনুযায়ী দেশ শাসিত হতে থাকে।

রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফেরার পর কালবিলম্ব না করে একটি সংবিধান প্রণয়ন করে জাতির আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করেন। এ আদেশ ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর হবে বলে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত ৪৬৯ জন সদস্যদের মধ্যে (জাতীয় পরিষদের ১৬৯+প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০= ৪৬৯ জন) ৪০৩ জন সদস্য নিয়ে গণপরিষদ গঠিত হয়। কেননা, ৪৬৯ জন সদস্যের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিহত হয়েছিলেন ১২ জন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দালালির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন পাঁচজন, দুর্নীতির দায়ে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন ৪৬ জন, পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন দুজন (ভাষা আন্দোলনের খুনি নুরুল আমীন ও স্বতন্ত্র সদস্য রাজা ত্রিদির রায়) পররাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ে চাকরি গ্রহণ করেছিলেন একজন। এ ৪০৩ জন গণপরিষদ সদস্যের মধ্যে ৪০০ জন ছিলেন আওয়ামী লীগ দলীয়, একজন ছিলেন ন্যাপ (মোজাফ্ফর) এবং বাকি দুজন ছিলেন নির্দলীয়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেন। অধিবেশনের প্রথম দিনে গণপরিষদের সদস্যগণ কর্তৃক স্পিকার নির্বাচিত হন শাহ্ আবদুল হামিদ ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন মোহাম্মদ উল্লাহ্। ১১ এপ্রিল ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। এই ৩৪ জনের মধ্যে ৩৩ জন ছিলেন আওয়ামী লীগের দলীয় গণপরিষদ সদস্য এবং একজন ন্যাপ (মোজাফ্ফর) সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। একজন মহিলা গণপরিষদ সদস্য (বেগম রাজিয়া বানু) উক্ত কমিটির অন্তর্ভুক্ত হন। এই খসড়া কমিটির প্রথম বৈঠক বসে ১৯৭২ সালের ১৭ এপ্রিল। এই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জনমত আহ্বান করা হয়। খসড়া কমিটির সর্বমোট ৪৭টি বৈঠকে ৩০০ ঘণ্টা ব্যয় করে তাদের খসড়া চূড়ান্ত করেন। ১৯৭২ সালের ১০ জুন কমিটি প্রাথমিক খসড়া প্রণয়ন করে। এরপর কমিটির সভাপতি ড. কামাল হোসেন ভারত ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে সংবিধান বেত্তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে মূল্যবান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। প্রস্তাবিত সংবিধানের বিভিন্ন দিক সম্বন্ধে ১৯৭২ সালের ১১ অক্টোবর কমিটির শেষ বৈঠকে খসড়া সংবিধানের চূড়ান্ত রূপ গৃহীত হয়। ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশন বসে। এ অধিবেশনে ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে গণপরিষদে উত্থাপন করেন। ১৯ অক্টোবর সংবিধানের ওপর প্রথম পাঠ শুরু হয় এবং ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত চলে। এতে সর্বমোট ১০টি বৈঠকে ৩২ ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। অতঃএব ৩১ অক্টোবর দ্বিতীয় পাঠ শুরু হয় এবং ৩ নভেম্বর পর্যন্ত চলে। ৪ নভেম্বর সংবিধানের ওপর তৃতীয় ও সর্বশেষ পাঠ শুরু হয়। মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে এ কাজ শেষ হয়। ওইদিনটি ছিল ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণ (বেলা ১টা ৩০ মিনিট)। বিপুল আনন্দ, তুমুল করতালি ও হর্ষধ্বনির মধ্যে বাংলাদেশ সংবিধান গণপরিষদ কর্তৃক পাস এবং তা চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়।

গণপরিষদে সংবিধানের ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে। এখানে উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন করতে সময় লেগেছিল প্রায় ৯ বছর (১৯৪৭-১৯৫৬), ভারতের সময় লেগেছিল প্রায় তিন বছর (১৯৪৭-১৯৪৯), কিন্তু বঙ্গবন্ধু সরকার মাত্র ১০ মাসে বাংলাদেশকে একটি সংবিধান উপহার দিতে সক্ষম হয়। ১৯৭২ সালের ১৫ ডিসেম্বর সংবিধানের হস্তলিপি সংস্করণে গণপরিষদের সদস্যদের স্বাক্ষর গৃহীত হয়। গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত এ সংবিধান বিজয় দিবসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করা হয়। আমাদের সংবিধানের খসড়া প্রণয়নের সময় বা মহান জাতীয় সংসদের পাশের পূর্ব মুহূর্তে কিছু ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দল বা গ্রুপ বা গোষ্ঠী সতর্কতার সঙ্গে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিল। কারা এবং কেন, কী উদ্দেশ্যে মন্তব্য করেছিল, ইতিহাসে তা লেখা আছে। তারা সমালোচনা করলেও সংবিধানের মূলনীতিসমূহের বিরোধিতা করে নাই এবং সংবিধানের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় প্রমাণ করে যে, পবিত্র সংবিধানটি সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল। বর্তমানে সবাই সংবিধানকে আইন হিসেবে এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে নিয়েছেন। ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর পর থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় দেশ পরিচালিত হচ্ছে। কারণ ‘সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা অন্য সরকার ব্যবস্থা থেকে উত্তম।’

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"