বিশ্লেষণ

প্রাথমিক শিক্ষকদের চাওয়া-পাওয়া

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

সাধন সরকার

শিক্ষকতা পেশা পৃথিবীর মহান পেশা। তবে শুনতে খারাপ লাগলেও এটা ঠিক যে, শিক্ষকরাও মানমর্যাদার দিক দিয়ে অবহেলিত হন! কলেজ বা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোনো ক্লাসে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কে কে শিক্ষকতা পেশায় আসতে চান? এটা মোটামুটি নিশ্চিত, শতকরা ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে চার-পাঁচজনের বেশি এ পেশায় আসার আগ্রহের কথা বলবেন না! আর যদি নির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করা হয়, কে কে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চান? তাহলে একজনও আগ্রহ দেখাবে কিনা সন্দেহ! বাস্তবতা হলো, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরিটাকে এখনো মেধাবী চাকরি প্রত্যাশীদের ন্যূনতম আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা যায়নি। কিন্তু আদিকাল থেকেই দেশে-বিদেশে শিক্ষকতা মহান ও আদর্শ পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যেভাবে সম্মানের চোখে দেখা হয় আর মানমর্যাদা দেওয়া হয়, আমাদের দেশে তার অর্ধেকও মূল্য দেওয়া হয় না! প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দিনের পর দিন অবহেলিত হয়ে আসছেন। এ পেশায় বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক সংকট রয়েছে। পুরো চাকরিকালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্বাভাবিকভাবে পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে! আরো উল্লেখ করে বলতে গেলে বলা যায়, স্বাভাবিকভাবে পুরো শিক্ষকতা জীবনে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির ব্যবস্থা নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সহকারী শিক্ষকদের বর্তমান বেতন গ্রেডের পার্থক্য তিন ধাপ। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে এই বেতনবৈষম্য সবসময় সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করছে।

শিক্ষাজীবনের ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। আর এই ভিত্তি যদি মজবুত না হয় তাহলে শিশুর জীবনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমনকি শিক্ষাজীবনও থেমে যেতে পারে! মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য দরকার মানসম্মত ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক। বিদ্যালয় পরিচালনা ও দিকনির্দেশনার দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের ওপর ন্যস্ত থাকলেও শ্রেণি পাঠদানের মূল কাজটা করতে হয় সহকারী শিক্ষকদের। নির্দিষ্ট ক্লাসের প্রতিটি পাঠদানে শিখনফল অর্জনের কাজটি সহকারী শিক্ষকদেরই অতি গুরুত্বের সঙ্গে করতে হয়। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয়, প্রধান শিক্ষক ছাড়া মাসের পর মাসও বিদ্যালয় চালানো সম্ভব, কিন্তু সহকারী শিক্ষক ছাড়া একদিনও বিদ্যালয় চালানো এক প্রকার অসম্ভব! তাই অচিরেই প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেডের তিন ধাপের পার্থক্যের অবসান হওয়া জরুরি। প্রধান শিক্ষকদের বর্তমান বেতন গ্রেড হলো ১১তম (দ্বিতীয় শ্রেণির)। ২০১৪ সাল থেকে প্রধান শিক্ষকরা এই গ্রেডে বেতন পেয়ে আসছেন। আর সহকারী শিক্ষকরা বেতন পান ১৪তম গ্রেডে। সম্প্রতি হাইকোর্ট এক রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান শিক্ষকের বেতন ১০তম গ্রেডে দেওয়ার আদেশ জারি করেছেন। অনেক আগে থেকে তো বটেই ২০১৪ সাল থেকে আরো জোরালোভাবে সহকারী শিক্ষকরা বেতনবৈষম্য নিরসনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। এছাড়া বেতনবৈষম্য নিরসনের দাবিতে ২০১৭ সালে ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে লক্ষাধিক সহকারী শিক্ষক ঢাকা কেন্দীয় শহিদ মিনারে আমরণ অনশনে বসেন। তখন সংশ্লিষ্ট দফতরের মন্ত্রী ও সচিব পর্যায় থেকে বেতনবৈষম্য নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিলে শিক্ষকরা আশ^স্ত হন। কিন্তু তার সুফল এখনো সহকারী শিক্ষকরা পাননি। তবে যাই হোক, সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেডের পার্থক্য কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বেতনবৈষম্য নিরসনকল্পে বিধিমালা সংশোধন করে সহকারী শিক্ষকের ১২তম গ্রেড আর প্রধান শিক্ষকদের ১০তম গ্রেডে বেতন দেওয়ার নির্দেশনা গেজেট আকারে জারির কাজ চলছে বলে জানা গেছে। এটা করা হলেও প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সহকারী শিক্ষকের বেতন গ্রেডের পার্থক্য থেকে যাবে! কোনো ধরনের বেতনবৈষম্য প্রায় সাড়ে তিন লাখের বেশি সহকারী শিক্ষক চান না। উচ্চ আদালতের রায় থাকার পরও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনবৈষম্য কেন দূর করা হচ্ছে না তা বোধগম্য নয়। প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সহকারীদের বেতমবৈষম্য কমানের এই দাবিকে অযৌক্তিক বলার কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষক সমাজের বড় অংশই আজ অবহেলার শিকার। শিক্ষকরা তাদের যৌক্তিক দাবিদাওয়া নিয়ে এই যুগে এসে আন্দোলন করবে, এটা পুরো জাতির জন্য লজ্জার! আর শিক্ষকরা আন্দোলনে গেলে শিক্ষার্থীদেরও পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটবে।

দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি, প্রধান শিক্ষকের পরের ধাপে সহকারী শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হোক। প্রধান শিক্ষকের পরের ধাপে বেতনের দাবিতে এ বছরের মার্চ মাসের ১৫ তারিখ ও এর আগে-পরে সময় থেকে এখনো পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি জেলা শহরে ও পিটিআইতে (প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট) সহকারী শিক্ষকরা মানববন্ধন করে চলেছেন। উল্লেখ্য, শিক্ষা ও শিক্ষকের গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৭৩ সালেও জাতির পিতা প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের মধ্যে কোনো বেতনবৈষম্য রাখেননি। তখন প্রধান ও সহকারী শিক্ষকের বেতন একই ছিল (শুধু প্রধান শিক্ষকরা মাসিক ১০ টাকা হারে কার্যভার ভাতা পেতেন)। ১৯৭৭ সালে সহকারী শিক্ষকদের ১৭তম ও প্রধান শিক্ষকদের ১৬তম গ্রেডে বেতন দেওয়া হতো। তখন থেকেই মূলত বেতনবৈষম্যের সূত্রপাত হয়! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সহকারী শিক্ষকের বেতনবৈষম্য বেড়েছে। ২০০৬ প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সহকারী শিক্ষকের বেতনবৈষম্য দুই ধাপে ও ২০১৪ সালে তা তিন ধাপে দাঁড়ায়। বঙ্গবন্ধুর সময়কালীন যুদ্ধবিধ্বস্ত ও ভঙ্গুর অর্থনীতির সময় দাঁড়িয়েও যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে বেতনবৈষম্য না থাকে তাহলে এখনকার বর্তমান বাস্তবতায় বেতনবৈষম্য মানা কতটা সমীচীন? এখন প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক হিসেবে মেধাবীরা আসতে শুরু করেছেন। মেধাবীদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় টানতে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের মধ্যে কোনো প্রকার বেতনবৈষম্য রাখা উচিত নয়। তাই অচিরেই প্রধান শিক্ষকের পরের ধাপেই সহকারি শিক্ষকের বেতন নিশ্চিত করতে হবে।

প্রায় দুই কোটির বেশি শিশু শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের স্বপ্নের জায়গা হলো এদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এ পেশায় দেশের সর্বেŸাচ মেধাবীদের নিয়োগ দিতে হবে। শিশুদের মানুষের মতো মানুষ করা সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। ধারণা করা হয়, গরিব ও নি¤œ মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানেরাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়তে আসেন। তাই শিক্ষার ভিত্তি যদি মজবুত হয় তাহলে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে দেশের কোমলমতি সন্তানেরা। আর এজন্য শিক্ষক নিয়োগের বিধিমালাও সংশোধন করা জরুরি। কলেজ-মাধ্যমিক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় একই যোগ্যতা, মাপকাঠি অনুসরণ করে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করতে হবে। এভাবে একইসঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে তারপর তাদের একই মানমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা কলেজগুলোতে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করতে হবে। সহজ কথায়, একই মাপকাঠি ও যোগ্যতা মেনে সবাই শিক্ষকতা পেশাই আসবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় শিক্ষকদের যোগ্যতাভিত্তিক স্কেল দেওয়ার কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে। শিক্ষকরা তাদের যোগ্যতা তথা ডিগ্রি অনুসারে বেতন পাবেন। ডিগ্রি উচ্চতর হলে বেতনও বেশি হবে।

যাহোক, শিক্ষকতা পেশা দুনিয়ার সেরা পেশা বললেও অত্যুক্তি হবে না। শিক্ষা সর্বজনীন। আর শিশুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা। সবচেয়ে দুঃখের বাস্তবতা হলো, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এদেশের তৃতীয় শ্রেণির চাকরিজীবী! শিক্ষকরা কেন তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হবে? অথচ সরকার সেবাটা চাই প্রথম শ্রেণির! তিলে তিলে যারা নিজের সন্তানের মতো ছোট ছোট শিশুদের মানুষ গড়ার মহৎ কাজটি করে যান, তারা দিন শেষে যদি প্রাপ্য মর্যাদা না পান তাহলে আর দুঃখের অন্ত থাকে না। শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের কথাও বিবেচনা করতে হবে। কেননা পৃথিবীর অন্য সব পেশার থেকে শিক্ষকতা পেশা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সর্বশেষ পে-স্কেলের সুপারিশেও শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেলের কথা ছিল। দেশের সর্ব্বোচ মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে এ পেশায় সব ধরনের বৈষম্য দূর করে মানমর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। অচিরেই প্রাথমিকের শিক্ষকতা পেশায় বেতনবৈষম্য দূর হোক। চাকরির ক্ষেত্রে মেধাবীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হোক শিক্ষকতা। মেধাবীরা অনায়সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় আসলে এক একটি বিদ্যালয় হয়ে উঠবে স্বপ্ন তৈরির কারখানা, প্রতিটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি হবে মজবুত ও যুগোপযোগী।

লেখক : পরিবেশকর্মী ও কলামিস্ট

সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

[email protected]

"