মুক্তমত

বাঙালি কবে গ্লানিমুক্ত হবে

প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

শাহ্জাহান কিবরিয়া

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবারের নির্বাচনে জয়লাভের পর ঘোষণা করেছিলেন, দেশ দুর্নীতিমুক্ত করা হবে। তার এই ঘোষণাটাকে দেশবাসী সাধুবাদ জানিয়েছে। নিন্দুকেরা বলে, বঙ্গবন্ধুকন্যা একটি অসম্ভব ও অবান্তর ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণা বাস্তবসম্মত নয়। এই ঘোষণা মহাসমুদ্রের লবণাক্ত পানির মধ্যে সুপেয় পানি সন্ধান করার মতো।

বাংলাদেশ একটি ঘুষপ্রবণ ও দুর্নীতিপ্রবণ দেশ। পুরো জাতি দুর্নীতিতে নিমগ্ন। দেশে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই যাকে ঘুষমুক্ত বা দুর্নীতিমুক্ত বলা যেতে পারে। এ দেশে মাতৃদুগ্ধ ছাড়া কোনো খাদ্য নেই, যাকে ভেজালমুক্ত বলা যায়। স্বাভাবিক মায়ের কোল ছাড়া এমন কোনো আশ্রয় নেই যাকে শিশুর জন্য নিরাপদ বলা যায়।

বাঙালির এ সমস্যা শুধু আজকের নয়। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘকাল ধরে বিদেশি শক্তির দ্বারা শাসিত ও শোষিত হয়েছে। পরাধীন জাতি সব সময় হীনমন্যতায় ভোগে। সব সময় আত্মগ্লানিতে ভোগে। নিজেদের শক্তিতে কখনো বিশ্বাসী হতে পারে না। সব সময় পরমুখাপেক্ষী থাকে। আত্মকলহে লিপ্ত থাকে। এরা পরশ্রীকাতর হয়। নিজ ভাষা ও সংস্কৃতিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। পারিবারিক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রেও বিদেশি ভাষা ব্যবহার করে। জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করতে এরা কুণ্ঠিত হয় না। বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবর পেয়ে তৎকালীন জার্মান চ্যান্সেলর উইলিব্রান্ট বলেছিলেন, ‘বাঙালিদের বিশ্বাস করা যায় না। যারা মুজিবকে হত্যা করেছে, তারা যেকোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।’

দুর্নীতির উৎস হচ্ছে পরাধীনতার গ্লানি। এই গ্লানি সব বাঙালির গায়ে, আস্থাতে এবং মজ্জায়। দুর্নীতিবাজ ও অসাধু প্রবাসীদের হাতে তাদের বাবা-মা এমনকি সন্তানরাও নিরাপদ নয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ তেইশ বছরের কঠোর সাধনায় হাজার বছরের পরাধীন বাঙালি জাতিকে বিশ্বের দরবারে সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য একটি স্বাধীন ভূখ- উপহার দিতে পেরেছিলেন আর আমরা দীর্ঘ আটচল্লিশ বছরেও দেশকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করতে পারিনি। স্বাধীনতার গর্ববোধ যে জাতির থাকে না, সে জাতি কখনো গ্লানিমুক্ত হয় না। বঙ্গবন্ধুকন্যার এই ঘোষণা শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে নয়। পরাধীনতার গ্লানির বিরুদ্ধেও তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল, দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার মধ্য দিয়ে একটি শোষণমুক্ত সমাজ কায়েম করা। তার সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাতে তিনি নিষ্ঠুরভাবে সপরিবারে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর স্বাধীনতাবিরোধী দুর্নীতিবাজ শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার ফলে পুরো জাতি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দুর্নীতিবাজ শাসকগোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় জনগণও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মাও সে তুং বলেছিলেন, ‘মাছের পচন শুরু হয় মাছের মাথা থেকে।’ ওষুধ, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল থেকে দেশের সব কর্মকা-ে ঘুষ ও দুর্নীতি ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়ে। চাঁদে যাব বললেই যেমন চাঁদে যাওয়া যায় না, তার জন্য উপযুক্ত প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও সামগ্রিক দৃঢ়তার প্রয়োজন, তেমনি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলেও একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

দুর্নীতি বন্ধে প্রধান বাধা স্বজনপ্রীতি। এ জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যাকে তার বাবার আদর্শ অনুসরণ করে নিরপেক্ষ ও কঠোর মনোবলে বলিয়ান হতে হবে। চারপাশে চাটুকারদের দেখে বঙ্গবন্ধু গভীর দুঃখে বলেছিলেন, ‘আমি কষ্ট করে বিদেশ থেকে সাহায্য আনি আর চাটার দল খেয়ে ফেলে।’

দ্বিতীয় বাধা, ‘ঔপনিবেশিক শাসনামলের আইন।’ বিদেশি শাসকগোষ্ঠী সব সময় নিজেদের স্বার্থে আইনপ্রণয়ন করে থাকে, প্রজাদের স্বার্থে নয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক আইন কখনো জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারে না। দেশে দুর্নীতি দমনে ঔপনিবেশিক আইন অনুসৃত হওয়ার ফলে ঘুষ, দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। স্বাধীন রাষ্ট্রের উপযোগী করে নতুন আইন তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে ‘দুর্নীতি দমনবিরোধী’ আইনে মৃত্যুদ-ের বিধান রাখতে হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, অপরাধীদের মৃত্যুদ- কার্যকর করা সত্ত্বেও তো দেশে হত্যাকা- বন্ধ হচ্ছে না। সুতরাং দুর্নীতিবিরোধী আইনে মৃত্যুদ-ের বিধান রাখলেও দেশে দুর্নীতি বন্ধ হবে না। অথচ দুর্নীতি বন্ধ না হলে দেশে কখনো সুশাসন সম্ভব নয়।

প্রস্তাবিত দুর্নীতিবিরোধী আইনে মৃত্যুদ-ের বিধান থাকলে দেশ সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত না হোক অন্তত দুর্নীতি নির্মূলের কাছাকাছি তো যেতে পারবে। এই প্রসঙ্গে আমার ছেলেবেলার একটা কথা মনে পড়ল। আমাদের গৃহশিক্ষক মোসলেম উদ্দিন স্যার বলতেন, সব সময় মনে উচ্চ আকাক্সক্ষা পোষণ করবে। ওপরের দিকে যদি ঢিল ছুড়তে চাও তাহলে গাছের মাথা লক্ষ্য করে না, আকাশ লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়বে। ঢিল আকাশে পৌঁছাতে না পারলেও কাছাকাছি তো যেতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান দেশবাসীকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে সম্পূর্ণ না হোক, কিছুটা হলেও তো মুক্তি দিতে পারবে। বাঙালি আত্মগ্লানিতে ভোগে বলেই বিদেশিদের মতো নিজেদের ‘বাঙাল’ বলে উপহাস করে। বাঙালি আত্মগ্লানিতে ভোগে বলেই হতাশার সুরে বলে এ জাতির দ্বারা কিছুই হবে না।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক, সাবেক পরিচালক বাংলাদেশ শিশু একাডেমি

"