মুক্তমত

উভয়কে গুরুত্ব দিতে হবে

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

প্রধানমন্ত্রীর বহুল আলোচিত ভারত সফরে দুদেশের মধ্যে সাতটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেছেন তিনটি প্রকল্প। দুদেশের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ফেনী নদী থেকে ত্রিপুরার সাবরুম শহরের পানি সরবরাহে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করতে পারবে ভারত।

চুক্তি ও সমঝোতাপত্র বিনিময়ের পর শেখ হাসিনা ও মোদি যৌথভাবে তিনটি প্রকল্প উদ্বোধন করেন। এগুলো হলোÑ খুলনায় ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে ‘বাংলাদেশ-ভারত প্রফেশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’, ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনে ‘বিবেকানন্দ ভবন’ ও ‘বাংলাদেশ থেকে ত্রিপুরায় এলপিজি আমদানি প্রকল্প’।

প্রকল্পগুলো উদ্বোধন করে শেখ হাসিনা বলেন, বিগত এক দশকে আমাদের উভয় দেশের মধ্যে বিভিন্ন প্রথাগত সহযোগিতা প্রভুত পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন নতুন ও অপ্রচলিত খাত যেমন মেরিটাইম, পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, মহাকাশ গবেষণা, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ রফতানি ও সাইবার সিকিউরিটি ইত্যাদি খাতে উভয় দেশ সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করেছে। এসব বহুমুখী ও বহুমাত্রিক সহযোগিতার ফলে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিশ্ববাসীর সামনে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের দৃষ্টান্ত হিসেবে ওঠে আসছে।

বাংলাদেশ থেকে এলপিজি সরবরাহের ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যসমূহের জ্বালানি চাহিদা পূরণ অনেকাংশে সহজ হবে। শীর্ষ বৈঠকের পর ৩৮ দফা যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে দুই দেশের পক্ষ থেকে। এতে বলা হয়েছে, দুই দেশের নদী কমিশনের টেকনিক্যাল কমিটিকে মনু, মহুরী, খোয়াই, গোমতী, দারিয়া, দুধকুমার ও ভবিষ্যতে ফেনী নদীর পানিবণ্টনের চুক্তির জন্য একটা খসড়া চূড়ান্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যৌথ ইশতেহারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারকে চাপ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আহ্বানে সহমর্মিতা পোষণ করা হয়েছে। নেপাল ও ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতেও ভারত সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়ার হতাশা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর ও দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি ও সমঝোতায় উভয় দেশ লাভবান হবে। জোরদার হবে দুই দেশের ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্ব।

বাংলাদেশ ও ভারত দুই প্রতিবেশী দেশ। বলা হয়, সব কিছু পাল্টানো গেলেও প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না। সুখে-দুঃখে প্রতিবেশীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা ব্যক্তিজীবনে যেমন অবশ্য কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়, রাষ্ট্রীয় জীবনেও তেমনি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অবশ্য প্রতিবেশী অভিধার চেয়েও বেশি। মহান মুক্তিযুদ্ধে বন্ধুপ্রতিম ভারতীয় জনগণের ভূমিকা বাংলাদেশের মানুষকে কৃতজ্ঞতার ডোরে আবদ্ধ করেছে। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর রক্ত বহু ক্ষেত্রে একাকার হয়েছে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। রক্তের এই রাখিবন্ধন দুই প্রতিবেশী দেশের ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বকে এগিয়ে নেওয়ারই তাগিদ দেয়।

বলা হয়, প্রতিবেশী থাকলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থাকে এবং তা নিয়ে কখনো কখনো টানাপড়েন হয়। তবে সব সময়ই মনে রাখা উচিত, প্রতিবেশীর অস্তিত্ব যেহেতু একটি অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতা, সেহেতু পরস্পরকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা লালন করাই উত্তম। নিজেদের মধ্যকার বিদ্যমান সমস্যা যুক্তি দিয়েই শুধু নয়, সহমর্মিতার মনোভাব দিয়ে সমাধান করাই বিধেয়।

বাংলাদেশ-ভারত সুসম্পর্কের মধ্যে দুই দেশের প্রায় ১৫০ কোটি মানুষের কল্যাণ নিহিত। ভারত জনসংখ্যায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেও আবির্ভূত হওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছে তারা। অন্যদিকে বাংলাদেশও তার খোলস ছেড়ে দ্রুত অগ্রগতির পথে পা বাড়ানোর কৃতিত্ব দেখিয়েছে। ভারত মধ্য আয়ের এবং বাংলাদেশ এখনো উন্নয়নশীল দেশের অভিধায় চিহ্নিত হলেও দুই দেশের সম্ভাবনা এখন সারা বিশ্বের আলোচিত বিষয়। সাফল্যের এই হাতছানির পাশাপাশি বিভেদকামী শক্তি ও জঙ্গিবাদের হুমকি দুই দেশের ওপরই বিষনিঃশ্বাস ফেলার চেষ্টা করছে। আয়তনে-জনসংখ্যায় ভারত অনেক বড় দেশ হলেও তার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশের সমর্থন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। একইভাবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় ভারতের সমর্থনও একটি কাম্য বিষয়। আশা করি, বাংলাদেশ এবং ভারত যেসব চুক্তি করেছে, তাও ভবিষ্যতে আরো গতিশীল হবে। সম্পর্কোন্নয়নের জন্য উভয় দেশকে সদিচ্ছা, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার দিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

লেখক : সহসভাপতি, এফবিসিসিআই

 

"