প্রত্যাশা

ছাত্র অপরাজনীতি বন্ধ হোক

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

সাধন সরকার

বিশ^বিদ্যালয়পড়–য়া একজন ছাত্রকে ভিন্নমত প্রকাশের কারণে একই বিশ^বিদ্যালয়ের অন্য কয়েকজন ভাইয়ের হাতে লাশ হয়ে মায়ের কাছে ফিরতে হবেÑ এটা কি ভাবা যায়? বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ে (বুয়েট) নৃশংস এমন ঘটনাই ঘটেছে। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারকে ছাত্রলীগ নামধারী কয়েকজন অপরাধীর হাতে জীবন দিতে হয়েছে। বিশ^বিদ্যালয়ে একজন সহপাঠী আরেকজন সহপাঠীর জন্য কি নিরাপদ নয়! বিশ^বিদ্যালয়ে তো ধৈর্য, মনুষ্যত্ব ও মানবিকতার চর্চা অবশ্যই শেখানো হয়! কিন্তু কেন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন এত বেপরোয়া! ছাত্রদের মধ্যে এত হিংস্র মনোভাব কীভাবে আসে? গত প্রায় দুই দশকে ভালো কাজের জন্য ছাত্রলীগ গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে বলে মনে হয় না আর হলেও হাতেগোনা! অথচ ঐতিহ্যবাহী এই ছাত্র সংঠনটির মুক্তিযুদ্ধের আগে ও যুদ্ধকালীন ভূমিকা ইতিহাসে লেখা আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন থাকা দলের এই ছাত্র সংগঠন অনেকবার অপরাধ করলেও খুব কমই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। শুদ্ধি অভিযান চালানোর প্রয়োজনবোধ মনে করা হয়নি! যাদের ধৈর্য, মানবিকতা ও মনুষ্যত্ব নেই; তারা কীভাবে ছাত্রলীগে স্থান পায়। জাতির পিতার হাতে গড়া এই গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সব সদস্য জানে বলে মনে হয় না! পদ-পদবি, লোভের আশায় অনেকেই হুড়মুড় করে ছাত্রলীগে ঢুকে পড়েছে বা ঢোকানো হয়েছে। ছাত্রলীগকে অনেকে অসৎ উদ্দেশ্যে ওপর থেকে কলকাঠি নাড়েন! তা না হলে এই সংগঠনের সদস্য গত প্রায় দেড় দশকে হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য ইত্যাদি কারণে কেন বারবার খবরের শিরোনাম হবে?

আবরারের মতো আরো অনেককেও এর আগে প্রাণ হারাতে হয়েছে। ২০১০ সালে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে নিজেদের কর্মী নাসরুল্লাহ নাসিমকে মারধর করে ভবন থেকে ফেলে দেওয়া হয়। একই সালে ছাত্রলীগের দুইপক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন ঢাবির মেধাবী ছাত্র আবুবকর সিদ্দিক। একই সালে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারা যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ। এ ছাড়া ২০১২ সালে প্রাণ হারাতে হয় পুরান ঢাকার দরজি বিশ^জিৎ দাসকে। গত দেড় দশকে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এবং অন্য সংগঠনের সঙ্গে কোন্দলে অনেক দলীয় কর্মীর প্রাণ হারানোসহ বহু মানুষকে হতাহত হতে হয়েছে। দোষীদের বিচার হলে আজ হয়তো এই নৃশংসতা আর দেখতে হতো না। ছাত্রলীগ সাধারণ ছাত্রদের অধিকারের কথা বলবে, মানুষের অধিকারের কথা বলবে, দেশের কথা বলবেÑ এমনটিই তো হওয়ার কথা। মুক্তিযুদ্ধের সময় ও আগে এমনটিই দেখা যেত। কিন্তু এখন সাধারণ ছাত্রদের কতটা কাজে আসে এই ছাত্র সংগঠন? উল্টো মাঝে মাঝে সাধারণ ছাত্রদের ও মানুষের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই ছাত্র সংগঠন! অর্থ কামানোর লোভ-লালসাসহ বিভিন্ন কারণে নিজেদের সংগঠনের উদ্দেশ্য বিসর্জন দিয়ে তোষামোদীতে ব্যস্ত হয়ে পড়া ছাত্রলীগের মতো সংগঠনের সঙ্গে যায় না! ভিন্নমত তো বুয়েটের ছাত্র আবরারের নয় অনেকের আছে, তাই বলে কি অনেককেই দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে? ক্ষমতার দম্ভ ও অহংকার দেখিয়ে পার পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না! ছাত্রলীগে ঢালাওভাবে কারা ঢুকে বিভিন্ন অপকর্মের মাধ্যমে এই দলের সর্বনাশ করছে তাদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে সাধারণ মানুষের থেকে আরো বেশি গুণ থাকা দরকার বলে মনে করছেন অনেকেই। জাতির পিতার হাতে গড়া ঐতিহ্যবাহী সংগঠন এভাবে নেতিবাচক কারণে একের পর এক খবরের শিরোনাম হতে পারে না। ছাত্রলীগে ঢুকতে হলে রীতিমতো ভাইভা ও পরীক্ষার মাধ্যমে ঢোকানো উচিত। কেননা, ভিন্নমতের প্রতিশ্রদ্ধাশীল, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, সতর্কতা, ঐতিহ্য ধরে রাখার মানসিকতা, মানবিকতা, সহিষ্ণুতা, সততা, নিষ্ঠা, চারিত্রিক দৃঢ়তাসহ অনেকগুণ এই সংগঠনের সদস্যদের থাকা উচিত।

রাজনীতির নামে শিক্ষাঙ্গনে সব ধরনের অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে। নিরপেক্ষতা যেন আজ সব জায়গায় হারিয়ে যেতে বসেছে! দলীয় প্রক্রিয়ায় বিশ^বিদ্যালয়ে সব ধরনের নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। অপরাধীদের কঠোর শাস্তি ও শুদ্ধি অভিযান চলমান রেখে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের সবাইকে জাগতে হবে, জাগাতে হবে। প্রতিবাদের মানসিকতাই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাবে। প্রশ্নজাগে, ভিন্নমত বা সমালোচনা সহ্য না করে আমরা কি নিজেদের সভ্য বলে দাবি করতে পারি? গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বিলীন হলে আর কী বাকি থাকে! এখন দেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিত হচ্ছে। আমাদেরও কাজেকর্মে মডেল প্রমাণ করতে হবে। আবরারের মতো মেধাবী ছাত্রের চলে যাওয়া মানে তার পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাওয়া। এই ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্র কী দিয়ে পূরণ করবে? দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরও এগোতে হবে। প্রধানমন্ত্রী একের পর এক সাফল্য অর্জন করছেন। দেশটাকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষাঙ্গনে অপরাধমূলক কর্মকান্ড বন্ধ করতে হবেÑ এটাই শেষ কথা।

লেখক : পরিবেশকর্মী ও কলামিস্ট

সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

sadonsarke[email protected]

 

"