পর্যবেক্ষণ

বাস্তবতার নিরিখে ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

জাতিসংঘসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তের রাষ্ট্রনেতারা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে নিন্দাবাদ করেছেন, তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এটা বলা যায় যে, নেতানিয়াহুর ঘোষণার বাস্তবায়ন ঠেকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হবে। কারণ ফিলিস্তিনি ও আরবের মুসলমানের প্রধান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অনৈক্য এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুর্বলতা এর কারণ। অন্যদিকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতা তো রয়েছেই। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কাজেই নেতানিয়াহু আবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হলে পশ্চিমতীরের গুরুত্বপূর্ণ ভূখন্ডের বৃহৎ অংশ ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বে চলে যাবে, এটা বলা যায়। পশ্চিমতীর ফিলিস্তিনের ভূখন্ড এবং ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময়ে ইসরায়েল ওই ভূখন্ড দখলে নেওয়ার পর থেকে ওখানে ইসরায়েলের আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকলেও ইসরায়েল ওই ভূখন্ডে নিজেদের সার্বভৌমত্ব কায়েম করেনি। পশ্চিমতীর ইসরায়েলের পূর্ব সীমানার এক বিস্তৃত ভূমি। মাঝে মৃত সাগর, এর পূর্বে জর্ডান। পশ্চিমে ইসরায়েলের দখলাধীন জেরুজালেমের পশ্চিম সীমানা। মূলত উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম সীমান্তে ইসরায়েলের অবস্থান। ভূমধ্যসাগর অববাহিকার কুলে বিস্তৃত এই ভূখন্ড জর্ডান নদীর পশ্চিমতীরে অবস্থিত হওয়ার কারণে এ ভূখন্ড পশ্চিমতীর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ১৫ শতকের পশ্চিমতীরে প্রথম মানববসতি স্থাপন হওয়ার পর থেকে এ ভূখন্ড অনেক বিদেশি বিজয়ী শাসক কর্তৃক শাসিত হয়েছে পশ্চিমতীর।

এ ভূখন্ডের বর্তমান আয়তন ৫৬৫৫ বর্গকিলোমিটার এবং লোকসংখ্যা প্রায় তিন মিলিয়ন, এর প্রায় সবাই প্যালেস্টাইনি মুসলমান। তবে এখানে এখন দুই শতাধিক অবৈধ ইহুদির বসতি গড়ে উঠেছে। তবে এখানকার মোট সংখ্যার ৩ লাখ ৫ হাজার ইসরায়েলি বাসিন্দা। ১৯৯৩ ও ১৯৯৬ সালে অসলো চুক্তির মাধ্যমে পশ্চিমতীরকে তিনটা অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছিল। ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের মধ্যে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় অসলোতে স্বাক্ষরিত চুক্তির ফলে প্যালেস্টাইন সরকার বা প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষ (পিএ) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং ওই চুক্তির অংশ হিসেবে দখলকৃত পশ্চিমতীর অঞ্চল এ, বি ও সিÑ এ তিনটা ভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অঞ্চল তিনটাকে ভিন্ন ভাগে বিভাজন করা হয়েছিল। পশ্চিমতীরের মোট আয়তনের ১৮ শতাংশ ভূখন্ড এবং মোট জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ বাসিন্দা নিয়ে এ অঞ্চল গঠনের ব্যবস্থা রাখা হয় চুক্তির শর্তানুযায়ী। গঠিত হয়েছিল পশ্চিমতীরের মোট ভূখন্ডের ২০ শতাংশ ভূমি নিয়ে এবং ওখানকার জনসংখ্যা ছিল পশ্চিমতীরের মোট জনসংখ্যার ৪১ শতাংশ। গঠিত হয় পশ্চিমতীরে মোট ভূখন্ডের ৬২ শতাংশ ভূখন্ড নিয়ে; যার জনসংখ্যা ছিল পশ্চিমতীরের মোট জনসংখ্যার ৫.৮ শতাংশ। এই সি-অঞ্চলের অংশ হলো জর্ডানভ্যালি ও উত্তর মৃতসাগর অঞ্চল। সি-অঞ্চলে প্যালেস্টাইনি অধিবাসীর সংখ্যা হলো ৬৫ হাজার এবং ইসরায়েল বসতি অধিবাসীর সংখ্যা হলো প্রায় ১১ হাজার। এ, বি ও সি অঞ্চলের মধ্যে সি অঞ্চল হলো গুরুত্বপূর্ণ উর্বর ভূমি। ওখানটায় প্রাকৃতিক সম্পদের ৮৬ শতাংশ রিজার্ভ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

আর পশ্চিমতীরের মোট বনাঞ্চলের ৯১ শতাংশ বনাঞ্চলই সি অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। কৃষি ও জ্বালানি অঞ্চলখ্যাত সি অঞ্চল তাই গোটা পশ্চিমতীরের মধ্যে আকর্ষণীয় এবং ভূ-কৌশলগত কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া সি অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম একটা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত। বিভাজিত তিনটি অঞ্চলের মধ্যে সি অঞ্চল এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, জর্ডানভ্যালি এবং উত্তরে মৃতসাগরের মোট জমির ৯০ শতাংশই সি অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং এ অঞ্চলের অসলো চুক্তির শর্তানুযায়ী পূর্ব হতেই ইসরায়েলের পূর্ণাঙ্গ বেসামরিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীনে রয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণা স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ এ কারণে যে, প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সি অঞ্চলের গুরুত্ব সর্বাধিক। সি অঞ্চল প্যালেস্টাইনিদের হাতছাড়া হয়ে গেলে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, একটা শক্তিশালী প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র কায়েমের চূড়ান্ত আকাক্সক্ষা হোঁচট খাবে। সি অঞ্চল তথা জর্ডান উপত্যকা এবং উত্তর মৃতসাগরে ইসরায়েলি দখল ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার যেকোনো প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে মারাত্মকভাবে অস্থিতিশীল করে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে। জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই পরিকল্পনা পুরো অঞ্চলকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেবে। স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আটকে আছে বিশ্বরাজনীতির মারপ্যাঁচে। অন্যদিকে, স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ যে ৪৫ শতাংশ ভূমি বরাদ্দ রেখেছিল, তাও কমে যাচ্ছে হিংসা ইসরায়েলের থাকায়।

উল্লেখ্য যে, ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোরের ঘোষণার আলোকে প্যালেস্টাইনকে বিভক্ত করে ইহুদিদের জন্য একটা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাস হয়েছিল জাতিসংঘে সেই ১৯৪৮ সালে। গৃহীত প্রস্তাবে ইসরায়েলের জন্য ৫৫ শতাংশ ভূমি বরাদ্দ করা হয়েছিল এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল জাতিসংঘ। পক্ষান্তরে স্বাধীন প্যালেস্টাইনের জন্য ভূমি বরাদ্দ ছিল ৪৫ শতাংশ। তবে তখন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দেয়নি জাতিসংঘ এবং অদ্যাবধি সেই স্বীকৃতি পায়নি প্যালেস্টাইন। এমনকি প্যালেস্টাইনি ভূখন্ড বিভক্ত করে প্যালেস্টাইন ও ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও প্যালেস্টাইনের বুকের ওপর ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করে ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইনের মধ্যে যে চির অশান্তির বীজ বপন করা হয়েছিল তার প্রভাবে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল অস্থিতিশীল ও বিশ্বের অন্যতম যুদ্ধপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। ঘটনা কোনদিকে মোড় নিতে পারে, তা অনুমান করা অসম্ভব কিছু নয়। কারণ, বিশ্ব সম্প্রদায়ের তীব্র প্রতিবাদের মুখেও ইসরায়েল জেরুজালেমে তার দেশের রাজধানী স্থানান্তর করেছে। শত ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ উপেক্ষা করে গোলান মালভূমিকে ইসরায়েল তার সার্বভৌমত্বের অধীনে নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে জর্ডানভ্যালি ও উত্তর মৃতসাগর পর্যন্তও ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব সম্প্রসারিত এবং প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মনে করা যায়। অপরদিকে জর্ডান উপত্যকার ২৪০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি, যা প্রস্তাবিত স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য, সেটা যদি ইসরায়েল তার ভূখন্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করে নেয়; তবে ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি এবং এর ফলে প্রাপ্ত বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যাবে বলেছেন প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পার বাস্তবায়ন হলে ইসরায়েলিরা পশ্চিমতীরে বেশির ভাগ ফিলিস্তিনি ভূমি অঞ্চল ঘিরে ফেলবে, ফলে সম্ভবত দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের এত দিনের চেষ্টার কফিনে চূড়ান্ত পেরেক চালাবে ইসরায়েল। সেক্ষেত্রে প্যালেস্টাইনি জনগণের ভবিষ্যৎ কী হতে পারেÑ এটা একটা প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে প্যালেস্টাইনিদের মধ্যে।

অন্যদিকে আমেরিকান একটি উদারপন্থি লবি জে স্ট্রিট বলেছেন, নেতানিয়াহুর এই পরিকল্পনা-ইসরায়েল গণতন্ত্রকে ধ্বংস করবে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করবে। রাশিয়াও নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার নিন্দা করেছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে যে, এই পদক্ষেপ এই অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং ইসরায়েল ও এর আরব প্রতিবেশীদের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা ক্ষুণœ করতে পারে। মোটামুটি এটা লক্ষণীয় যে, নেতানিয়াহুর ঘোষণায় বিশ্ববাসীর মধ্যে বিরূপ এক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে, যদিও আমেরিকা নীরব রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সরকারগুলোর স্বপ্নগুলো বিভক্ত, যা বিভিন্ন পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ করছে না। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। যতক্ষণ পর্যন্ত আধিপত্য ও ক্ষমতার উচ্চাকাক্সক্ষা রাজনীতিতে থেকে যাচ্ছে ততক্ষণ আরো যুদ্ধ ও মুখোমুখি অবস্থানের দিকেই ধাবিত হতে হবে। এক সরকারের স্বপ্ন প্রায়ই অন্য সরকার অপসারিত করে। অন্যদিকে মাদ্রিদের টলেডো ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর পিসের মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় প্রোগ্রামের পরিচালক জন বেল বলেছেন, মনে হচ্ছে আমরা এমন একটি অবস্থায় আছি; যেখানে অনেক স্বপ্ন আছে; কিন্তু ইতিবাচক বাস্তবতার অভাবে কিছু সরকার মধ্যপ্রাচ্যের সমাজগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। অথচ এ সমাজগুলোই রাজনৈতিক কৌশলকে পরিহার করলে শান্তি ও সমৃদ্ধির একই স্বপ্নে ঐক্যবদ্ধ। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি নাগরিক সমাজের উত্থান অপরিহার্য। এভাবে কেবল সম্ভাব্য এমন সমাজের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য শান্তির সাধারণ স্বপ্নের একটি সুযোগ নিতে পারে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"