অনুসন্ধান

পৃথিবীর বয়স ৪৫৪ কোটি বছর

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

ঠিক কখন পৃথিবী তৈরি হয়, তা কেউই সঠিকভাবে বলতে পারেন না। তবে ধারণা করা হয়, সৌরজগৎ সৃষ্টির মোটামুটি ১০০ মিলিয়ন বছর পর একগুচ্ছ সংঘর্ষের ফল হলো পৃথিবী। আজ থেকে ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী নামের গ্রহটি আকৃতি পায়, পায় লৌহের একটি কেন্দ্র এবং একটি বায়ুমন্ডল। তাই ইতিহাসের ক্রমবর্ধমান ধারায় যদি বলতে হয়, তবে পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫৪ (+/-) ৫ কোটি বছর। এই বয়স উল্কার রেডিওমেট্রিক বয়স নির্ণয় থেকে প্রাপ্ত এবং প্রাপ্ত সবচেয়ে প্রাচীন পার্থিব ও চাঁদের পাথরের রেডিওমেট্রিক বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে রেডিওমেট্রিক বয়স নির্ণয় পদ্ধতি আবিষ্কারের পর ইউরেনিয়াম-সিসা বয়স নির্ণয় পদ্ধতিতে দেখা যায়, ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধ খনিতে এমন সিসা বিদ্যমান, যার বয়স ১০০ কোটি বছরের বেশি হবে। এ ধরনের খনি থেকে প্রাপ্ত সবচেয়ে পুরোনো ছোট ও স্বচ্ছ বস্তু হলো গোমেদন্ডমণি, যা পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার জ্যাক হিলস নামক স্থানে পাওয়া যায়, যার বয়স কমপক্ষে ৪৪০.৪ কোটি বছর। সৌরজগতে গঠিত উল্কাপিন্ডের মধ্যে ক্যালসিয়াম-অ্যালুমিনিয়াম সমৃদ্ধ সবচেয়ে প্রাচীন কঠিন বস্তুর বয়স প্রায় ৪৫৬.৭ কোটি বছর।

পৃথিবীর বয়স প্রায় ৫ কোটি বছর হলেও আজও মানবজাতির মানবিক কার্যক্রম অনেকের কাছেই অচেনা। অনেক জায়গার অনেক মানুষের কাছে মানবিক কার্যক্রমের বার্তা কখনোই পৌঁছেনি। আজ থেকে প্রায় শত বছর আগে মানুষের মানবিক অবস্থা আজকের মতো ছিল না। বর্তমানে বিশ^জুড়ে নিজ নিজ জনগণের কাছে সাহায্য পৌঁছানোর প্রধান দায়িত্বে রয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিভিন্ন সংগঠন ও বেসরকারি নানা ফাউন্ডেশন। তবু অনেকাংশে মানবিক সংকটে রয়েছে মানুষের জীবন। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর বিশ^জুড়ে মানুষের জীবন রক্ষা ও সুরক্ষাদানে অসাধারণ কিছু কাজ সম্পাদন হয়েছে সত্য তবু মানুষের সর্বোচ্চ প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা চালাতে গিয়ে মানবিক ব্যবস্থা রয়েছে পুরোপুরি চাপের মধ্যে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ পরবর্তীকালে সারা পৃথিবীতে নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় সংঘাত এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সহিংসতার কারণে প্রায় ৬ কোটি মানুষ বাস্তুহারা ও রাষ্ট্রহারা হয়েছে। আর দুর্যোগে বিশে^ প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ২১ কোটি ৮০ লাখের মতো মানুষ।

ধারণা করা হচ্ছে, মানবিক সংকট পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে চলমান রয়েছে। এতে বিশ^ অর্থনীতির ওপর ক্রমশ মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতি বছর বিশে^ মানবিক সংকটে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় অযুত কোটি। মানবিক ফূকট সংশ্লিষ্ট দেশের সব উন্নয়নের অর্জন আকস্মিক থামিয়ে দেয়। কোথাও কোথাও উন্নয়নের অর্জন পেছনের দিকে নিয়ে যায়। বিশে^ মানবিক সংকটে উনিশের দশকে জাতিসংঘ বিভিন্ন দেশকে সহায়তা করত ৩৪০ কোটি ডলার। আর সর্বশেষ ২০১৬ সালের তথ্যানুযায়ী এ সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার কোটি ডলারে।

বিশে^র মানবিক সংকট মোকাবিলায় ২০১৬ সালের ২৩ ও ২৪ মে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন একটি বিশ^ মানবিক শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। জাতিসংঘ সৃষ্টির ৭০ বছরের ইতিহাসে সে সম্মেলনই ছিল প্রথম। যা ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হয়। বিশ^ মানবিক শীর্ষ সম্মেলনের মানবিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত বা অসহায় মানুষের প্রয়োজন কীভাবে মেটানো যায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া যায়; সে বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় পরামর্শ পরিচালনার জন্য ওসিএইচএ জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচিকে (ইউএনডিপি) অংশীদার করে বিশ^ মানবিক শীর্ষ সম্মেলন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত হয়।

বিশে^ মানবিক সংকট কতটুকু, তা অবহিত হতে জাতিসংঘ বিশে^র মোট ১৫৩টি দেশের ২৩ হাজারের অধিকসংখ্যক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে আরো হাজার হাজার বক্তব্য গ্রহণের পাশাপাশি বিশে^র বিভিন্ন স্থান থেকে ৫ হাজার ৫০০-এর বেশি অনলাইন মন্তব্যও পাঠানো হয়। এসব মন্তব্যে এমন একটি বিশে^র রূপকল্প রচনার দাবি গড়ে ওঠে, যেখানে মৌলিক মানবতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে; সেখানে রক্ষা করার মতো এমন কোনো সংকটে কেউ পড়বে না; মানিবক সংকটে কেউ মারা যাবে না; কেউ অভুক্ত থাকবে না কিংবা রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা সাহায্য করার মতো সম্পদের অভাবে সে সংঘাতের শিকার হবে না।

১৯৯১ সালে আন্তর্জাতিক মানবিক ব্যবস্থা সৃজন সম্পর্কিত সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব গ্রহণের পর মানবিক দৃশ্যপটে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। যেসব কারণে মানবিক চাহিদা সৃষ্টি হয়, সেগুলো কেবল মানুষের সংখ্যাই বাড়িয়ে তুলছে, সংকটের মুখে মানুষ আরো বেশি অসহায় হয়ে পড়ছে। মানবিক সংকট কেন সৃষ্টি হয়, তা পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখা গেছে, বিশে^র জলবায়ুর পরিবর্তন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অসমতা, খাদ্য মূল্যে পরিবর্তনশীলতা এবং সম্পদের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে মানিবক ফূকটের সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া দ্রুত এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘এক মানবতা : শরিকানামূলক দায়িত্ব’ শিরোনামে বিশ^ মানবিক শীর্ষ সম্মেলনের রিপোর্ট উন্মোচন করেন। রিপোর্টে ব্যাপক পরামর্শ এবং ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা, শান্তি কার্যক্রম ও মানবিক অর্থায়ন-সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের প্যানেল; জাতিসংঘ শান্তি বিনির্মাণশৈলীর ২০১৫ সালের পর্যালোচনা; নিরাপত্তা পরিষদের নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রস্তাব ১৩২৫ (২০০০)-এর পর্যালোচনা; সেন্দাই দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমন ২০১৫-২০৩০ ও ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু পরিবর্তন চুক্তিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার প্রাপ্ত ফলাফল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

রিপোর্টে মহাসচিব মানবতা, মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও এগিয়ে যাওয়ার অধিকারকে বৈশি^ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূলে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন এবং এই রূপকল্প অনুযায়ী কাজ করতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ও কৌশলগত রদবদল প্রয়োজন, তা তুলে ধরে মানবতার এজেন্ডা উপস্থাপন করেছেন। পাঁচটি মূল দায়িত্বের প্রতি সমর্থন দেওয়ার জন্য তিনি সদস্য রাষ্ট্রগুলো, জাতিসংঘ ও মানবিক সংগঠনগুলো এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক অংশীজনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ পাঁচটি দায়িত্ব হলেন (১) সংঘাত রোধ ও অবসাদে রাজনৈতিক নেতৃত্ব; (২) মানবতা রক্ষার নিয়মাচার সমুন্নত রাখা; (৩) কাউকে পেছনে ফেলে না রাখা; (৪) সাহায্য প্রদান থেকে সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজনের অবসান ঘটানোর মাধ্যমে মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনা ও (৫) মানবতার বিনিয়োগ করা। মানবতার এজন্ডার এই পাঁচটি মূল দায়িত্বের এক সমাহারে মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার এবং সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও সংকটে সাড়া দানের মাধ্যমে মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে বিশ^ সম্প্রদায় যেভাবে কাজ করে, তাতে বড় ধরনের একটা পরিবর্তন আনার মতো সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশে^ প্রতি বছর ৮ অক্টোবর লাখ লাখ নারী, পুরুষ ও শিশুর জীবনে একটি প্রকৃত ভিন্নতা আনতে বিশ^ মানবিক তৎপরতা দিবস পালিত হয়। মানবিক সংকটে সারা বিশে^র ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ মানুষকে সহায়তা দানে দায়বদ্ধতার জন্য এ দিবসটি পালিত হয়ে থাকে।

লেখক : কলামিস্ট

[email protected]

 

"