মতামত

রক্ষা করি মা ইলিশ

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

আরিফুল ইসলাম সুমন

বাংলায় অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি প্রবাদ ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। এই প্রবাদ বাক্যটির দ্বারা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায় বাঙালি জাতির সঙ্গে মাছ ও ভাতের সম্পর্ক কতটা অবিচ্ছেদ্য। আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশ। বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ইলিশ। বেশির ভাগ বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় একটি মাছ। স্বাদে-গন্ধে ও বর্ণে লোভনীয় এ মাছ। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন থেকে শুরু করে বিভিন্ন উৎসবে ও অতিথি আপ্যায়নে ইলিশ যেন অপরিহার্য একটি খাবার। যে মাছের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা এত বেশি; সেই মাছের সংরক্ষণ ও পরিচর্যা কতটা জরুরি, তা বলার আর অপেক্ষা থাকে না।

ইলিশ অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডের আধার। ইলিশে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড যা মানবদেহের কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এ ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ‘এ’ এবং ‘ডি’। মানবস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিবিহীন পুষ্টির উৎস এই মাছ।

মা ইলিশ বলতে প্রজননক্ষম পরিপক্ব স্ত্রী ইলিশ মাছ বোঝায়। ইলিশ একটি সামুদ্রিক মাছ। ইলিশ আহরণে প্রথম বাংলাদেশ। বিশ্বে আহরিত ইলিশের প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ আহরণ করা হয় এই দেশে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়; যার মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চিরদিনের জন্য স্থান পেল বাংলার ইলিশ।

মা ইলিশ নিধনরোধে এবং ইলিশের অবাধ প্রজনন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় আজ ৯ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর অর্থাৎ ২২ দিন (২৪ আশ্বিন থেকে ১৪ কার্তিক) ইলিশ প্রজনন এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এ সময় ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্রের চারটি পয়েন্ট দ্বারা পরিবেষ্টিত ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় সব নদ-নদীতে এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। চারটি পয়েন্ট হলোÑ মিরসরাই, চট্টগ্রামের মায়ানি, তজুমুদ্দিন ও ভোলার পশ্চিমে সৈয়দ আউলিয়া, কুতুবদিয়া ও কক্সবাজারের উত্তর কুতুবদিয়া এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও লতাচাপালী পয়েন্ট। এ সময়ে সারা দেশে ইলিশ মাছের আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ এবং কেনাবেচা নিষিদ্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞার আইন অমান্যকারীকে কমপক্ষে ১ বছর থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর সশ্রম কারাদন্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা যাবে।

অন্য অনেক মাছ, কাঁকড়া কিংবা চিংড়ির মতো ইলিশ মাছও প্রজননের ক্ষেত্রে চন্দ্রনির্ভর আবর্তন অনুসরণ করে। প্রতি বছর আশ্বিন মাসের প্রথম উদিত চাঁদের পূর্ণিমার আগের চার দিন, পরের ১৭ দিন এবং পূর্ণিমার দিনসহ মোট ২২ দিন এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১১ দিন, ২০১৫ সালে ১৫ দিন নিষেধাজ্ঞা জারি থাকলেও ২০১৭ সালে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়িয়ে ২২ দিন করা হয়। ইলিশ মূলত সারা বছর কমবেশি ডিম ছাড়লেও সেপ্টেম্বর-অক্টোবর হচ্ছে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম। এ সময়েই প্রায় ৮০ শতাংশ ইলিশ ডিম ছাড়ে।

বৈচিত্র্যময় জীবন ইলিশের। ইলিশ প্রধানত সামুদ্রিক মাছ হলেও প্রজননকালীন এ মাছ ডিম ছাড়ার জন্য বেছে নেয় স্বাদুপানির উজানকে। এ সময় এরা বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতের নদীতে আগমন করে। যেমনটা বাঙালি কোনো সন্তানসম্ভবা মেয়ের বাবার বাড়িতে যাওয়ার মতো। এ সময়ে বর্ষায় এ দেশের নদীগুলো ‘মা’ ইলিশে ভরে ওঠে। এ সময়ে ইলিশ দৈনিক প্রায় ৭১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। প্রজননের উদ্দেশ্যে ইলিশ প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার উজানে পাড়ি দিতে সক্ষম। সাগর থেকে ইলিশ যত ভেতরের দিকে আসে, ততই শরীর থেকে লবণ কমে যায়। এতে স্বাদ বাড়ে ইলিশের। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৯-১০ শতাংশ হারে বাড়ছে ইলিশের উৎপাদন।

আশা করা যাচ্ছে, চলতি বছর ইলিশের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার টন, সেখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেড়ে ৫ লাখ ১৭ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ ইলিশের উৎপাদন দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতে ২০০২ সাল থেকে ২০১৮ সালে ইলিশের জোগান ৫৬ শতাংশে কমেছে, সেখানে বাংলাদেশে ১৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে জাটকা আজ মেঘনা থেকে পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমায় বিস্তৃতি লাভ করেছে। গত ৯ বছরের ব্যবধানে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ৬৬ শতাংশ। সামনের মৌসুমে বেড়ে ৬ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে, যার বাজারমূল্য ১৮ হাজার কোটি টাকা। ইলিশ দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন বিদেশে রফতানি ছাড়াও ইলিশের নুডলস, স্যুপ ও পাউডার তৈরির প্রযুক্তি আবিষ্কারের ফলে ইতোমধ্যে তা বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফলাফল বলছে, ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার আশপাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীতে এই মাছ পাওয়া যাচ্ছে। পদ্মার শাখা নদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, একটি ইলিশ একসঙ্গে কমপক্ষে ৩ লাখ ও সর্বোচ্চ ২১ লাখ ডিম ছাড়ে। এসব ডিমের ৭০-৮০ শতাংশ ফুটে রেণু ইলিশ হয়। এর সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে, যা পরবর্তীতে ইলিশে রূপান্তরিত হয়। ইলিশ শুধু জাতীয় মাছ ও সম্পদ নয়। বহু মানুষের জীবন-জীবিকা ইলিশের ওপর নির্ভর করে। উপকূলীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রায় পাঁচ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি জড়িত। এ ছাড়া ২০ থেকে ২৫ লাখ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইলিশ পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রফতানি ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত। নিষিদ্ধকালীন বর্তমান সরকার নিবন্ধিত জেলেদের ভিজিএফের (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) আওতায় পরিবারপ্রতি ২০ কেজি চাল দিয়ে থাকে পাশাপাশি এ সময় জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মৎস্যজীবী জেলে ও ইলিশ আহরণের পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নসহ গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

জাতীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ইলিশের। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি আসে ইলিশ থেকে। মোট মৎস্য উৎপাদনের ১২ ভাগই হচ্ছে ইলিশ। এ মাছের চাহিদা রয়েছে পৃথিবীর প্রায় সারা দেশেই। প্রতি বছর ইলিশ রফতানি করে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হচ্ছে। প্রজননক্ষম মা ইলিশ ও জাটকা ধরা বন্ধ থাকলে ২১ থেকে ২৪ হাজার কোটি পরিপক্ব ইলিশ পাওয়া যাবে; যা থেকে সাত হাজার কোটি টাকা মূল্যের ইলিশের বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের।

জাতীয় মাছ ইলিশের মোট উৎপাদনের ৭৫ ভাগই বাংলাদেশে হচ্ছে। সম্ভাবনার ইলিশকে তাই রক্ষা করতে হবে যেকোনো মূল্যে। এটা করতে হবে নিজেদের স্বার্থেই। বর্তমানে ২০ মে থেকে ৬৫ দিনের জন্য বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার; যার ফলে সমুদ্রে ইলিশের পাশাপাশি অন্যান্য সামুদ্রিক প্রজাতির উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঠিক তত্ত্বাবধানে মৎস্য অধিদফতর, প্রশাসন ও বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করায় দেশব্যাপী ইলিশের বিস্তৃতি ও উৎপাদন বেড়েছে। এ ছাড়া ওয়ার্ল্ড ফিশ এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ইলিশ নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। সরকারের পদক্ষেপের পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের সচেতন হতে হবে এ ব্যাপারে। সরকার, মৎস্যজীবী এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই গড়ে উঠবে রুপালি ইলিশে ভরপুর বাংলাদেশ।

লেখক : সহকারী প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতর, মৎস্য ভবন

রমনা, ঢাকা

 

"