মুক্তমত

প্রাথমিকে নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন

আধুনিক সভ্যতার এ যুগে অন্তর্জালে আবদ্ধ নতুন প্রজন্ম। বেড়ে উঠছে তাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যকে ডিঙিয়ে। তাদের চিন্তাভাবনার পরিসর বিস্তৃত, রয়েছে তথ্যজালে নিমিষে ঢুকে পড়ার অবারিত সুযোগ। বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীরা শুধু মা-বাবা ও শিক্ষক দ্বারা প্রভাবিত নয়, বরং তারা প্রভাবিত হচ্ছে ইন্টারনেট, ফেসবুকসহ আধুনিক সব যোগাযোগমাধ্যম দ্বারা। সেক্ষেত্রে তাদের অনুশাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ রাখাটা বড়ই চ্যালেঞ্জিং।

মূল্যবোধ হলো এমন কিছু দিকনির্দেশনা, যা অনুসরণের মাধ্যমে একজন মানুষ খুব সহজে নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। জন্মগতভাবে কারো মধ্যে এই গুণগুলো আপনা-আপনি আসে না, বরং জন্মের পর একজন মানব শিশু তার পারিপার্শ্বিক শিক্ষা ও জীবনের অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে এ বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করে থাকে। সেক্ষেত্রে একটি শিশুকে তার শিক্ষার প্রারম্ভিক স্তর থেকেই নৈতিকতা শিক্ষা প্রদান করাটা অতি জরুরি।

পাঠ্যক্রমের সঙ্গে নৈতিকতা শিক্ষার যোগসূত্র একজন শিক্ষার্থীর চিন্তার গভীরতাকে আরো সুদৃঢ় করে তোলে। সমাজব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয়কে একীভূত করে সে বিষয়গুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ, সহজীকরণ, গ্রহণযোগ্যতা যাচাই সম্পর্কে যে ধারণা লাভ সম্ভব, তা কেবল পাঠ্যক্রম ও নৈতিকতা শিক্ষার মাঝে যোগসূত্র স্থাপনের মাধ্যমে সম্ভব। এভাবে নৈতিকতাসম্পন্ন একজন মানুষ আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

একজন শিশুর শিক্ষাজীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীলতা, অভিযোজন ক্ষমতা, অধিকার সচেতনতা। পরিবারই হচ্ছে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রথম ধাপ এবং তার পরবর্তী ধাপ হচ্ছে প্রাক-প্রাথমিক বা প্রাথমিক বিদ্যালয়। তার বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় পরিবারের গন্ডির বাইরে পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে খাপখাইয়ে চলতে গিয়ে তারা আরো বেশি শেখার সুযোগ পায়।

সামাজিকীকরণের এ প্রক্রিয়ায় শিশুরা নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ লাভ করে। ফলে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যে নৈতিক ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেহেতু পরিবারের পরপরই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চারণক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত, তাই শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। জীবনের শেষ আলোটুকু দিয়ে হলেও একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পেরে তৃপ্তি পান শিক্ষক। আর শিক্ষার্থীর হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যান প্রাজ্ঞের মতো। ভালো ফলাফল করতে উৎসাহ প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে ভালো মানুষ তথা সত্যিকারের মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখান।

উন্নত বিশ্বে শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক স্তরেই অর্থাৎ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও প্রাক-প্রাথমিকে শিশুদের নৈতিকতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান করা হয়ে থাকে। স্কুলে প্রবেশ থেকে শুরু করে প্রস্থান পর্যন্ত সব বিষয়ে সাম্যাবস্থা বজায় রাখার মানসিকতা যেমন; একই ধরনের খাবার গ্রহণ, একে অন্যকে সহযোগিতা প্রদান, পোশাক-আশাক সব বিষয়ে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের মধ্যে নৈতিকতার বীজ বপন করে দেওয়া হয়।

মানসম্মত ও গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকল্পে কোমলমতি শিশুদের মাঝে নৈতিকতা শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে জেলা প্রশাসক হিসেবে রয়েছে কিছু সামাজিক দায়িত্ববোধ। আর তারই অংশ হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নৈতিকতা শিক্ষা ডায়েরি চালু করা হয়েছে। যেখানে শিশুরা প্রতিদিনের ভালো কাজের বিবরণ, কাউকে সাহায্য করেছে কি না, মিথ্যা কথা বলেছে কি না, মিথ্যা কথা বলে থাকলে তাতে কোনো ধরনের লাভ হয়েছে কি না, মা-বাবার কথা শুনেছে কি না, কারো সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে কি না, সব হোমওয়ার্ক নিজে করেছে কিং না বা কারো সাহায্য নিয়ে থাকলে কার সাহায্য নিয়েছে, মা-বাবাকে নিজে থেকে কোনো কাজে সহযোগিতা করে থাকলে তা কী ধরনের কাজÑ এমন ১০টি প্রশ্নের উত্তর প্রতিদিন লিখবে। যার সাহায্যে একজন শিক্ষার্থী আত্মসমালোচনার মাধ্যমে তার শিক্ষক ও অভিভাবকের সহায়তায় নৈতিকতাসম্পন্ন আদর্শ একজন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।

শিশুরাই এক দিন শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ হয়ে দেশের হাল ধরবে এবং সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবে। সে কতটুকু জাতীয় চেতনা বা আদর্শ ধারণ করবে কিংবা সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি কতটুকু দায়িত্বশীল হবে; তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার শৈশবের শিক্ষার ওপর। নীতিনৈতিকতা বা আদর্শের এই বীজ রোপিত হয় পরিবারে, এরপর প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বর্তমান সরকার মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করছে। উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়নে বর্তমান প্রজন্মকে এখন থেকে প্রস্তুত করতে হবে।

লেখক : জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম

 

"