মতামত

দেশে পর্যটনশিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

মজিবর রহমান

পর্যটকদের কাছে পর্যটন চক্ষু জুড়ানোর ব্যাপার হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পর্যটনের গুরুত্ব বহুবিধ। অবশ্য এ চক্ষু জুড়ানোর ব্যাপারটি যে, সব পর্যটকের বেলায় সমভাবে প্রযোজ্য, তা নয়। অনেকেই আছেন যারা শুধু দেখতে যান না, শিখতেও যান। তারা একদিকে প্রকৃতির রহস্যময়তা খোঁজেন, অন্যদিকে জীবন-জীবিকা ও পরিপার্শ্বের সঙ্গে সেই প্রকৃতির সংযোগ প্রত্যক্ষ করেন। রূপ সন্দর্শনের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় নিজেকে পুষ্ট করার অভিলাষীও থাকেন অনেকে। রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি আবার কিছুটা ভিন্নতর, তার চোখ থাকে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর; পর্যটকের আনাগোনা বাড়লে সেটি সম্ভবপর হয়। বিদেশি পর্যটক হলে সুবিধা আরো বেশি; দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়, পাশাপাশি বাড়ে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান।

পর্যটন হচ্ছে সেবা খাতের অন্তর্ভুক্ত একটি খাত। মোট দেশজ উৎপাদনে সেবা খাতের অবদান ক্রমাগত বাড়ছে, পর্যটনশিল্প সেই অবদানে গতি সঞ্চার করে জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতিকে আরো ঊর্ধ্বমুখী করে তুলতে পারে। খাতটি বর্তমানে বেশ সম্ভাবনাময়। দেশের মানুষের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আগের তুলনায় অধিক নগদ অর্থের মালিক, ঘোরাফেরায় অর্থ ব্যয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন তারা। বিদেশিরাও বাংলাদেশকে চিনতে শুরু করেছে। আয়তনে ছোট হলেও এর আনাচে-কানাচে অনেক কিছুই আছে দেখার মতো। পর্যটকদের আকৃষ্ট হওয়ার চিরায়ত স্পট বন-পাহাড়-সমুদ্র তো আছেই, আছে অনিন্দ্য সুন্দর হাওর ও চরাঞ্চল; যা একান্ত ব্যতিক্রম। দেখানোর ব্যবস্থা করাই এখন মূল বিবেচনার বিষয়। এ ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও ২০১০ সালে গঠিত বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। রয়েছে ১৯৯২ সালে প্রণীত পর্যটন নীতিমালা। নীতিমালাটি হালনাগাদ করা হয়েছে কি না, জানা নেই। না করা হলেও আক্ষেপ নেই, কেননা সারকথা যা বলার তা মোটামুটি বলা আছে এতে। মোদ্দাকথা, পর্যটনের বিকাশে অবকাঠামো উন্নয়নসহ যাবতীয় কার্যাদি সম্পন্ন করা এসব প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালার উদ্দেশ্য।

দুই.

দেশের দর্শনীয় স্থানগুলোর তথ্য প্রদান কিংবা প্রচার পর্যটন করপোরেশনের আওতাধীন। বিভিন্ন জায়গায় তাদের হোটেল-মোটেল আছে। সংস্থাটির প্রচার খুব দৃশ্যমান না হলেও বিভাগওয়ারি কিছু না কিছু তথ্য তাদের কাছ থেকে মেলে। পর্যটনের জন্য সিলেট বিভাগ বেশ আকর্ষণীয়, অনেক মনোরম স্থান আছে ওই বিভাগে। কিন্তু পর্যটন করপোরেশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যে আছে কেবল সিলেট-মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জের বিভিন্ন স্থানের কথা, সুনামগঞ্জের কথা নেই। অথচ সুনামগঞ্জেই আছে ব্যতিক্রমী সব স্পট, বলতে গেলে পুরো জেলাই দেখার মতো। ভিন্নতর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য তার জুড়ি নেই। সুনামগঞ্জ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এমন একটি জেলা, যেটিকে জালের মতো বেষ্টন করে আছে সুরমা, পাটনাই, জাদুকাটা প্রভৃতি নদী। ঘিরে আছে টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওর, দেখার হাওর, মাটিয়াল হাওর, খরচার হাওর, কান্দার হাওরসহ বিভিন্ন হাওর। হাওরগুলোর মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত ও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃত; সে কথা হয়তো জানেন সবাই। তাহিরপুর ও ধরমপাশা উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত এ হাওরের সুরক্ষায় সরকারও সচেষ্ট। কিছুদিন আগে হাওরাঞ্চলে ঘোরাফেরার জন্য সুনামগঞ্জ গিয়েছিলাম, আগেও গেছি কয়েকবার; কখনো শুকনো মৌসুমে, কখনোবা ঘোর বর্ষায়। কিন্তু এবারকার মতো এত বিপুল ঘোরাফেরা হয়নি কখনো। জ্যোৎস্না প্লাবিত রাতে হাওরে ভ্রমণ ও সঙ্গে নেওয়া লোকশিল্পীদের সুরে দোল খেতে খেতে নৌকায় রাত্রিযাপন এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

সুনামগঞ্জের প্রতি পর্যটন করপোরেশনের দৃষ্টি না পড়লেও ভ্রমণপিপাসুদের দৃষ্টি ইতোমধ্যে পড়ে গেছে। দলে দলে লোক যাচ্ছে সেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। তাহিরপুরের একটি ব্রিজ অনেকটাই বদলে দিয়েছে দুর্গমতার অপবাদ। অন্তত টাঙ্গুয়ার হাওর এবং পার্শ্ববর্তী অন্য হাওর ও নদীতে যাতায়াত আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। হাওর-নদী যে সেখানে বর্ষায় একাকার এ তথ্যটি হয়তো জানা আছে অনেকের। টাঙ্গুয়ার হাওরের অপর প্রান্তে রয়েছে সীমান্ত-পাহাড়ঘেঁষা নীলাদ্রি লেক। পর্যটকদের জন্য স্থানটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে সম্প্রতি, যেমন নতুন আকর্ষণ কুড়াচ্ছে সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরমন্ডিত জলস্রোত। তো সেই নীলাদ্রি লেকে বা টাঙ্গুয়ার হাওরের অন্যপ্রান্তে যেতে জাদুকাটা নদীর ওপর যে ব্রিজটি নির্মিত হচ্ছে; সেটি হলে দুর্গমতা আরো কমে যাবে। এই জাদুকাটা নদীর উৎস পর্যবেক্ষণ করা যায় অনতিদূরের বারেকের টিলা থেকে। নীলাদ্রি লেক সন্নিকটে টাঙ্গুয়ারের জলাভূমিতে গড়ে উঠেছে আরেক ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা; ওয়াশরুম, ঘুমানোর বিছানাদি, খাওয়া-দাওয়াসহ নৌকায় রাত্রিযাপনের সুযোগ।

বাস্তবতা যা চাক্ষুষ করেছি তা হলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠার কারণে টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ বেশি। তাহিরপুর ও ধরমপাশা এই দুই উপজেলার ৪৬টি গ্রামজুড়ে এর বিস্তার, রয়েছে সেখানে ১৪০ প্রজাতির মৎস্য ও জলজ উদ্ভিদ। আছে হিজল, করচের মতো জলজ বৃক্ষ; যার পর্যাপ্তসংখ্যকের দেখা মেলে সিলেটের রাতারগুলের জলবনে। শীতকালে অতিথি পাখির কলরবে মুখর থাকে টাঙ্গুয়ার হাওর। তাহিরপুরের যে সেতুটির কথা আগে বলেছি; সেটি বদলে দিয়েছে চালচিত্র, ভ্রমণপিপাসু প্রচুর মানুষের আগমন ঘটছে সেখানে। অনেকেই যাচ্ছেন চন্দ্র মাস হিসাব করে, জ্যোৎস্না উপভোগের উদ্দেশ্যে। টাঙ্গুয়ার হাওরসহ সমগ্র হাওরাঞ্চলের চিত্র অনেকটা অভিন্ন; বছরের ৬ মাস পানির নিচে, বাকি ৬ মাস পানির ওপর থাকে। প্রথমোক্ত ৬ মাস মৎস্যের আর পরের ৬ মাস ফসলের ভান্ডার। ফসল বলতে ধানই প্রধান। দিগন্তজোড়া এই ধানের মাঠ কখনো সবুজে সবুজময়, কখনো সোনালি আভায় মন্ডিত। চোখ আটকাবেই তাতে। সুনামগঞ্জ শুধু হাওর ভ্রমণের জন্য নয়, সেখানে দেখার আছে আরো অনেক কিছু। বাদাঘাটের বিশালাকৃতির শিমুল বাগান প্রকৃতই এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। ফুল ফোটার মৌসুমে চোখ ধাঁধানো রূপ ধারণ করে বাগানটি, বিনা মৌসুমেও সেটি দৃষ্টিনন্দন তার অভিনব রোপণশৈলীর জন্য। বাগানের রূপকার প্রয়াত জয়নাল আবেদিন শুধু এই শিমুল বাগানেরই প্রতিষ্ঠাতা নন, টাঙ্গুয়ার হাওরে হিজল করচের মতো হাজার হাজার জলদ বৃক্ষ রোপণেরও উদ্যোক্তা বলে শুনেছি। বিক্রয়মূল্য কম বলে সাধারণ মানুষ যেখানে শিমুলগাছ রোপণে অনাগ্রাহী, সেখানে শিমুলের বাগান তৈরির পদক্ষেপ অভিনবই বটে। কীভাবে বুঝেছিলেন জয়নাল আবেদিন যে, তার শিমুল বাগান এক দিন পর্যটকদের প্রাণকেন্দ্র হবে! বাদাঘাটের এই শিমুল বাগানের অনতিদূরেই গড়ে তোলা হয়েছে কয়েকটি বাঁশ বাগান, সেগুলোও মনোগ্রাহী। বর্ডার হাটও আছে সুনামগঞ্জে, যার ধারণা পাওয়ার জন্য ছুটে আসে অনেক মানুষ সেখানে।

সুনামগঞ্জ আমাদের লোকজধারার গানের অন্যতম প্রধান সূতিকাগার। এখনেই জন্ম নিয়েছেন হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত, দুরবিন শাহ, আর শাহ আবদুল করিমের মতো অসাধারণ শিল্পীরা। সুনামগঞ্জের জল টইটম্বুর নদী-নালা, দিগন্ত বিস্তৃত হাওর-বাঁওড় কিংবা শুষ্ক মৌসুমের প্রান্তরজোড়া ফসলের মাঠ দেখলে বোঝা যায় প্রকৃতি তাদের কী করে কথামালা ও সুর জুগিয়েছে। ভাটি অঞ্চলকে আমরা ‘ভাটিয়ালি’ গানের উৎসস্থল বলে জানি। কীভাবে এই অভিধার উৎপত্তি হলো সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ জলাধার না দেখলে তা হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন। এসব কিছু মিলিয়ে সুনামগঞ্জ এখন বেশ সুখ্যাত এক জেলা দেশ ও দেশের বাইরে। ভ্রমণপিপাসুরা এখানে আসতে শুরু করেছেন বলেছি আগেই, কিন্তু তাদের বৃহৎ একটা অংশ আসার সাহস করছেন না দুর্গমতার ভয়ে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পর্যটন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই ভীতি কাটবে, পর্যটকের আনাগোনা নিশ্চিত বাড়বে, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সম্প্রসারিত হবে। তাতে উপকৃত হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠী। হাওর অঞ্চলের মানুষ ধানের মূল্য হ্রাস কিংবা পাহাড়ি ঢলে ফসলহানির কারণে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায়ই। পর্যটকের সমাবেশ তাদের আয়ের বিকল্প উৎস হতে পারে।

তবে সবার আগে সুনামগঞ্জ শহরকে পর্যটন উপযোগী করতে হবে। শহরটি হবে কেন্দ্রস্থল। দিনমান ঘোরাফেরা করে বেশির ভাগ পর্যটক হয়তো রাত কাটাতে চাইবেন শহরে বা শহরতলিতে। সেজন্য পর্যাপ্ত হোটেল-মোটেল এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সর্বাত্মক উদ্যোগ কাম্য। পর্যটন করপোরেশন এ ক্ষেত্রে সমন্বয়কের ভূমিকা নিতে পারে।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

 

"