বিশ্লেষণ

শিক্ষা-শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষকতা

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর

মানুষ সৃষ্টির পর থেকেই তার শিক্ষাজীবনের শুরু। মা-বাবা, ভাইবোন বা পরিবার থেকেই তার প্রাথমিক দীক্ষা। পরিবারের গন্ডি পেরিয়ে ধাপে ধাপে সমাজ তার শিক্ষার একটি মাধ্যম। প্রতিটি ধর্মেই শিক্ষা সম্পর্কে ব্যাপক তাগিদ রয়েছে এবং বলা হয়েছে তোমাদের সন্তানদের সুশিক্ষিত করো। পৃথিবীর বিখ্যাত কতকগুলো উদ্ধৃতি থেকে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, যেমনÑ ‘বিদ্যা শিক্ষার জন্য প্রয়োজনে তোমরা চীন দেশে যাও’Ñ হজরত মুহাম্মদ (সা.)। নেপোলিয়ান বলেছিলেন, ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি দেব’।

প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক এই দুই ভাগে শিক্ষাকে ভাগ করা যায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই পৃথিবীতে অনেক মানুষ পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন। আবার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চশিক্ষিত হয়েও অনেক ব্যর্থতার নজির আছে। তাই শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক অথবা অপ্রাতিষ্ঠানিক যাই হোক না কেন; এর সঙ্গে সুশিক্ষার বিষয়টি অতীব প্রয়োজন। সুশিক্ষাই কেবল পরিবার, সমাজ তথা একটি জাতিগোষ্ঠীকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। একটি সুশিক্ষিত জাতি গঠনে শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষাঙ্গন ও নিবেদিতপ্রাণ প্রশিক্ষিত শিক্ষক বা শিক্ষিকা অত্যন্ত জরুরি। এই শিক্ষা সংশ্লিষ্ট উপাদানগুলো আবার পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের অবকাঠামো ও আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

শিক্ষাঙ্গন একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ অর্থাৎ যে অঙ্গনে শিক্ষাবিষয়ক আলোচনা, পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি ও পাঠ্যসূচি নিয়ে মিলন ঘটে তাকে বোঝায়। এই শিক্ষাঙ্গন রাষ্ট্রের ও সমাজের আর্থিক অবস্থার ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। যেমন অনেক ধনী রাষ্ট্রে সুন্দর চেয়ার-টেবিল সজ্জিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য আরামদায়ক বাহনের ব্যবস্থা করা হয়। উন্নত বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা উপকরণ ও পাঠদান পদ্ধতি যেমন অডিও-ভিডিও ও অত্যাধুনিক যন্ত্রাংশের ব্যবহার করা হয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শিক্ষা সফর, মানসম্মত খাদ্যাভ্যাস ও সুচিকিৎসাসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়। অন্যদিকে গরিব তথা অনুন্নত দেশে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত, ক্ষেত্রবিশেষে খোলা আকাশের নিচে মাটিতে বসে, অনাহারে-অর্ধাহরে, চার-পাঁচ মাইল হেঁটে অথবা বর্ষায় পানি সাঁতরিয়ে ক্লান্ত শরীরে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন শুরু করে। এ বৈষম্য গরিব-ধনী রাষ্ট্রে যেমন বিদ্যমান; তেমনি একই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। এ ব্যবধান যত বেশি কমানো যাবে; সমাজে মানুষে মানুষে বিভেদ ও বৈষম্য ততই কমতে থাকবে।

শিক্ষাঙ্গন একটি পবিত্র স্থান। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সাদা-কালো, ধনী, গরিব, সবার জন্য এই পবিত্র স্থানটি উন্মুক্ত থাকা উচিত। এই স্থানটি যেন রাজনৈতিক, পেশিশক্তি ও লুটেরা মুক্ত হয়। শিক্ষাঙ্গনে গঠনমূলক আলোচনা থাকবে, সমালোচনা থাকবে, পরমতসহিষ্ণু অবস্থান থাকবে, সমাজের সবার অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত থাকবে। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে শিক্ষাঙ্গন পরিচালনা করতে হবে; যা কিছু কল্যাণ, সমাজের ও প্রতিষ্ঠানের জন্য মঙ্গল; সে রকম কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীকে দক্ষতা, নিরপেক্ষতা, দলীয় সংকীর্ণতার বাইরে এসে প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, নির্বাহী ক্ষণস্থায়ী কিন্তু প্রতিষ্ঠান দীঘস্থায়ী। তার একটি কর্মপন্থা প্রতিষ্ঠানকে অনেকদূর নিয়ে যেতে পারে আবার অনেক পিছিয়েও দিতে পারে।

শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। অন্য আট-দশটা পেশার সঙ্গে এর তুলনা চলে না। সমাজের অনেকেই আছেন যারা আর্থিক বিষয়টি বিচেনায় না নিয়ে জ্ঞান সংরক্ষণ, চর্চা ও বিতরণের উদ্দেশ্যে নিয়েই এ পেশায় আসেন। ক্ষেত্রবিশেষে ওইসব সাদা মনের মানুষ নিজেদের অর্জিত সম্পদও এ কাজে ব্যবহার করেন কোনো বিনিময় ছাড়াই। এ রকম উদাহরণ সমাজ, রাষ্ট্র, দেশে-বিদেশে অগণিত। আবার দলবাজি, প্রতিষ্ঠানে সময় না দিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু অতিরিক্ত আয়ের উদ্দেশ্যে পাঠদানের সংখ্যাও দিনকে দিন বাড়ছে। এসবই সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্রমর্ধমান পরিবর্তনেরই ফলাফল। এটা আমাদের মানতে দ্বিধা নেই যে, সমাজ তার প্রয়োজনেই পরিবর্তনকে স্বাগত জানায়। তবে এ পরিবর্তন যত বেশি কল্যাণকর, সেটাই গ্রহণযোগ্য। অকল্যাণের সঙ্গে শিক্ষা, শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষকতার কোনো স্থান নেই। তবে এ পেশাকে যুগোপযোগী করতে হবে যেন মেধাবীরা আকৃষ্ট হন। রাষ্ট্রকে এমন পলিসি গ্রহণ করতে হবে যেন এ পেশায় কর্মরত মানুষজন সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা পায়। যদি রাষ্ট্র এ কাজে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়, তবে আমরা হয়তো সুশিক্ষার স্থলে কুশিক্ষা, শান্ত, পরিপাটি শিক্ষাঙ্গনের পরিবর্তে অস্থির শিক্ষাঙ্গন যেখানে খুনাখুনি, মারামারি, চাঁদাবাজি, আদর্শ শিক্ষক তথা সাদা মনের মানুষের পরিবর্তে আদর্শহীন, নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত কালো মনের মানুষদের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হবে; যা থেকে আপনি, আমি কেউই রেহাই পাব না।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

"