আন্তর্জাতিক

ব্রেক্সিট ব্রিটেনের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

ব্রিটেন যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটে, তখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এক কথিত কেলেঙ্কারিকে ঘিরে তীব্র বিতর্কের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বরিস জনসন যখন লন্ডনের মেয়র ছিলেন, তখন তিনি মেয়রের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার এক বান্ধবীকে সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। আরো কত কী তা তদন্তসাপেক্ষে। যাক এবার আশা যাক মূল কথায়। ব্রিটেনে দীর্ঘদিনের অলিখিত প্রথা এটাই যে, রানি সব সময় সরকারের পরামর্শে কাজ করবেন। তবে কোনো রাজনৈতিক বিতর্কে কখনই কোনো পক্ষ নেবেন না, মতামত দেবেন না। কয়েক দশক ধরে দল-মত নির্বিশেষে ব্রিটেনের রাজনীতিকরা অলিখিত একটি চুক্তি এবং প্রথা অনুসরণ করছেন যে, তারা কখনই রানিকে দিয়ে এমন কিছু করাবেন না বা বলাবেন না; যাতে তিনি কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের বিতর্কে পড়তে পারেন। কিন্তু সরকারের পরামর্শে সংসদ স্থগিত করার তার এক নির্দেশ বে-আইনি ঘোষণা করে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের পর সেই বিতর্কেই পড়ে গেছেন রানি এলিজাবেথ। চুক্তি হোক আর না হোক ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের করে আনার তার সংকল্পে যেন সংসদ বাধা না দিতে পারে; সেজন্যই প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন প্রথা ভেঙে এভাবে দীর্ঘ সময়ের জন্য সংসদ স্থগিত করেছেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বে-আইনি ঘোষণার পর ব্রেক্সিট নিয়ে অব্যাহত রাজনৈতিক ঝড়ের মাঝে পড়ে গেছেন ব্রিটেনের রানি। কারণ, সরকারের পরামর্শে যে নির্দেশনা তিনি জারি করেছিলেন, সেটাকেই সুপ্রিম কোর্ট বে-আইনি ঘোষণা করেছেন। নজিরবিহীন এই রায়ে রানি যে চরম বিব্রত হয়েছেন।

এ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে কোনো বিতর্ক নেই। বিবিসির রাজপরিবার-বিষয়ক সংবাদদাতা জনি ডায়মন্ড বলছেন, এটা এমনই এক পরিস্থিতি; যা রানি সব সময় এড়িয়ে চলতে চান। অপরদিকে বিরোধী রাজনীতিকরা এখন খোলাখুলি বলতে শুরু করেছেন, সংসদ স্থগিত করা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন জেনে-বুঝে রানিকে মিথ্যা বলেছেন, বিভ্রান্ত করেছেন এবং এর জন্য রানির কাছে তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন মেজর বলেছেন, ভবিষ্যতে আর কখনই কোনো প্রধানমন্ত্রী যেন এভাবে রানি এবং সংসদের সঙ্গে আচরণ না করেন। তিনি কি প্রধানমন্ত্রীকে বলতে পারতেন, পাঁচ সপ্তাহের জন্য সংসদ স্থগিত করার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ নেই এবং ব্রেক্সিট কার্যকরী করার ঠিক আগমুহূর্তে এ সিদ্ধান্ত নিলে তিনি পক্ষপাতিত্বের বিতর্কে পড়ে যেতে পারেন। যে সরকারি প্রতিনিধিদল ব্যালমোরাল প্রাসাদে রানির কাছে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে রানির কি কথাবার্তা হয়েছিল, তা হয়তো কখনই জানা যাবে না। কিন্তু বিবিসির জনি ডায়মন্ড বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করা রানির জন্য অসম্ভব ছিল। কারণ তা হতো নজিরবিহীন এবং তার ফলে অভূতপূর্ব এক সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারত। রানি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ শুনবেনÑ এটাই ব্রিটেনের অলিখিত অবশ্য পালনীয় প্রথা। রাজপরিবার সম্পর্কিত বিবিসির আরেক সংবাদদাতা নিকোলাস উইচেল বলছেন, কাগজে-কলমে কিছু বিষয়ে রানি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করার অধিকার রাখেন। কিন্তু বাস্তবে এই অধিকার একটি ফ্যান্টাসি ছাড়া আর কিছুই নয়।

বিবিসির একই সংবাদদাতা বলছেন, প্রতিষ্ঠিত প্রথা এটাই যে, সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রানি সব সময় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মানতে বাধ্য। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিরা যখন ব্যালমোরাল প্রাসাদে তার সঙ্গে দেখা করেন, রানির পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল তিনি তাই করেছেন। ব্যক্তিগত অস্বস্তি থাকলেও সংসদ স্থগিত করার পরামর্শে রানিকে সম্মতি দিতেই হয়েছে। ব্রিটেনের সর্বোচ্চ আদালত প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সংসদ স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে যে রায় দিয়েছেন, তা মি. জনসনের জন্য একটা বড় ধরনের ধাক্কা। অক্টোবরের ৩১ তারিখে ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। ব্রিটিশ রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় হলো ব্রেক্সিট। যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে বিচারকদের প্যানেল বরিস জনসনের সংসদ স্থগিত করার পদক্ষেপের আইনি চ্যালেঞ্জের শুনানি করছেন। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, সংসদ স্থগিত করার নির্দেশটি ছিল অবৈধ। কাজেই সংসদ কখনই কার্যত স্থগিত হয়নি। রায়ে বলা হয়েছে যে, ‘সংসদ যেহেতু স্থগিত করা হয়নি, তাই এখন কী হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে খোদ সংসদ। হাউস অব কমন্সের স্পিকার জন বারকো বলেছেন, তিনি সংসদের কার্যক্রম আবার শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রস্তুতি নিতে বলেছেন এবং বুধবার সকালে আবার সংসদ বসতে যাচ্ছে। বরিস জনসন বিবিসিকে বলেছেন, আদালেতের এই রায় আমরা মেনে নেব, কারণ বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। বিরোধী লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন সংসদ অধিবেশন আবার চালু করার দাবি জানিয়েছেন।

ব্রিটেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন, সংসদের অধিবেশন স্থগিত করার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন রানিকে যে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তা ছিল অবৈধ। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সভাপতি লেডি হেইল এ নিয়ে এক ঐতিহাসিক রায়ে বলেছেন, ওয়েস্টমিনিস্টার সংসদের দুটি কক্ষের অধিবেশন স্থগিত করার আদেশটি তাই বাতিল বলে বিবেচিত হবে। সুপ্রিম কোর্টের ১১ জন বিচারকের একটি বিশেষ প্যানেল সর্বসম্মতভাবে এ রায় দেন। চলতি মাসের গোড়ার দিকে মি. জনসন পাঁচ সপ্তাহের জন্য সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। তার সরকারের নতুন নীতিমালা সংসদে রানির ভাষণের মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য এ সময়টুকু প্রয়োজন বলে সেসময় তিনি যুক্তি দেখান। এ রায় দেওয়ার সময় আদালত যেসব আইনগত দিক বিবেচনা করেছে তার প্রধান দিকগুলো এখানে তুলে ধরা হলোÑ পার্লামেন্ট স্থগিতের প্রশ্নে রানিকে যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল তার বৈধতা বিচার করার অধিকার আদালতের রয়েছে কি না, তাই ছিল এ মামলার মূল বিবেচ্য বিষয়। আদালত মনে করছেন, এই প্রশ্নে মীমাংসা করার অধিকার তার রয়েছে। লেডি হেইল তার রায়ে উল্লেখ করছেন, কয়েক শতাব্দী ধরে সরকারের কাজের আইনগত বৈধতা বিচার করার এখতিয়ার আদালতের রয়েছে। ১৬১১ সালে তৎকালীন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাজাও আইনের বাইরে যেতে পারেন না বলে আদালত মনে করেন। সুপ্রিম কোর্ট তার পর্যবেক্ষণে বলছেন, আগামী ৩১ অক্টোবর ব্রেক্সিটের মধ্য দিয়ে আমূল পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে, তার আগে দীর্ঘ সময় ধরে সংসদ স্থগিত রাখা হয়েছে; যার প্রভাব পড়েছে সংসদীয় গণতন্ত্রের ওপর। এ বিষয়টিও আদালত বিবেচনা করেছেন।

তা ছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারার ওপর তাই সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল চরম। আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন, পার্লামেন্টের অধিবেশনের স্থগিতাদেশের পেছনে যুক্তিগুলো সরকারপক্ষ তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। রানির ভাষণের প্রস্তুতির জন্য যেখানে নিয়মমাফিক চার থেকে ছয় দিনের প্রয়োজন হয়, সেখানে পাঁচ সপ্তাহ আগে কেন সংসদ স্থগিত করার প্রয়োজন হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা সরকারের কাছে ছিল না। পাশাপাশি সংসদ স্থগিত করা এবং অধিবেশনের ছুটির বিষয়টি নিয়েও কোনো ব্যাখ্যা নেই বলে লেডি হেইল রায়ে উল্লেখ করেন। সে কারণেই আদালত মনে করছেন, রানিকে সংসদ স্থগিত করার সরকারি পরামর্শটি ছিল বে-আইনি; যার ফলে সংসদ তার ওপর ন্যস্ত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ পায়নি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বিচ্ছিন্নতার ব্যাপারটি এখনো ভোলেনি তারা। এ ব্যাপারে তারা আবারও গণভোটের দাবি তুলেছে নতুন করে। এখন ব্রেক্সিটের প্রশ্নে চূড়ান্তভাবেই যুক্তরাজ্য থেকে আলাদা হয়ে যেতে চায় স্কটল্যান্ড। উত্তর আয়ারল্যান্ডও ইইউ থেকে বেরিয়ে যেতে চায় না। তা ছাড়া ব্রেক্সিট প্রশ্নে বিশ্বের অন্যতম প্রধান রাজধানী নগরী লন্ডনও এখন সীমাহীনভাবে অর্থনীতি, বাণিজ্য, ব্যাংকিং, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে চাপের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে বহু ইউরোপীয় নগরীতে অসংখ্য ব্রিটিশ নাগরিকও কর্মরত রয়েছেন। ব্রেক্সিট প্রশ্নে তাদের মধ্যেও হতাশা দিন দিনই বাড়ছে। উল্লিখিত কারণে ব্রিটেনের বেশ কিছু নাগরিক এখন চূড়ান্তভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করার ব্যাপারে আরেকটি গণভোট অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছেন।

তা ছাড়া ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেন একপর্যায়ে এমনিতেই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আলাদা হয়ে যেতে পারে স্কটল্যান্ড। নতুন হিসাব-নিকাশে দুই আয়ারল্যান্ডও শেষ পর্যন্ত তাদের সব বিভেদ ভুলে এক হয়ে যেতে পারে। সে অবস্থায় এক ইংল্যান্ড তার অতীত গৌরব ও ঐতিহ্য নিয়ে একা একা কী করতে পারবে? কতটুকু এগোতে পারবে সামনের দিকে। আর যা-ই হোক বিভিন্ন বিভেদ ও পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এত দিন ইউরোপের ২৮টি দেশকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছিল। উল্লিখিত সীমাহীন সমস্যা ও কিঞ্চিৎ সম্ভাবনার মধ্যে এখন হতবিহ্বল দিন কাটাচ্ছেন ব্রিটিশ নাগরিকরা। তা ছাড়া ব্রেক্সিট-পরবর্তী ইউরোপীয় ইউনিয়নইবা কীভাবে এবং কত দিন টিকে থাকবে, তাও একটি বিশেষ চিন্তার বিষয়। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে গ্রিস, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল ও আয়ারল্যান্ড ছাড়াও ছোট ছোট নতুন সদস্য দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। তা ছাড়া রয়েছে তাদের নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা। তারা একটি গোষ্ঠীগতভাবে এত দিন টিকে ছিল। কিন্তু ইইউ ভেঙে ব্রিটেন বেরিয়ে গেলে তাদের কী হবে? তা ছাড়া শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যইবা কদিন টিকে থাকবে; তাও কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো কিংবা বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ডব্লিউটিও ভেঙে দেওয়ারও এখন পর্দার অন্তরালে এক বিশাল পাঁয়তারা চলছে। পরাশক্তিগতভাবে বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং বাজার ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলছে অনেক হিসাব-নিকাশ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

তা ছাড়া প্রক্রিয়া চলছে অঞ্চলভিত্তিক বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার। হাত দেওয়া হচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায়। এতে হয়তো লাভবান হবে রাশিয়ার ভøাদিমির পুতিন ও তার নতুন মিত্র আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বিঘিœত হবে বৃহত্তরভাবে ইউরোপ ও এশিয়ার উঠতি অর্থনীতি। রাষ্ট্রীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক এ দৃশ্যপটের প্রেক্ষাপটে ব্রেক্সিট ব্রিটেনের সামনে এক নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এ যেন সত্যিকার অর্থেই ব্রিটেনের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"