পর্যবেক্ষণ

উন্মাদনার আরেক নাম ‘পাবজি’

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

গেমটির নাম ‘প্লেয়ার আননোনস ব্যাটেল গ্রাউন্ড’; যা ‘পাবজি’ নামে সারা বিশ্বের তরুণ-যুবকদের কাছে পরিচিতি। এ গেমটি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ-যুবকরা একপ্রকার উন্মাদনায় মাতোয়ারা। সেই উন্মাদনা কখনো কখনো ভয়ংকর নেশায় পরিণত হয়। নেশাটি মানুষকে ভুলিয়ে দেয় স্থান-কাল-পাত্র। ‘পাবজি’ নামের এ গেমটির নেশা এমন যে, গেমটি খেলোয়াড় তার চারপাশ সম্পর্কে পুরোপুরি উদাসীন হয়ে যায়। গেমটির এমন ক্ষমতা যা মানুষকে এক মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিতে পারে চাকরি, ব্যবসা, সংসার তাবৎকিছু। পাবজির নেশা মানুষকে কতটা যে উদাসীন করে তোলে সম্প্রতি তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ‘পাবজি’ গেম নিয়ে ভারতের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। পত্র-পত্রিকায় সচিত্র সংবাদও প্রচার হয় এ নিয়ে। ভাইরাল হওয়া এ ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বিয়ে মন্ডপে বর-কনে একসঙ্গে নির্দিষ্ট আসনে বসে আছেন। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা তখনো চলমান। বিয়ের মন্ডপে পাশাপাশি আসনে বসে থাকা বর ও কনেকে দেখতে নিমন্ত্রিত অতিথিদের উৎসাহ-উদ্দীপনা চরমে। অতিথিদের সবাই আসছেন মন্ডপে, খানিকটা দাঁড়াচ্ছেন বর-কনের

সামনে। নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করছেন আমন্ত্রিত সবাই। কেউ কেউ বর-কনের হাতে তুলে দিচ্ছেন নানা উপহারসামগ্রী। কনে আগত অতিথিদের সবার সঙ্গেই হাসিমুখে

শুভেচ্ছা বিনিময় করলেও বরের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। তিনি সার্বক্ষণিক ব্যস্ত মুঠোফোনে ‘পাবজি’ খেলায়। কারো দিকে তার তাকানোর ফুসরত পর্যন্ত নেই। কনের পাশে বসে আপন মনে তিনি মুঠোফোনে খেলে চলেছেন পাবজি গেম। এই গেমে বর এতটাই মগ্ন যে কেউ অতিথিরা উপহার দিতে এলেও চরম বিরক্তি প্রকাশ করছেন তিনি। বিয়ে করতে এসেও বরের এ পাবজি আসক্তির ভিডিওটি সারা বিশ্বে ভাইরাল হয়। হাজার হাজার মানুষ ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। পাবজি যে মানুষকে কতটা উদাসীন করে তোলে তার প্রমাণ ভাইরাল হওয়া বিয়ের এ ভিডিওটি। এখনো এ নিয়ে মুখরোচক মন্তব্যের ঝাঁপি যেন খুলে বসেছেন ভারতবাসীসহ পুরো বিশ্বের লোকজন।

তরুণ-যুবকদের কাছে পাবজি (পিইউবিজি) গেমের জনপ্রিয়তা এখন আকাশছোঁয়া। পাবজি উন্মাদনায় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ডিভোর্স, পরিবার থেকে মোবাইল কিনে না দেওয়ায় স্কুলপড়ুয়া আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। শুধু কি কিশোর-তরুণ-যুবক? না, তা নয়। ভয়ংকর গেম পাবজিতে আসক্ত আজকের বিশ্বের কোথাও কোথাও ১২ থেকে ৭২ বয়সিরাও। যারা পাবজিতে চরমভাবে আসক্ত হয়ে উঠেছেন তাদের কাজকর্ম লাটে উঠুক আপত্তি নেই! তাদের কাছে তাদের পরিবার, স্ত্রী, সন্তান প্রায় মূল্যহীন। সব ভার্চুয়াল গেম এখন সুদূর অতীত। যারা গেমে আসক্ত তাদের কাছে একটাই আরাধনার নাম পাবজি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৮৭ মিলিয়ন মানুষ প্রতিদিন পাবজি খেলে। শতকরা হারে সবাইকে টেক্কা দিয়ে এগিয়ে আছে চীন। তাদের শতকরা ৩৩ ভাগ মানুষ পাবজি খেলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা ১১ ভাগ ও ভারতের ৮ শতাংশ মানুষ পাবজি গেমে আসক্ত। নেপালে ইতোমধ্যে পাবজি গেম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

পাবজি গেমের নির্মাতা ব্রেন্ডন গ্রিন এবং চ্যাং হান কিম। ২০১৭ সালে এ দুজন পাবজি গেমকে অনলাইন প্ল্যাটফরমে নিয়ে আসেন। যার আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০১৮ সালের মার্চে। কম্পিউটার এবং মোবাইলে এ গেমটি খেলা যায়। পাশাপাশি এক্স বক্সের মতো বিভিন্ন গেমিং কনসোলেও এই খেলা সম্ভব। পাবজি গেম খেলার নিয়ম একেবারে সহজসাধ্য। গেমটিতে একটা বড় বিমানে করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ১০০ জন খেলোয়াড়কে একটি দ্বীপে নামিয়ে দেওয়া হয়। গোলাগুলি, অস্ত্রশস্ত্রে ভরা ওই দ্বীপের মাটিতে পা রাখার মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়ে যায় এ খেলাটি। সবার একটাই উদ্দেশ্য তা হলো, বাকি ৯৯ জনের অনলাইন অবতারকে হত্যা করে শেষ পর্যন্ত নিজে টিকে থাকা বা বেঁচে থাকা। গেমের পরিভাষায় যাকে বলে ‘উইনার উইনার চিকেন ডিনার’। এ গেমের লক্ষ্য হলো, যেকোনো মূল্যে জয়ী হওয়া। তবে এ গেমটিতে জয়ী হওয়ার পদ্ধতি প্রতিবারই আলাদা। কোনো খেলোয়াড় কীভাবে জিতবেন; সেটা পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়ের উপস্থিত বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে। প্রতিটি খেলাই হয় রিয়েল টাইমে সত্যিকারের খেলোয়াড়দের নিয়ে। কখনো কখনো যারা খেলেন তাদের কেউ কারো পরিচিত নন। আবার পরিচিতদের নিয়ে দল তৈরি করেও খেলা যায় এই পাবজি গেম। গেমটির মধ্যে একাধিক যানবাহন যেমনÑ গাড়ি, মোটরবাইক, স্পিডবোট, স্নো মোবিল ইত্যাদি ব্যবহার বা স্বাধীনভাবে চালাতে পারেন খেলোয়াড়রা। এ ছাড়া গেমটিতে রয়েছে ভয়েস চ্যাটের সুবিধাও। দল তৈরি করে পাবজি খেললে দলের এক সদস্য আরেক সদস্যের কাছে আপৎকালীন সময়ে অস্ত্র, গোলাবারুদ চাইতে পারেন ভয়েস চ্যাটে।

বাংলাদেশে পাবজি নামের এ গেমটি সব ভার্চুয়াল গেমকে পেছনে ফেলে পৌঁছে গেছে সাফল্যের শীর্ষে। বেসরকারি এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ দেশে ৫০ লক্ষাধিক মানুষ এ গেমে আসক্ত। গেমটি ধীরে ধীরে সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ করলেও কিশোর-যুবকদের মনে ভয়ংকর প্রভাব ফেলছে। এই গেমের প্রতিটি স্টেপে হিংসা আর বিদ্বেষ ছাড়া আর কোনো কিছু নেই। ঠান্ডা মাথায় প্রতিপক্ষকে খুন করার কৌশল এবং অস্ত্র চালানোর কৌশল রয়েছে এ গেমটিতে। গেমটিতে যে ধরনের অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহৃত হয় তা বাস্তবের আগ্নেয়াস্ত্রের কার্বনকপি বলা চলে। এই গেমে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রের তালিকায় রয়েছে অ্যাসল্ট রাইফেল, শট গান, স্নাইপার রাইফেল, ছোট মাউজার, পিস্তল ইত্যাদি। একই সঙ্গে খেলোয়াড়রা এই গেমে হ্যান্ড গ্রেনেড, স্ট্যান্ট গ্রেনেডের মতো বোমাও ব্যবহার করতে পারেন। পাবজি গেম অল্পবয়সি কিশোর-তরুণ-যুবকদের মারাত্মকভাবে আক্রমণাত্মক করে তুলছে। গেমটি তাদের মনে ব্যাপকভাবে হিংসার বীজ বুনে দিচ্ছে বলে গবেষকদের অভিমত। তাদের মতে, এই গেমের কারণে স্কুল-কলেজে পড়–য়াদের অনেকেরই লেখা-পড়া শেষ হতে চলেছে। বিশ্বজুড়ে পাবজি গেমটি এখন চরমভাবে সমালোচিত। এ কারণে সম্প্রতি গুগল প্লে স্টোর এবং অ্যাপলের স্টোর এই গেমকে শুধু ১৭ বছরের অধিক বয়সিদের জন্য চিহ্নিত করে দিয়েছে। ইতোমধ্যে নেপাল পাবজি গেমটি বন্ধ করে দিয়েছে। ভারতেও গেমটি বন্ধের জন্য সেদেশের হাইকোর্টে ইতোমধ্যে রিট দায়ের হয়েছে। বাংলাদেশে ভয়ংকর এ গেম বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"