পর্যালোচনা

জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকিতে নারী ও শিশু

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ইয়াসমীন রীমা

‘পরিবেশ উপনিবেশবাদ নিপাত যাক, বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধ করো, ডুবে যাওয়ার হাত থেকে আামদের রক্ষা করো’Ñ সেøাগান নিয়ে কিছুদিন আগে বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে একটি শোভাযাত্রা বের করা হয়। এতে বিপুলসংখ্যক পর্যটক অংশ নেয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে পর্যটকদের সচেতন করতে এই শোভাযাত্রার আয়োজন করে মানবাধিকার ও পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘ট্রি’। ট্রির পরিচালক শহীদ মালিক জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ফলে পৃথিবীর যে কয়েকটি নি¤œ আয়ের দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। জলবায়ুর পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষ ও জীবজগতের ওপর। এই অসম পরিবর্তনের ফলে প্রভাবিত হচ্ছে বৃষ্টি, বন্যা, খরা ,সাইক্লেন, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা। জলবায়ুর এই পরিবর্তন কারোই কাম্য নয়। আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানি উষ্ণ হচ্ছে। উচ্চতা বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের। তাতে বিপর্যয় নেমে আসছে সমুদ্র কুলবর্তী মানুষের ওপর। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান এ কিউ এম মাহবুব বলেন, সাধারণত এপ্রিল, মে, জুন, সেপ্টেম্বর,অক্টোবর ও নভেম্বরে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও নি¤œাপের সৃষ্টি হয় এবং তা রূপান্তরিত হয় ঘূর্ণিঝড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কয়েক বছর ধরে বঙ্গোপসাগরে নি¤œচাপ, লঘুচাপ ও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সংখ্যা বাড়ছে। উপকূলে বসবাসকারী লোকজনের জন্য এটা শুভ লক্ষণ নয়।

বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ। এর অধিকাংশ এলাকাই নি¤œ প্লাবন ভূমি। একসময় এ অঞ্চলটি জেগে উঠেছিল সমুদ্র থেকে। এখানকার বেশির ভাগ মানুষের বাড়িঘর সমুদ্রসীমা হতে ১০ মিটারের কম উচ্চতায় অবস্থিত। যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটারের আয়তনের ভূখন্ডের বাংলাদেশে জনসংখ্যা ১৬ কোটি ২২ লাখ ২৭ হাজার। বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,০৯৯ জন লোক বাস করে। মানুষ শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করে আর কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার ফলে অতিরিক্ত অক্সিজেন গ্রহণ ও অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিত্যাগের ভারসাম্যতা জলবায়ুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের বনজ সম্পদ যতটুকু থাকার কথা, ততটুকু নেই এবং এর পরিমাণ ২৫ শতাংশের কম। অধিকন্ত এখানে অনাকাক্সিক্ষত বিষয় যেমনÑ গাছ কাটা, নিধন, বন উজাড় ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের ভূমি মোটামুটি সমতল। নি¤œ উপকূলীয় এলাকা, নদী, বাঁধ ও চাষযোগ্য আবাদি জমি নিয়ে এ সমতল ভূমির উল্লেখযোগ্য অংশ বিস্তৃত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমনÑ ঝড়, খরা, বৃষ্টিপাত, বন্যা ইত্যাদি ঘটে থাকে।

সম্প্রতি জার্মানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘জার্মান ওয়াটের’ তত্ত্বাবধানে জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর এক প্রতিবেদন উল্লেখ্য জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত ২০ বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা সঙ্গীন এই জন্য যে, এখানে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সাইক্লোনের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। তাই জীবন ও জীবিকার ক্ষতির পরিমাণ বেশি। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গরিব দেশের দরিদ্র নারীদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি, যদিও এই পরিবর্তনে তাদের অবদান খুবই কম। দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশনের মতে, বিশ্বের ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন দরিদ্র নারী জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের তালিকায় সবচেয়ে সামনের সারিতে এবং বাংলাদেশের প্রতি সাতজনের একজন নারী জলবায়ু বিপর্যয়ের শিকার। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে, তা নারীকে আঘাত করে সবচেয়ে বেশি। এ সময় নারীর সংসারের কাজ বেড়ে যায় তাকে প্রতিকূল পরিবেশে খাদ্য প্রস্তত জ্বালানি ও পানি সংগ্রহের জন্য অনেক বেশি সময় দিতে হয়, শ্রম দিতে হয়। মেয়েশিশুদের ঘরের কাজে সহায়তার পরিমাণ বেড়ে যায় তার স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় বাল্যবিবাহের প্রবণতাও বাড়ে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়তার সময় নারী একদিকে শিশুকে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করে, অন্যদিকে গৃহস্থালি জিনিষপত্র রক্ষার চেষ্টা করে। এ কাজগুলো তাদের জন্য খুব কষ্টের হয়। এ কারণেই অনেক নারী মারা যায়। শিশুরা এ সময় মায়ের কোল থেকে নামতে চায় না। সেই শিশুকে কোলে নিয়েই নারীকে চলতে হয়; ফলে নারী ও শিশু উভয়ে দুরবস্থার শিকার হয়। কোনো কোনো সময় মৃত্যুমুখে পতিত হয়। বাংলাদেশের কোনো এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটার (বিশেষ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকায়) পর গর্ভবতী, দুগ্ধবতী ও বয়স্ক নারীর ক্ষেত্রে এ জলবায়ু পরিবর্তন স্বাস্থ্য হুমকি বাড়ায়। এ সময় সাধারণত পরিবার পরিকল্পনা প্রজনন স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কমে যায় এবং গর্ভবতী নারীর মৃত্যুর হার বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক এনজিও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশে জলবায়ুর প্রভাব নিয়ে কাজ করছে।

প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশি প্রতিনিধি ফারাহ কবীর বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে নারীর দায়িত্ব বাড়ে, একই সঙ্গে তাদের অসহায়ত্বও বাড়ে। এমন পরিস্থিতিতে নারীর বিশ্রামের সময় কমে যায়। জলবায়ুর পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে নারীর স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাবে ফেলবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়েছে, ভষ্যিতে আরো হবে। ফলে ফসল কম হবে। তখন নারীর অপুষ্টি দেখা দেবে সবচেয়ে বেশি। কারণটিও স্পষ্ট। বাংলাদেশের মতো মৌলিক অধিকারেও নারীর প্রবেশাধিকার কম হওয়ায় এবং সামাজিক মতাদর্শের কারণে নারীর জন্য ক্যালরির পরিমাণ কমে যাবে। বাংলাদেশের চর উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকেন নারীরা। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সাধারণত কাজের খোঁজে শহরে বা অন্য জায়গায় যায়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এলে সেখানে থেকে যাওয়া নারীরাই তখন সন্তান আর বয়স্কদের দেখে রাখে। তীব্র সংকটের মুহূর্তে তারা অসহায় হয়ে না পড়ে চেষ্টা করে প্রতিকূল পরিস্থিতি উতরে যেতে। জলবায়ু পরিবর্তনে নারীর নাজুকতা এত দিন খুব বেশি স্পষ্টভাবে দেখা বা এটিকে রাজনৈতিকভাবে সামনে আনা হয়নি। কারণ তারা এই পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন করার কৌশল জানে এবং কীভাবে এর প্রভাব কম হবে, সেটিও জানে। সংগঠক, নেতা এবং সংসারের দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে নারী জলবায়ু পরিবর্তনের সময় কার্বন ডাই-অক্সাইডের ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রেও সাহায্য করছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের নীতিতে অভিজ্ঞতা,

অভিযোজন কৌশল কিংবা প্রভাবের লিঙ্গীয় দিকটি

অনুল্লিখিত রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নারীর অভিজ্ঞতা ও লিঙ্গীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর প্রভাব দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে বিশাল ঝুঁকিতে থেকে যাবে বিশ্বের বড় অংশের দরিদ্র নারীরা।

ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির অ্যাটর্নি ও ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব সায়েন্সের বৈশ্বিক পরিবেশে পরিবর্তন এবং মানবস্বাস্থ্য প্রকল্পের যুগ্ম চেয়ারম্যান জে ম্যাক মাইকেল পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়ার (পিএইচএফআই) নয়াদিল্লিতে প্রতিষ্ঠা দিবসের বক্তৃতায় বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে সাগরের পানি বেড়ে যাবে এবং উপকূলীয় এলাকাগুলো প্রস্তাবিত হবে। যেহেতু ভারতের উপকূল রেখা দীর্ঘ সেহেতু সেখানে এ প্লাবনের ফল হবে ভয়াবহ। সুপেয় পানি পাওয়া বিরাট সমস্যা হয়ে ওঠবে এবং লোকজন নোনাপানি পান করবে। ভারতের উপকূলীয় এলাকাগুলো গর্ভবতী নারীদের ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়বে। তিনি আরো বলেন,

ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশে জরিপ চালিয়ে দেখেন যে, সাগরের পানি বেড়ে যাওয়ায় সেখানে গর্ভবতী নারীদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) কর্মরত পরিবেশবিজ্ঞানী রঈস আক্তার বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যাই দেখা দেবে। এ সমস্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক একটি হচ্ছে অনাগত শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর এর অপপ্রভাব। আমাদের আগামী ভবিষ্যতের জন্য বাসযোগ্য বিশ্ব গড়ার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক উষ্ণতা যে ঝুঁকি নিয়ে আসছে, তা মোকাবিলায় তৎপর হতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট

 

"