নিবন্ধ

বিশ্বাস ছুঁতে পারে উন্নতির মাইলফলক

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

এস এম মুকুল

উন্নতির পথে আমরা সব সময়ই কৌশলী থাকার চেষ্টা করি। কারণ সফল ব্যবসার পেছনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো হলো প্রক্রিয়া। মনে রাখতে হবে, মানুষ মানুষের জন্য কাজ করে, প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়। মেধাহীনদের দিয়ে কোনো ব্যবসা চলছে এবং উন্নতি লাভ করছেÑ এমন নজির খুব কমই আছে। সাধারণত তিন বছরের ব্যবসায়ের পরিকল্পনা তৈরি করার চেষ্টা করুন। অনুসরণ করার চেষ্টা করুন এবং প্রয়োজন বুঝে তা পরিবর্তন করুন। যদি কেউ আপনাকে বিশ্বাস না করে, তাহলে ব্যবসায় আপনি উন্নতি করতে পারবেন না। আপনার কাস্টমার, বিনিয়োগকারী ও সহকর্মীদের সঙ্গে যত দ্রুত আপনি নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে পারবেন, তত দ্রুতই আপনি ব্যবসায় সাফল্য পাবেন। সব সময় নিজের উন্নতির জন্য নিজের সঙ্গে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুন, নতুন উপায় খুঁজতে হবে, যা হতে পারে উন্নত পণ্য, আমাদের ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং কাজে আরো পারদর্শী হাওয়া, যা শেষ পর্যন্ত বিশাল মুনাফার সৃষ্টি করে।

মার্কিন ‘বিজনেস ম্যাগনেট’, উদ্যোক্তা এবং সমাজ কর্মীকে বিশ্বের সবচেয়ে সফল বিনিয়োগকারী মনে করা হয় যাকে, তার নাম ওয়ারেন বাফেট। বিশ্বের শীর্ষ ধনীর তালিকায় তার নাম প্রথম দিকে এক যুগ ধরেই। অর্থবিত্তের পাশাপাশি অসাধারণ জীবনযাপনের জন্য বিখ্যাত ওয়ারেন বাফেট। ব্যবসাই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। ছোটবেলা থেকেই মাথায় ঘুরত কীভাবে টাকা কামানো আর সঞ্চয় করা যায়। ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে ওয়ারেন বাফেটকে একজন জীবন্ত কিংবদন্তি বলা চলে। তার জীবনের কৌশল, আদর্শ, সাফল্য নিয়ে বলে শেষ করা যাবে না। ১৯৩০ সালের ৩০ আগস্ট নেব্রাক্সা অঙ্গরাজ্যর ওমাহাতে জন্মগ্রহণ করা বাফেট একজন মার্কিন ব্যবসায়ী। তাকে ‘ঋষি’ বা ওমাহা এর ‘ওরাকল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বাফেটকে বিংশ শতকের সবচেয়ে সফল বিনিয়োগকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পারিবারিক অবস্থা অবশ্য খুব বেশি খারাপ ছিল না। অভিজাত পরিবারের সন্তান হয়েও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটা বাসনা ছোটবেলা থেকেই ছিল। সেজন্যই কিশোর বাফেট টাকা আয়ের জন্য বাড়ি বাড়ি চুইংগাম, কোল্ড ড্রিংকস এমনকি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনও বিক্রি শুরু করেন। আরো টাকা আয়ের জন্য দাদার মুদি দোকানে কাজ শুরু করেন তিনি। একদিকে দোকানে কাজ; অন্যদিকে পত্রিকার হকারি, গলফ বল বিক্রি। সেই মুদি দোকানে কাজ করা ছেলেটিই আজকের পৃথিবীর ধনাঢ্য ব্যক্তিদের শিরোমণি ওয়ারেন বাফেট।

৬ বছর বয়সে ওয়ারেন বাফেট বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে জুসি ফ্রুট চুইংগাম (৫টিতে এক প্যাকেট) এবং কোকা-কোলা বিক্রি করতেন। তিনি সব সময়ই পুরো প্যাকেট একসঙ্গে বিক্রি করতেন। এতে তার প্রতিটি প্যাকেটে দুই সেন্ট করে লাভ হতো। বাফেট তার দাদার দোকান থেকে কোকা-কোলা (৬টিতে এক প্যাকেট, মূল্য ২৫ সেন্ট) কিনে তা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ৩০ সেন্টে বিক্রি করতেন। মাত্র ১১ বছর বয়সেই বাফেট সিটিস সার্ভিসের (বর্তমানে যেটার নাম ঈওঞএঙ, এটি একটি অয়েল কোম্পানি) ৬টি শেয়ার কিনে শেয়ার ব্যবসার জগতে প্রবেশ করেন। ১৫ বছর বয়সে বাফেট পত্রিকা, ক্যালেন্ডার বিক্রি শুরু করেন। ১৯৪৫ সালে বাফেটের বয়স মাত্র ১৫। হাইস্কুলের ছাত্র। ওই সময়ই তার এক বন্ধুর সঙ্গে ব্যবহার করা একটি পিনবল মেশিন কেনেন মাত্র ২৫ ডলারে। মেশিনটি বসানোর মতো জায়গা ছিল না তাদের। তারা এক নাপিতের দোকানের ভেতরে তা বসিয়ে দিলেন। এর মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তারা একই রকম তিনটি মেশিন বসান বিভিন্ন স্থানে। এভাবেই কৈশোর বয়স থেকেই ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়েন বাফেট। ১৯৫১ থেকে ৫৪ পর্যন্ত বাফেট-ফক অ্যান্ড কোম্পানিতে ইনভেস্টম্যান সেলসম্যান হিসেবে চাকরি করেন। নিউইয়র্কে গ্রাহাম-নিউম্যান করপোরেশনে সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৫৪ থেকে ৫৬ সাল পর্যন্ত। এ ছাড়া তিনি বাফেট পার্টনারশিপ লিমিটেড, বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে ইন্স্যুরেন্সসহ বিভিন্ন সংস্থায় চাকরি করেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই এখন তার নিজের মালিকানাধীন।

লক্ষ্য স্থির ছাড়া সবার কাজের গতি নিরূপণের আর কোনো উপায় নেই। যখন প্রতিষ্ঠানের সবার লক্ষ্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকবে; তখনি সবাই একসঙ্গে তা অর্জনের জন্য কাজ করতে পারবেন। আপনি যখনই আপনার নিজের থেকে বেশি কিছু করতে চাইবেন, তখনই আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হয়তো আপনার ভেতর উদ্যম আছে, কিন্তু আর কিছু নেই; তার পরও নিজের উদ্যমকেই নিজের মতপ্রকাশ করুন। কিছু সহজ আদর্শ মেনে চললে আপনি যে শিল্পতেই থাকুন না কেন, উন্নতি করতে পারবেন। আপনি যখন আপনার কাজকে ভালোবাসেন, তখন তা আপনার আশপাশের মানুষের কাছে দৃশ্যমান হয়। কর্মোদ্যম এবং কর্মোদ্দীপনা দেখানো আপনার দলের কঠিন কাজ সহজ করার ও লক্ষ্যে স্থির থাকতে সাহায্য করে, যা আপনাকে কর্মক্ষেত্রে সফল হতে সাহায্য করবে।

সফলতার জন্য ওয়ারেন বাফেটের পরামর্শÑ কখনো একমাত্র আয়ের উৎসের ওপর নির্ভরশীল হবেন না। দ্বিতীয় কোনো উৎস তৈরির জন্য বিনিয়োগ করুন। আপনি যদি এমন কিছু কেনেন; যা আপনার দরকার নেই, তাহলে শিগগিরই (দৈনন্দিন খরচ মেটাতে) আপনার দরকারি জিনিসপত্র বিক্রি করে দিতে হবে। তাই হিসাব করে ব্যয় করতে হবে। খরচ করে যেটুকু বাকি থাকে, তা থেকে সঞ্চয় না করে বরং সঞ্চয় করে যা থেকে যায়; সেখান থেকেই খরচ করুন। কখনোই উভয় পা পানিতে রেখে নদীর গভীরতা পরিমাপ করতে যাবেন না। অর্থাৎ সব সময় কিছু সম্বল রেখে দেবেন। পুরোটাই ঝুঁকি নেওয়ার জন্য ব্যবহার করবেন না। সবগুলো ডিম একই ঝুড়ির মধ্যে নেবেন না। অর্থাৎ একটি মাত্র ক্ষেত্রে বিনিয়োগ না করে ভিন্ন ভিন্ন অনেকগুলো খাতে ইনভেস্ট করুন, যাতে মূলধন হারানোর ঝুঁকি কম থাকে। সততা হচ্ছে একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল উপহার; যেনতেন লোকদের কাছে এটি আশা করবেন না যেন! যুব সম্প্রদায়ের জন্য বাফেটের পরামর্শ হলো ক্রেডিট কার্ড ও ব্যাংক লোন থেকে দূরে থাকুন। নিজের যা আছে, তাই বিনিয়োগ করুন। মনে রাখবেন, ক. টাকা মানুষ সৃষ্টি করে না। কিন্তু মানুষ টাকা সৃষ্টি করে। খ. যতটা সম্ভব জীবনধারাকে সহজ-সরল

করার চেষ্টা করুন। গ. অন্যরা যা বলে তাই করবেন না। তাদের কথা শুনুন। তারপর আপনার যা ভালো মনে হয়, তাই করুন। ঘ. অপ্রয়োজনীয় কোনো বিষয়ে অর্থ খরচ করবেন না। ঙ. জীবন আপনার। সেজন্য আপনার জীবনকে চালাতে অন্যদের কেন সুযোগ দেবেন?

বাফেট একজন অত্যন্ত উৎসাহী কনট্র্যাক্ট ব্রিজ খেলোয়াড়। বিল গেটসের সঙ্গে তিনি প্রায়ই ব্রিজ খেলেন। তিনি সপ্তাহের প্রায় ১২ ঘণ্টা এ খেলা খেলেন। ২০১১ সালে বাফেট বিশ্বের তৃতীয় ধনী ব্যক্তি ছিলেন। টাইম ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি ঘোষণা করে। ওয়ারেন বাফেট ১৯৫০ সালে নেবাস্ক্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। বেঞ্জামিন গ্রাহামের ‘ইনটিলিজেন্ট বিনিয়োগকারী’ বইটি পড়ার পর তিনি গ্রাহামের কাছে এ বিষয়ে অধ্যয়ন করতে চেয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি গ্রাহামের অধীনে থেকেই ১৯৫১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ওমাহা ফিরে আসেন এবং বাফেট-ফাল্ক অ্যান্ড নামক একটি বিনিয়োগ ফার্ম গঠন করেন। সেখানে তিনি ১৯৫১ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। আর এ সময়ের মধ্যে বাফেটের সঙ্গে গ্রাহামের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যে কি না তার সময় এবং চিন্তার বিষয়ে উদার ছিলেন। সাবেক অধ্যাপক ও ছাত্রের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই অবশেষে বাফেটকে গ্রাহাম নিউইয়র্কের গ্রাহাম-নিউম্যান করপোরেশন কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ দান করা হয়। যেখানে তিনি একটি নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এই দুই বছর গ্রাহামের সঙ্গে থেকে ও শত শত বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষামূলক কোম্পানি নিয়ে কাজ করায় স্টক বিনিয়োগ করতে বাফেট আগ্রহী হয়ে ওঠেন; যা কি না বাফেটকে একজন সফল বিনিয়োগকারী হওয়ার পথে পৌঁছে দেওয়ার পথ সুগম করে।

লেখক : সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

 

"