ব্যাংকিং

দেশের সব মানুষের জন্য ব্যাংক হিসাব

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

রেজাউল করিম খোকন

দেশের সবার কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দিতে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এজন্য ‘জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল-বাংলাদেশ’ শীর্ষক নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের যেকোনো ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অন্তত একটি অ্যাকাউন্ট রাখার লক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে এই নীতিমালায়। সম্প্রতি এই নীতিমালার খসড়া প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

গত ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ নীতিমালা তৈরির কাজ করছে। এ নীতিমালা টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) ৪৬টি লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দরিদ্রদের জন্য আর্থিক সেবা সহজতর করে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন ও বিদ্যমান দারিদ্র্য দূর করা এই নীতিমালার মূল লক্ষ্য। আগামী ২০২৪ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবে। ওই সময়ে দেশে আর্থিক লেনদেন ও পরিশোধ কার্যক্রম সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তরের লক্ষ্যে যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে এ নীতিমালা করা হচ্ছে। নীতিমালার খসড়া অনুযায়ী সঞ্চয় বৃদ্ধি ও আর্থিক সেবা সহজলভ্য করতে ডিজিটাল ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য আর্থিক সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক লেনদেনের ভিত্তি আরো অনেক জোরাল করা হবে। পরিশোধ ব্যবস্থাও আরো সহজ ও শক্তিশালী করা হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক পদ্ধতিতে শুধু সম্পদের স্থানান্তর থাকবে তা নয়, কোন খাতে কী ধরনের আর্থিক সেবা প্রয়োজন; সেটি উদ্ভাবনেও কাজ করবে সরকার। এই নীতিমালা বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি কার্যালয় চালু করা হবে। সেখান থেকে নীতিমালা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক, প্রযুক্তিগত ও গবেষণা-বিষয়ক সহায়তা দেওয়া হবে। বর্তমানে দেশে ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি, বিনিয়োগ ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং সমবায় সমিতি নানাভাবে জনগণকে আর্থিক সেবা দিয়ে থাকে। এ ছাড়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। রয়েছে পুঁজিবাজারে লেনদেন করার জন্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউস। বিকাশ, নগদ, শিওরক্যাশ, রকেট, ইউক্যাশ প্রভৃতির মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বাড়ছে। সব শ্রেণি ও পেশার মানুষকে আর্থিক সেবায় আনা ও তাদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। গ্রামে প্রত্যন্ত অঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় ব্যাংকের সেবা পৌঁছাতে ব্যাংকগুলোকে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এজেন্ট ব্যাংকিং এখন গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ছোটবেলা থেকে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ব্যাংকিং চালু করা হয়েছে। ব্যাংকের এ সঞ্চয় প্রকল্প ও ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। এর মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই ব্যাংকিং বিষয়ে আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারছে ছাত্রছাত্রীরা। এ ছাড়া আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় গ্রামের কৃষক মুক্তিযোদ্ধা, পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিক, সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য নামমাত্র জমায় ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গত বছর ২০১৮ সালের প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ৫০ ভাগের ব্যাংক হিসাব রয়েছে মোট জনসংখ্যার নারীদের ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবায় সম্পৃক্ত। ২১ দশমিক ২ শতাংশ জনগণ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত। ৯ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয় রয়েছে এবং ঋণ রয়েছে ৯ দশমিক ১ শতাংশ ব্যক্তির।

অর্থনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা। জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হলো ব্যাংকিং খাত। সারা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সাধারণত ব্যাংক ঘিরেই আবর্তিত হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাংকের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের স্থানটি অনেক ঊর্ধ্বে। দেশের আপামর জনগণ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে পরম বিশ্বাসে আমানত হিসেবে রাখার জন্য ভিড় করে। ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পোদ্যোগের প্রসার ঘটান। দেশের আমদানি-রফতানি ব্যবসার আর্থিক নিশ্চয়তার প্রধান ভরসাস্থল হলো ব্যাংক। দেশে কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্র, বৃহৎ, মাঝারি উদ্যোক্তার বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে শক্তিশালী একটি উপাদান হিসেবে সম্পৃক্ত থাকে ব্যাংক। বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা নানা চড়াই-উতরাই পথ পাড়ি দিয়ে আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত কয়েক দশকে ধীরে ধীরে হলেও ব্যাংক ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক উত্তরণ ঘটেছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থা অনেকটাই সমৃদ্ধ হয়েছে। অটোমেশন বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় অনন্য গতির সঞ্চার করেছে। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাংকিং কর্মকান্ডকে অনেকটাই সহজ করে তুলেছে। এখন দ্রুত এবং কম সময়ে আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করা যাচ্ছে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অর্থ প্রেরণে বিদ্যমান নানা জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার অবসান হয়েছে। বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর অনেক ধরনের ব্যাংকিং লেনদেন হচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক (বিএফটিএন) ব্যবহার করে ব্যাংকগুলো অনলাইনে এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করে থাকে। ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশের মাধ্যমে চেক নিকাশ করা হচ্ছে বর্তমানে। এক লাখ টাকার বেশি তাৎক্ষণিক স্থানান্তরের জন্য ব্যবহার করা হয় রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) পদ্ধতি। এই পদ্ধতিগুলোর প্রযুক্তিগত সহায়তা মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই দেওয়া হয়। ব্যাংকগুলো কোর ব্যাংকিং সলিউশনের (সিবিএস) মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্কটিকে কাগজ-কলম থেকে বের করে একটি ভার্চুয়াল জগতে নিয়ে এসেছে। সিবিএসের আওতায় থাকা ব্যাংক শাখাগুলো কম্পিউটারের মাধ্যমে একটি অভিন্ন নেটওয়ার্কে চলে এসেছে।

এক দশক ধরে বাংলাদেশে গড়ে ৬ শতাংশের বেশি হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছে। সর্বশেষ অর্থবছরে ৮ শতাংশের রেকর্ড স্পর্শ করেছে প্রবৃদ্ধি। আগামীতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে বর্তমানে ৪৭ শতাংশ নাগরিকের বয়স ২৫ বছরের বেশি। জিডিপির ৩০ শতাংশ আসছে শিল্প খাত থেকে। দেশে ৩৫ শতাংশ নগরায়ণ হয়েছে। গ্রামগুলোতে শহরে নানা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ব্যাপারে জোর দিয়েছে সরকার। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঙাভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। গ্রামীণ জনপদে আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে শহরমুখী গ্রামীণ জনস্রোত এমনিতেই কমে আসবে। গ্রামীণ সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, স্বল্প আয়ের দরিদ্র নারী-পুরুষকে সরকারের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ব্যাংকে ১০ টাকা জমাদানের মাধ্যমে হিসাব খোলার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। তবে ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবগুলোর বেশির ভাগ লেনদেন না করার কারণে অকার্যকর হয়ে পড়েছে দিনে দিনে।

দেশে বর্তমান সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে টেকসই ও গ্রিন ব্যাংকিং বা পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা দরকার। এজন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক এবং গ্রাহকদের টেকসই ও গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রম বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে টেকসই ব্যাংকিং নিশ্চিত করতে হলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশÑ এই তিন ক্ষেত্রেই যথাযথ অগ্রগতি সাধন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েক বছর ধরে টেকসই ব্যাংকিংয়ের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। মূলত গ্রিন ব্যাংকিং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক দায়িত্বশীলতা (সিএসআর) এবং ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স বা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক গুরুত্ব দিয়ে নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। গ্রিন ব্যাংকিংয়ের উদ্যোগ ব্যাংকার এবং গ্রাহকদের মধ্যে পরিবেশের ঝুঁকি বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। এটাকে একটা পজিটিভ পরিবর্তন হিসেবে গণ্য হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য দেশের সব মানুষকে যত দ্রুত সম্ভব ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমকে শক্তিশালী করতে হবে। দেশের সব মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দিতে সরকার যে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে; যা অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে নিজের প্রয়োজনে উদ্যোগী হতে হবে। কারণ এখন প্রাত্যহিক নানা আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করতে নগদের চেয়ে ব্যাংক চেকের মাধ্যমে করাটা তুলনামূলকভাবে সহজ, নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ইউটিলিটি বিল, বাড়ির খাজনা, সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার কর পরিশোধ, ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে ভর্তি ফি, টিউশন ফি ইত্যাদি প্রদানসহ সঞ্চয়পত্রের মুনাফাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাবের প্রয়োজনীয়তা এখন সবাই গভীরভাবে উপলব্ধি করছেন। ফলে ব্যাংক হিসাব থাকাটা এখন বিলাসিতা কিংবা অহেতুক বাড়তি কোনো ব্যাপার নয়, নিতান্তই বাস্তব প্রয়োজন হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এসব কারণে ব্যাংক হিসাব থাকাটা বর্তমানে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একান্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।

আগামী দিনগুলোতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হলে বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা অনেকটাই শক্তিশালী এবং টেকসই হবে; তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এ ক্ষেত্রে সুশাসন, শুদ্ধাচার, ন্যায়বিচার, সমতা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের এই গঠনমূলক মহতী উদ্যোগকে সফল করে তুলতে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য আর্থিক সেবা প্রদানকারী সংস্থা প্রতিষ্ঠান ও বিভাগকে যথার্থ আন্তরিক এবং সৎ হতে হবে একান্তভাবে।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

 

"