নিবন্ধ

বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব এবং আমরা

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

অলোক আচার্য

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধের অনেক দিন পার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্য যুদ্ধের সুবাদে এই শব্দটি আজ তাই বেশ আলোচিত। এর প্রভাবও বিশে^ পড়তে শুরু করেছে। এটা শেষ হওয়া প্রয়োজনÑ এ কথা বুঝতে পারলেও কেবল ঐকমত্য না হওয়ার কারণে পরিস্থিতির অবসান হচ্ছে না। এই বাণিজ্যযুদ্ধ পৃথিবীর অর্থনৈতিক গতি প্রকৃতিকে কোনদিকে চালাবে তা অনুমান করা যায়। যুদ্ধের ফল হয়ত বহু দেশকে কমবেশি ভোগাবে বলেই অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় যেমন চীনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে তেমনি যুক্তরাষ্ট্রেরও প্রভাব রয়েছে। চীনা পণ্যের আজ ব্যাপক পরিচিতি। দুই দেশের বাণিজ্যযুদ্ধ তাদের নিজেদের মধ্যে সিমাবদ্ধ না থেকে তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট অন্য দেশের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে। শেষটায় এর পরিণতি কী হবে বা এর সমাপ্তি হবে কীভাবে তা এখনই বলা সম্ভব না।

বাণিজ্যযুদ্ধ প্রাণঘাতী না হলেও দুশ্চিন্তার তো বটেই। অর্থনৈতিক মন্দাবস্থার থেকে খারাপ আর কিছু হতে পারে না। কোনো দেশে যত অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা দেখা দেবে ততই সেই দেশে বেকারত্ব, মৌলিক চাহিদাপূরণ করতে পারার সমস্যা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করাসহ বিভিন্ন কাজে সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে সেই দেশের অর্থনীতি এবং ফলশ্রুতিতে অভ্যন্তরীণ অবস্থাও। বাণিজ্যযুদ্ধের ফলশ্রুতিতে বৈশি^ক অর্থনীতিতে ভয়াবহ মন্দা ধেয়ে আসছে এমনটাই আশঙ্কা আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টদের। এর প্রভাব এখন দক্ষিণ এশিয়াতেও পড়তে শুরু করেছে। যদিও প্রথমদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিকল্প বাজার হিসেবে কোনো কোনো দেশকে বেছে নেওয়ায় লাভের হিসাব-নিকাশ করা হচ্ছিল কিন্তু বর্তমান অবস্থা ভিন্ন। কিন্তু আন্তর্জাতিক গণমাধধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার পড়তে শুরু করেছে এবং এর ফলে অনেক দেশের রফতানি কমতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। দেশটির মুদ্রামানও কমছে। বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে জানা যায়, স্বাধীনতার পর ভারতের অর্থনীতির এমন অবস্থা আর হয়নি। এরই মধ্যে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে দেশটির প্রবৃদ্ধির হার। এপ্রিল থেকে জুন ত্রৈমাসিক হিসাবে ভারতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমির (সিএমআইই) একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশটির বেকারত্বের হার ৭ দশমিক ৯ থেকে ৯ দশমিক ১ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। চাহিদা কমেছে গাড়ির ও ভোগ্যপণ্যেও, সেটাই স্বাভাবিক।

মানুষের ভোগ বিলাসিতা নির্ভর করে আর্থিক সামর্থ্যরে ওপর। এখন যদি সেই সামর্থ্য কমতে থাকে তাহলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে প্রথমদিকে সেই প্রভাব না দেখা গেলেও বিলাসপণ্যে তা পড়তে বাধ্য। অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা দেখা দিলে মানুষের সামর্থ্যরে ঘাটতি দেখা দেয় এবং তখন কেবল আবশ্যকীয় মৌলিক চাহিদাপূরণেই জোর দেয়। বলা হচ্ছে বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাবেই ডলারের বিপরীতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রার দরপতন ঘটছে। এ যুদ্ধের প্রভাবে আগে থেকেই ভুগছে হংকং ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশ। তবে এখনই বলার সময় আসেনি যে বড় দেশগুলোতে বাণিজ্যযুদ্ধ কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারে। আস্থার অভাব প্রকট হওয়ায় সম্ভাব্য মন্দা থেকে রেহাই পাওয়া সহজ হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এ থেকে উত্তরণের জন্য কোনো কার্যকরী প্রচেষ্টা চোখে পড়ছে না। বিবিসি’র বিশ্লেষণে অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের এশিয়া অর্থনীতি বিভাগের প্রধান লুইস কুজিস বলেছেন, চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধে এশিয়ার ছোট দেশগুলো ভুগবে। কারণ চীনের ওপর এশিয়ার অনেক দেশই নির্ভরশীল। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়ে যে দেশগুলো সম্পর্কযুক্ত সেই সব দেশ যে এর প্রভাব এড়াতে পারবে না তা বলা যায়। তবে তার প্রভাব কতদিন বহন করতে হবে এসব দেশকে? বাংলাদেশ কী এই প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে? তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে এখনই এর ধাক্কা লাগবে না। কারণ বাংলাদেশ বেশি দামি বা উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন পণ্য রফতানি করে না বলে এখনো অতটা আক্রান্ত হয়নি। তবে বাণিজ্যযুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে বাংলাদেশের রফতানিও কমতে পারে। তবে এখনই দুশ্চিন্তা করার মতো কারণ হয়তো নেই। কারণ বাংলাদেশের রফতানি সাম্প্রতিককালে বেড়েছে। বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের সামগ্রিক পণ্য রফতানি ৪ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে।

সম্প্রতি আইএমএফ বিশ^ অর্থনীতির পূর্বাভাস প্রতিবেদনে এ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিলে আগামী বছর ২০২০ সালে এটি ১ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসবে বলে অনুমান করছে। এর মূল কারণ হিসেবে আইএমএফ বলছে, চীনসহ বিভিন্ন দেশের আমদানি পণ্যে উচ্চশুল্ক আরোপ করায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে আসবে, যার প্রভাব দেশটির প্রবৃদ্ধিতে পড়বে। এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না চীন। এ বছর চীনে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২ শতাংশ হলেও আগামী বছর এই হার ৬ শতাংশে নেমে আসবে। সার্বিকভাবে এটি বিশ^ অর্থনীতির জন্য বেশ ঝুঁকি। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতেই হবে।

রফতানি বৃদ্ধি পেলেও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি কমছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ চামড়া ও চামড়া পণ্য রফতানি হলেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ১০১ কোটি ৯৭ লাখ ডলারে। অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দুই পরাশক্তি। কিন্তু চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি মানতে পারছেন না ট্রাম্প। কিন্তু চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক যুদ্ধে রুপ নেয় কিনা এবং দীর্ঘদিন ধরে এই যুদ্ধ চললে অর্থনৈতিকভাবে ভুগতে হবে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। সম্প্রতি চীন থেকে আমদানি করা কয়েক হাজার কোটি ডলারের পণ্য থেকে কয়েকটি পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্কারোপ আপাতত ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেপ্টেম্বর থেকে ওই পণ্যগুলোতে এ শুল্কারোপের পরিকল্পনা ছিল তার। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে মুঠোফোন, ল্যাপটপ, ভিডিও গেম কনসোল, কিছু খেলনা, কম্পিউটার, মনিটর এবং কিছু কাপড়চোপড় পায়ে পরার জিনিসপত্র। ক্রিসমাসের আগে মর্কিন ক্রেতাদের যাতে শুল্কের কারণে জিনিস কিনতে সমস্যায় না পড়তে হয় সে কারণে দেরিতে শুল্কারোপের এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন ট্রাম্প।

গত ১ আগস্ট চীনের ৩০ হাজার কোটি ডলারের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্কারোপের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে সবসময় একটি উত্তেজিত অবস্থা বিরাজ করে। কারণ দুই দেশই পরাশক্তি এবং কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। এই সমস্যার সমাধান এ রকম শক্ত অবস্থানে থেকে সম্ভব হবে না। দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে এবং সহনশীল হতে হবে। মাঝে আলোচনার আভাস পেলেও কার্যত এখন পর্যন্ত আলোচনার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। সমস্যা ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। এভাবে ঘনীভূত হতে থাকলে আমরাও এর প্রভাব থেকে বাইরে থাকতে পারব না। বাণিজ্যযুদ্ধ মানে আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিমূলে আঘাত। অর্থনৈতিক শক্তি দেশকে প্রভাবিত করে এবং ক্রমোন্নতির দিকে ধাবিত করে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের অর্থনীতি অস্থিতিশীল হয়ে তা থেকে কতদিন আমরা মুক্ত থাকতে পারব সেটাই প্রশ্ন। এসব সমস্যার সমাধান একটাই। যুক্তরাষ্ট্র-চীন উভয় দেশকেই কার্যকরী সমঝোতায় আসতে হবে। বিশ^কে সম্ভাব্য মন্দাবস্থা থেকে ঠেকাতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের দেশকেও এদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"