মুক্তমত

মানবিক আশ্রয়, অমানবিক ক্ষতি

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

সাধন সরকার

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যত বিলম্বিত হবে পাহাড় ও বনের ক্ষতি ততই ত্বরান্বিত হবে বলেই মনে হচ্ছে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে এখনো রোহিঙ্গা বসতি নির্মাণ থামেনি। নতুন নতুন রোহিঙ্গা বসতি এখনো নির্মাণ করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা বসতির কারণে কৃষিজমি, পাহাড়, বন ও জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে। দুই বছর আগেও কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এলাকা জীববৈচিত্র্যে ভরপুর ছিল। আর এখন অযাচিতভাবে পাহাড়, বন ও কৃষিজমির ক্ষতি করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা বসতি ও তাদের ভরণপোষণের কারণে পুরো টেকনাফ ও উখিয়ার প্রকৃতি-পরিবেশের ভারসাম্য নাজুক হয়ে পড়েছে। মানবিক এই রোহিঙ্গা ঢল শুরু হওয়ার পূর্বে টেকনাফ ও উখিয়ার বহু পরিবারের সদস্যরা কৃষিকাজ ও মাছ ধরার পেশায় নিয়োজিত ছিল। কিন্তু এখন কৃষিজমির বিশাল অংশে রোহিঙ্গারা বর্জ্য-আবর্জনা ফেলছে। এর ফলে বহু ফসলি জমি ময়লা-আবর্জনায় ভরে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ কারণে অনেক কৃষক তাদের পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন!

কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার অনিন্দ্য সুন্দর জনপদ এখন রোহিঙ্গা বসতির দখলে! টেকনাফ ও উখিয়ার দুই উপজেলার স্থানীয় মোট জনসংখ্যা যেখানে সাড়ে পাঁচ লাখ; সেখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১১ লাখ। টেকনাফ ও উখিয়ার যেদিকে তাকানো যায় শুধু ছোট ছোট টিনের খুপরি ঘর! সেই সবুজেঘেরা পাহাড় আর বনভূমি এখন আর নেই! সামাজিক ও প্রাকৃতিক উভয় বনের ক্ষতি করা হচ্ছে। সবচেয়ে ক্ষতি করা হচ্ছে প্রাকৃতিক বনের। জ¦ালানির প্রয়োজনে প্রতিদিন বন কাটা হচ্ছে। আবাসন নির্মাণের জন্য পাহাড় ন্যাড়া করা হচ্ছে। বনবিভাগের সূত্রমতে, রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপন ও জ¦ালানির জন্য ইতোমধ্যে ৬ হাজার একরের বেশি বনভূমি উজাড় করা হয়েছে। রোহিঙ্গা বসতির কারণে বনজ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির পরিমাণ টাকার হিসাবে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা (বনবিভাগ, ৩ জুলাই ২০১৯)। এই ক্ষতির পরিমাণ প্রতিদিন বাড়ছে ছাড়া কমছে না। যে কক্সবাজারের বিশ^জোড়া খ্যাতি রয়েছে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের জন্য, যে কক্সবাজার সমুদ্র-পাহাড়-বন আর প্রকৃতির লীলাভূমি, সেই কক্সবাজার এখন রোহিঙ্গা বসতির কারণে নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হচ্ছে। দ্বিতীয় দফা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশের এত দিনের প্রচেষ্টা তো বটেই রোহিঙ্গাদেরও কপাল পুড়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর দ্বারা রোহিঙ্গাদের পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞের সেই ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের যে প্রকৃতি-পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে তার দায় কি শুধুই বাংলাদেশের!

বিশ^ মোড়লরাও আজ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে তাদের স্বার্থের কারণে দ্বিধাবিভক্ত। প্রকৃতি পরিবেশের ক্ষতি রোহিঙ্গারা হয়তো বুঝবে না, তাই বলে পার্শ^বর্তী দেশও কি একটু হলেও অনুধাবন করতে পারছে না! একটি দেশের প্রকৃতি-পরিবেশের ক্ষতি শুধু ওই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে না। বিশ^ উষ্ণায়নের এ সময়ে তা আশপাশের বহু অঞ্চলব্যাপী প্রভাব বিস্তার করে। জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তনের এ সময়ে গাছ লাগানো তো বটেই বিদ্যমান প্রকৃতি-পরিবেশ সংরক্ষণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রকৃতি-পরিবেশ ধ্বংস হওয়া মানে জেনেশুনে বিপদকে ডেকে নিয়ে আসা। বন, বন্যপ্রাণী, পাহাড় ও প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। কক্সবাজারের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতিটি উপাদনেরই ভূমিকা রয়েছে। রোহিঙ্গাদের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে শিবিরের মধ্যে আর কত দিন নিয়ন্ত্রণ করে রাখা যাবে; সেটা বিরাট প্রশ্নের বিষয়! কেননা রোহিঙ্গারা এখন সারা দেশে বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়া শুরু করেছে! তাই এই মুহূর্তে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনই সংকটের একমাত্র সমাধান! রোহিঙ্গা প্রত্যাবাস দ্রুত হওয়া মানে নিরাপত্তার ঝুঁকি তো বটেই প্রকৃতি-পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি থেকে রেহাই পাওয়া। যদিও প্রকৃতি-পরিবেশের এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে রোহিঙ্গাদের কারণে ধ্বংস হওয়া বনভূমি এলাকায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ। তবে যত দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে; তত দ্রুত দেশের জন্য সবদিক থেকে কল্যাণ হবে।

লেখক : সদস্য

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

"