বিশ্লেষণ

সৈয়দ মুজতবা আলী ও তার দেশে বিদেশে

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

সৌমিত্র দেব

‘নিতান্ত বিপদে না পড়লে আমি আপন গাঁ ছেড়ে যেতে রাজি হইনে। দেশ ভ্রমণ আমার দুচোখের দুশমন। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন আপন ভূমির গান গেয়ে ওঠেন তখন আমি উদ্বাহু হয়ে নৃত্য আরাম্ভ করি।’Ñ এ কথাটি বলেছেন বাংলাদেশের ভ্রমণ সাহিত্যে ভিন্ন ধারার প্রবর্তক সৈয়দ মুজতবা আলী। তিনি সুযোগ পেলেই বলতেন ভ্রমণে তার কোনো আগ্রহ নেই। কিন্তু সেটা ছিল নিছকই তার বিনয়। জন্মের পর থেকেই তিনি ভ্রমণ করেছেন। সারা জীবনই ছিলেন এ ব্যাপারে অক্লান্ত। জন্ম পর্যটক এই লেখক কোথাও বেশি দিন থিতু হতে পারেননি। কর্মজীবনেও কোথাও স্থায়ী হননি। ভ্রমণ বিমুখতায় তিনি গুরুদেবের দোহাই দিলেও বাস্তবে রবীন্দ্রনাথ এবং তার শিষ্য মুজতবা আলী দুজনেই ভ্রমণকে খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের লেখক জীবনে এবং রচনাশৈলীতেও পড়েছে তার গভীর প্রভাব। ভ্রমণ তার শুধু কায়িক ছিল না। মানস ভ্রমণেও মুজতবার তুলনা ভার। তিনি দেশের কোনো কিছুর বর্ণনা দিতে গেলেই সেখানে অবলীলায় বিদেশি প্রসঙ্গ টেনে আনেন। আবার কায়রোয় বসে তার প্রাণ কাঁদে চারটে আতপ চাল, উচ্ছে ভাজা, সোনা মুগের ডাল, পটোলভাজা আর মাছের ঝোলের জন্য।

মুজতবা দাবি করেছেন, শুধু ভ্রমণের আনন্দ উপভোগের জন্য কখনো বাড়ি ছেড়ে বের হননি। যেটুকু গেছেন তা দায়ে পড়ে। কথার মধ্যে কিছুটা সত্যতা আছে। তার জন্ম হয়েছিল সিলেটের করিমগঞ্জ মহকুমায়। যা এখন ভারতের অন্তর্ভুক্ত। স্কুলজীবন কেটেছে সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট। বাবার বদলির চাকরির কারণে এটা ঘটেছে। তারপর পড়াশোনা করতে গেছেন শান্তিনিকেতনে। চাকরির জন্য গেছেন আফগানিস্তানে। উচ্চশিক্ষার জন্য গেছেন জার্মানি ও মিসরে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। কিন্তু উসিলা যা-ই থাকুক তার রক্তে যে ভ্রমণের নেশা; সেটা তিনি গোপন করবেন কীভাবে। সেসব অভিজ্ঞতাই এসেছে তার ভ্রমণ সাহিত্যে। আনন্দের ভাগ থেকে পাঠককেও বঞ্চিত করেননি তিনি। তার রচনাবলির প্রায় সর্বত্রই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভ্রমণ বিবরণ। তবে নির্ভেজাল ভ্রমণ সাহিত্যের বই দেশে বিদেশে, জলে ডাঙায়, চাচা কাহিনি, মুসাফির প্রভৃতি।

মুজতবা আলীর লেখা প্রথম বইটিই ছিল ‘দেশে বিদেশে’। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ধারাবাহিকভাবে ‘দেশ’ পত্রিকায়। সম্পাদক সাগরময় ঘোষ তার সম্পাদকের বৈঠকে গ্রন্থে ‘দেশে বিদেশে’-এর বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি সুন্দর স্মৃতিচারণ করেছেন। তিনি একে ভ্রমণ কাহিনি বলেই অভিহিত করেছেন। শ্রীঘোষ তার অফিসের কক্ষে সদ্য পাওয়া ‘দেশে বিদেশে’-এর পান্ডুলিপি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তেন। তখনো সেটি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। আড্ডার বন্ধুরা তার এই মনোযোগে বিরক্ত হতেন। একজন কথাশিল্পী এক দিন বলেই বসলেন, ‘রাবীন্দ্রিক হাতের লেখা যে বিরাট পান্ডুলিপিটার ওপর আপনি এতক্ষণ হুমড়ি খেয়ে পড়ে ছিলেন, সে বস্তুটি কী জানতে পারি?’ ‘ভ্রমণ কাহিনি’। আমার কথা শুনে সব্যসাচী-সাহিত্যিক গাল্পিক সাহিত্যিককে একটু ভরসা দেওয়ার সুরে বললেন, ‘যাক বেঁচে গেলেন। উপন্যাস তো নয়। উপন্যাস হলেই ভয়। আবার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী দেখা দিল।’ আমি বললাম নাইবা হলো উপন্যাস। এ লেখার জাতিপাঁতি স্বতন্ত্র। উপন্যাস এর ধারে কাছে লাগে না। ১০ জোড়া বড় বড় চোখে এক রাশ বিস্ময় ভরা প্রশ্ন জেগে উঠল ‘লেখকটি কে?’ আপনারা চিনবেন না। সৈয়দদা। লেখকরা যাকে সেদিন চিনতে পারেননি প্রথম লেখা ভ্রমণ কাহিনি দিয়েই মুজতবা আলী বাংলা সাহিত্যে তার আসনটি পাকা করে নিয়েছিলেন।

সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রথম যে গ্রন্থ দিয়ে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে আত্মপ্রকাশ করেন, তার নাম দেশে বিদেশে। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায়। বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যের এটি একটি অভিনব সংযোজন। এই বইটির মাধ্যমে তিনি যে রচনাশৈলী প্রবর্তন করেন, তা আজও পাঠককে কালজয় করে ধরে রেখেছে।

কী আছে এই বইটিতে? দুই খন্ডে প্রকাশিত দেশে বিদেশের প্রথম খন্ড হচ্ছে কলকাতা থেকে রেলপথে কাবুল যাত্রার এক চমৎকার বিবরণ। ট্র্যাভেলগের ভঙ্গিতে লেখক সেখানে তুলে ধরেছেন তার যাত্রা পথের সঙ্গী বিচিত্র সব চরিত্র, যারা একই সঙ্গে অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ, মানবিকতায় দৃষ্টান্ত আবার আনন্দ দানে সক্ষম। চলার পথে তিনি যেসব এলাকা অতিক্রম করেন, সেসব অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য, পোশাক-আশাক, সংস্কৃতি, কৌতুকবোধ কোনো কিছুই তার সরস কলমে বাদ পড়েনি। শুরু হয়েছে কলকাতার ফিরিঙ্গি সহযাত্রীকে নিয়ে। পরে তা বিস্তৃত হয়েছে পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে, বিশেষ করে পাঞ্জাব ও পেশোয়ারের পথের শিখ সর্দারজি ও পাঠান সহযাত্রীদের কথা।

দ্বিতীয় খন্ড অন্যরকম। প্রথম খন্ড পড়ে যারা ধারণা করবেন ‘দেশে বিদেশে’ হচ্ছে একটি ভ্রমণ কাহিনি, দ্বিতীয় খন্ডে তাদের হোঁচট খেতে হবে। সেখানে কোনো ভ্রমণ বৃত্তান্ত নেই। আছে লেখকের নতুন কর্মস্থল আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা। সেখানকার প্রগতিশীল শাসক আমানুল্লাহর আধুনিক আফগানিস্তান গঠনের স্বপ্ন, মোাল্লাতন্ত্রের বিরোধিতা, প্রতি বিপ্লবে আমানুল্লাহর পতন তথা আফগানিস্তানের উত্থান-পতনের বিবরণ। তিনি কাবুলি মানুষের সহজ-সরল জীবনযাত্রা, চলন-বলনে, খাওয়া-দাওয়ায় যে ঐতিহ্যÑ সব কিছুই নিপুণ শিল্পীর মতো তুলে ধরেছেন।

‘দেশে বিদেশে’ কোনো বাস্তবতা বিবর্জিত কাহিনি নয়। এটা লেখকের আফগানিস্তানবাসের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফসল। ১৯২৭ সালে তিনি আফগানিস্তানের শিক্ষা বিভাগে চাকরি লাভ করেন। কাবুলের কৃষিবিজ্ঞান কলেজে মাসিক ২০০ টাকা বেতনে ফরাসি ও ইংরেজি ভাষার প্রভাষক নিযুক্ত হন। বছর না যেতেই কাবুলের শিক্ষা বিভাগ মুজতবা আলীর জার্মান ভাষায় গভীর জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে তার বেতন বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করেন। এতে পাঞ্জাবি শিক্ষকরা ঈর্ষাকাতর হয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে গিয়ে বলেন, সৈয়দ মুজতবা আলীর ডিগ্রি হচ্ছে বিশ্বভারতীর। সেটা কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আপনাদের সনদে পাঞ্জাব গভর্নরের দস্তখত আছে। আমাদের এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রেও গভর্নরের অভাব নেই। কিন্তু মুজতবা আলীর সনদে দস্তখত করেছেন স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর তিনি পৃথিবীর কাছে সারা প্রাচ্য দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।

তবে আফগানিস্তানের পটভূমিতে শুধু দুই খন্ড ‘দেশে বিদেশে’ নয়, ‘শবনম’-এর মতো কালজয়ী উপন্যাসও লিখেছেন মুজতবা আলী। তার বিভিন্ন রচনায় ঘুরে ফিরে এসেছে আফগানিস্তানের প্রসঙ্গ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই অভিজ্ঞতা প্রকাশে তিনি সময় নিয়েছেন অনেক বেশি। কিশোর বয়সে হাতে লেখা ‘কুইনিন’ পত্রিকার মাধ্যমে যার সাহিত্যচর্চার হাতে খড়ি, তিনি রীতিমতো পরিণত বয়সে গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর আগে তার যে পাঁচটি প্রবন্ধের সন্ধান পাওয়া গেছে, সেগুলো ঠিক মুজতবা সাহিত্যের প্রতিনিধিত্ব করে না। লক্ষণীয় যে, রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় গুরুদেবের কাছ থেকে উৎসাহ পাওয়ার পরও মুজতবা আলী সাহিত্যচর্চার ব্যাপারে কিছুটা কুণ্ঠিত ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর দেশে বিদেশে প্রকাশিত হয় এবং সাহিত্যাঙ্গনে তিনি প্রথম বইটি দিয়েই অক্ষয় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

বাস্তব অভিজ্ঞতার কারণে দেশে বিদেশের একটি প্রামাণ্য মূল্যও আছে। তবে লেখক একে সন-তারিখ দিয়ে তথ্য ভারাক্রান্ত করতে চাননি। সন-তারিখ না দিয়ে তিনি একে প্রতীকী করে তোলার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী ছিলেন। দেশ সমাজ ও মানুষের বিবরণ এলেও এর কাহিনি হয়ে গেছে কালনিরপেক্ষ। তবে এতে রস ক্ষুণœ না হয়ে আরো বেড়েই গেছে বলা চলে। তার ভাষায় বৈদগ্ধ্য আছে। পান্ডিত্য আছে। কিন্তু সেটা অহেতুক জটিলতা সৃষ্টি করে না। সে কারণে সাধারণ গল্প-উপন্যাস যখন পাঠকের কাছে একঘেয়ে মনে হচ্ছিল; তখন এ রকম রম্য বর্ণনায় তত্ত্ব কথা ও ভ্রমণের আনন্দ পেয়ে পাঠক এই বইটি লুফে নেয়।

লেখক : কবি, গবেষক ও সাংবাদিক

[email protected]

 

"