মুক্তমত

অ্যামাজনে আগুন ও দেশের ওপর প্রভাব

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার

দক্ষিণ আমেরিকার ৯টি দেশের প্রায় ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে অ্যামাজন বনের বিস্তৃতি। চিরহরিৎ বৃষ্টিবহুল এই বন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ। এ বনে অগ্নিকান্ড বা দাবানলের ঘটনা নতুন কিছু নয়। রেইন ফরেস্ট হওয়ায় অ্যামাজন বন পৃথিবীর আর্দ্র জায়গাগুলোর একটি। প্রতি বছর অ্যামাজনে প্রায় ২০০ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। আগস্ট থেকে নভেম্বর সময়ে অ্যামাজন বন শুষ্ক থাকে। এ সময়ে প্রাকৃতিকভাবে প্রায়ই অগ্নিকান্ড ঘটে থাকে এবং গত বছর পর্যন্ত এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা ছিল, তবে এ বছর অস্বাভাবিকভাবে অগ্নিকান্ড বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চের তথ্যমতে, অ্যামাজন বনে ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ৮৫ শতাংশ বেশি অগ্নিকান্ড সংঘটিত হয়, যা বিগত সব বছরের থেকে সর্বোচ্চ। ২০১৮ সালে অগ্নিকান্ডের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজারবার, কিন্তু ২০১৯ সালে মাত্র ৮ মাসের মধ্যে শুধু ব্রাজিলের অংশে ৭৫ হাজারবার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রথম আলোর ২৫ আগস্টের তথ্যানুযায়ী, ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ব্রাজিল অংশে প্রায় ২ হাজার ৫০০ স্থানে অগ্নিকান্ড সক্রিয় রয়েছে। এত বেশি আগুন লাগার পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ রয়েছে। প্রাকৃতিক কারণগুলোর মধ্যে বজ্রপাত অন্যতম। এ ছাড়া গাছে গাছে ঘর্ষনের ফলেও অনেক সময় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে।

অন্যদিকে World Wildlife Fund (WWF)-এর মতে, অ্যামাজন বনের যেখানে গাছ কাটার ক্ষেত্রে যন্ত্র ব্যবহার করা যায় না; সেখানে আগুন ধরিয়ে বন উজাড় করা হয়, পরবর্তী সময় সে জায়গাগুলো মানুষের বাসস্থান, কৃষি উৎপাদন, গবাদিপশু চারণের জন্য ব্যবহার করা হয়। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যে, সারা পৃথিবীতে গরুর মাংসের চাহিদার ২৩ শতাংশ সরবরাহ করে ব্রাজিল। এ ছাড়াও বিপুল পরিমাণে প্যাকেটজাত দুধ সরবরাহ করা হয়ে থাকে ব্রাজিল থেকে। তাই তাদের প্রচুর পরিমাণে পশু চারণভূমির প্রয়োজন রয়েছে এবং অগ্নিকান্ডে বন পুড়ে পশু চারণভূমির বিস্তার হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চের হিসাবমতে, দাবানলের ফলে প্রতি মিনিটে অ্যামাজনের প্রায় ১০ হাজার বর্গমিটার এলাকা পুড়ে যাচ্ছে। এই হিসাব অনুযায়ী দৈনিক ১৪ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার জায়গা পুড়ছে এবং গত ১৫ দিনে সম্পূর্ণ অ্যামাজনের প্রায় ২.৬ শতাংশ (যা বাংলাদেশের আয়তনেরও বেশি) ধ্বংস হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিলের দূরত্ব ১৬ হাজার ৩০০ কিলোমিটার। অ্যামাজন বনের অগ্নিকান্ড বাংলাদেশের ওপরও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করবে। প্রথমত অগ্নিকান্ড থেকে সৃষ্ট তাপ ও গ্রিন হাউস গ্যাসের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পাবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়বে। যে পরিমাণ বন ধ্বংস হয়েছে তাতে মোট অক্সিজেনের সরবরাহ ০.০৩ ভাগ কমে যাওয়ার এবং কার্বন শোষণের পরিমাণ ০.০৪ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এই অগ্নিকান্ডের ফলে সৃষ্ট পার্টিকুলেট ম্যাটার, ধোঁয়াশা, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, মারকারি, ডাই অক্সিন ইত্যাদি বায়ুদূষণ করছে। এই বায়ুদূষণ শুধু অ্যামাজন বা পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য নয়, এটি একটি ট্রান্সবাউন্ডারি বা আন্তর্জাতিক সমস্যায় রূপ নেবে এবং বাংলাদেশের ওপরও এর প্রভাব বিস্তার করবে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট ও ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন যৌথ উদ্যোগে State of Global Air-2019 প্রতিবেদনটি অনুযায়ী বিশ্বের ৯টি দেশের মধ্যে বায়ুদূষণে মৃত্যুর সংখ্যায় পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সেক্ষেত্রে যদি অ্যামাজনের অগ্নিকান্ডের ফলে বাংলাদেশে বায়ুদূষণ বাড়ে; তার ফলে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব আরো বেশি বেড়ে যাবে। বায়ুতে মিশে থাকা এসব দূষক গ্যাসগুলো আবার অ্যাসিড বৃষ্টির জন্য দায়ী, যা প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এই অগ্নিকান্ডের কারণগুলো খুঁজে বের করে তার স্থায়ী সমাধান করা। দক্ষিণ আমেরিকার অ্যামাজন অববাহিকার ৯টি দেশের সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। অ্যামাজন রক্ষায় একটি ফান্ড তৈরি করা যেতে পারে; যেখানে বিশ্বের প্রতিটি দেশ অংশগ্রহণ করবে। একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে পরিমাণ অক্সিজেন প্রয়োজন তা দুটি পূর্ণবয়স্ক গাছ সরবরাহ করতে পারে। অ্যামাজনের এই ক্ষয়ক্ষতি পুরো পৃথিবীর; প্রয়োজন অ্যামাজনে পুনঃবনায়ন ও পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে বনায়ন বৃদ্ধি করা।

লেখক : অধ্যাপক, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

 

"