মুক্তমত

আত্মহত্যা প্রতিরোধে চাই সমন্বিত উদ্যোগ

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

আজ বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী সচেতনতামূলক দিন আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। এই দিবসটি পালন করতে আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থার সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশন যৌথভাবে কাজ করে। ২০১১ সালে বিশে^র ৪০টি দেশ এই দিবসটি পালন করে। ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার করা মানসিক স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বের নিম্ন আয়ের কোনো দেশেই আত্মহত্যা প্রতিরোধে কোনো কৌশল বা কর্মপন্থা ঠিক করা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৪ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি বছর বিশে^ আট লাখেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে। সংস্থাটির মতে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে। এরও প্রায় ১৫ থেকে ২০ গুণ মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। এই ভয়াবহতা রোধে জনসচেতনতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যৌথভাবে প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালন করে থাকে।

আমাদের দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন আত্মহনন করে। এর মধ্যে নারী-পুরুষ-শিশু সব বয়সের মানুষ রয়েছে। তবে অধিকাংশ ঘটনায় দেখা যায়, আত্মহত্যা করেন ২১ বছর থেকে ৩০ বছরের নারী। তবে এ বয়সি কিছু পুরুষও নানা কারণে আত্মহনন করছেন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে গত বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১ হাজারের অধিক মানুষ আত্মহত্যা করেছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে আত্মহত্যা করেছে ৫৪ হাজার ৩৯ জন নারী-পুরুষ-শিশু। সে হিসাবে গড়ে প্রতি বছর আত্মহত্যা করে ১১ হাজারের মতো। দিনের হিসাবে তা দাঁড়ায় প্রায় ৩০ জন। অর্থাৎ অন্যান্য অপমৃত্যু ছাড়াও দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন নারী-পুরুষ-শিশু আত্মহনন করছে। সংখ্যাটি আমাদের দেশের জন্য চরম উদ্বেগজনক। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে দেশে আত্মহননের পরিমাণ সাড়ে ৬ হাজারের অধিক।

আত্মহত্যার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত বৈষম্য, বঞ্চনা, বিভ্রান্তি, হতাশা এবং না পাওয়ার যন্ত্রণার কারণে মানুষ আত্মহত্যা করে। যেখানে সমাজের ভারসাম্য কম, অগ্রগতির সুফল সবাই সমানভাবে পায় না এবং বিভক্তি বেশি; সেখানে আত্মহত্যার প্রবণতাও বেশি। আত্মহত্যা ঠেকাতে হলে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। জাগ্রত করতে হবে সুস্থ মানবিক মূল্যবোধ। আর তা করা গেলে আত্মহত্যার প্রবণতা কমে আসবে। নতুবা আত্মহত্যার ঘটনা ক্রমে বাড়তেই থাকবে। অপরাধ, সমাজ ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সংগঠিত প্রতিটি আত্মহত্যার ঘটনাগুলোতে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হলেও জোরাল ও সুষ্ঠু তদন্ত হয় না বললেই চলে। অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঘটনার জোরাল ও সুষ্ঠু তদন্ত হলে এসব ঘটনার নেপথ্য কারণ বেরিয়ে আসবে। এতে অপরাধী বা অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সমাজের সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা থাকলে অনেকাংশে এসব আত্মহত্যার ঘটনা কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আত্মহত্যাসহ সব অপমৃত্যুর ঘটনার ব্যাপারে দেশের সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে।

পুলিশ সদর দফতরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে আত্মহত্যাসহ অপমৃত্যু হয়েছে ৮৭ হাজার ৬১৯ জনের। এর মধ্যে আত্মহত্যা করেছে ৫৪ হাজার ৩৯ জন নারী-পুরুষ-শিশু। আর অন্যান্য কারণে অপমৃত্যু হয়েছে ৩৩ হাজার ৫৮০ জনের।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন আত্মহনন করে। এরমধ্যে নারী-পুরুষ-শিশু সব বয়সের মানুষ রয়েছে। তবে অধিকাংশ ঘটনায় দেখা যায়, আত্মহত্যা করেন ২১ থেকে ৩০ বছরের নারী।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবার আগে আত্মহত্যাপ্রবণ লোকদের শনাক্ত করতে হবে। তারপর তাকে আত্মহত্যা থেকে দূরে রাখতে প্রয়োজন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ। বিশেষ করে যারা বিভিন্ন মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত তাদের স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, কীটনাশক বা বিষ, বিষাক্ত পদার্থ ইত্যাদি দূরে রাখতে হবে। এ ছাড়া গণমাধ্যমে আত্মহত্যাবিরোধী প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে।

ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, হংকং, মালয়েশিয়া, স্কটল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, কানাডা, কলম্বিয়া, সুইজারল্যান্ড, সুদান, ঘানা, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, ফিজিসহ বিভিন্ন দেশ আত্মহত্যা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালনসহ আত্মহত্যা প্রতিরোধে নানা ধরনের জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। আমাদের দেশে এ ধরনের কোনো কার্যক্রম নেই। তবে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে আমাদের দেশেও আত্মহত্যার ঘটনা হ্রাস করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"