মতামত

শিক্ষার্থী নির্যাতন রোধে নীতিমালা

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

মাত্র আট বছরের শিশু দিপজয় মন্ডল। সে খুলনার কয়রা উপজেলার ৩৫ নম্বর দক্ষিণ মঠবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত ২৬ আগস্ট এ শিশুকে একটি প্লাস্টিকের চেয়ার ভাঙার অপরাধে প্রচন্ড মারধর করে আহত করেন তারই বিদ্যালয়ের মনিরুজ্জামান নামের এক শিক্ষক। শুধু মারধর করে আহত করেই ক্ষান্ত হননি তিনি! ওই ভাঙা প্লাস্টিকের চেয়ার শিশুটির কাঁধে ঝুলিয়ে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি পর্যন্ত যেতে বাধ্য করা হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা শিশুটির পেছনে পেছনে বাড়ি পর্যন্ত যান। এতে শিশুটি প্রচন্ডভাবে শারীরিক ও মানসিক আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, স্কুল চলাকালীন সময়ে মাত্র আট বছর বয়সি শিশু দিপজয় মন্ডল একটি প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে খেলতে থাকা অবস্থায় চেয়ারটি পড়ে গিয়ে সামান্য ফেটে যায়। বিষয়টি নিয়ে ওই শিশু শিক্ষার্থীকে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করেন স্কুলের সহকারী শিক্ষক মনিরুজ্জামান। এ সময় মাটিতে পড়ে কান্নাকাটি করতে থাকে শিশুটি। শিক্ষক মনিরুজ্জামান শুধু চড়-থাপ্পড় দিয়ে ক্ষান্ত হননি, প্রধান শিক্ষককে ডেকে এনে শিশুটিকে বকাঝকা করে তার কাঁধে তুলে দেন ফাটা সেই প্লাস্টিকের চেয়ার। সেই সঙ্গে বলেন, ‘চেয়ার কাঁধে করে বাড়ি নিয়ে যাবি এবং আগামী দিন তোর বাপের কাছ থেকে নতুন চেয়ার কিনে নিয়ে স্কুলে আসবি, নতুবা স্কুলে আসার দরকার নেই।’

শিক্ষকের ভয়ে শিশু দিপজয় মন্ডল কাঁদতে কাঁদতে চেয়ারটি কাঁধে তুলে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়। এ সময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক মনিরুজ্জমানসহ অন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা শিশুটির পেছনে পেছনে তার বাড়ি পর্যন্ত যান। সেই সঙ্গে স্কুল থেকে শিশুটির বাড়ি পর্যন্ত উৎসুক শতাধিক জনতাও ভিড় করেন। এ অবস্থায় অবোঝ আট বছরের ছোট শিশু দিপজয় মন্ডল লজ্জা আর অপমানে কান্নায় ভেঙে পড়ে। শিশুটি যখন তার নিজ বাড়িতে যায় তখন তার বাড়িতে কেউ ছিল না। এ অবস্থায় শিশুটির পেছনে পেছনে আসা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা স্কুলে ফিরে যান। যাওয়ার সময় শিক্ষক মনিরুজ্জামান শিশুটিকে পুনরায় ভয় দেখিয়ে বলে যান, ‘আগামী দিন নতুন চেয়ার কিনে নিয়ে স্কুলে আসবি। নতুবা স্কুলে আসার প্রয়োজন নেই।’ সেই দিন সারা রাত চোখ ও কানের যন্ত্রণায় ছটফট করে কাটিয়েছে শিশুটি। তার কান্নাকাটিতে বাড়ির লোকজনও জেগে কাটিয়েছে। পর দিন সকালে বাম চোখ ও বাম কানে আঘাতপ্রাপ্ত শিশু দিপজয় মন্ডলকে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসায় শিশুটি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠলেও তার চোখে-মুখে রয়েছে আতঙ্কের ছাপ। সে আর স্কুলে যেতে চায় না।

এ ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে সরকারের ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১১’ মাঠপর্যায়ে মুখ থুবড়ে পড়ছে। এটি একটি ঘটনা মাত্র। এ ধরনের ঘটনা প্রতিনিয়তই দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটেই চলেছে। কোনো কোনো ঘটনা সাধারণ মানুষের নজরে আসে আর কোনো কোনোটি থেকে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে।

এবার চোখ ফেরানো যাক সরকারের ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১১’-তে কী রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে সরকার যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে তাতে ১১ ধরনের শারীরিক ও দুই ধরনের মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নিষিদ্ধ শারীরিক শাস্তিগুলো হলো শিক্ষার্থীদের হাত-পা বা কোনো কিছু দিয়ে আঘাত বা বেত্রাঘাত, চক বা ডাস্টার জাতীয় বস্তু ছুড়ে মারা, আছাড় দেওয়া ও চিমটি কাটা, শরীরের কোনো স্থানে কামড় দেওয়া, চুল টানা বা কেটে দেওয়া, হাতের আঙুলের ফাঁকে পেনসিল চাপা ও মোচড় দেওয়া, ঘাড় ধাক্কা দেওয়া, কান টানা বা উঠ-বস করানো, চেয়ার-টেবিল বা কোনো কিছুর নিচে মাথা দিয়ে দাঁড় করানো বা হাঁটু গেড়ে দাঁড় করিয়ে রাখা, রোদে দাঁড় করিয়ে বা শুইয়ে রাখা কিংবা সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড় করানো এবং শ্রম আইনে নিষিদ্ধ কোনো কাজ শিক্ষার্থীদের দিয়ে করানো। আর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে মা-বাবা, বংশ পরিচয়, গোত্র-বর্ণ ও ধর্ম স¤পর্কে অশালীন মন্তব্য, অশোভন অঙ্গভঙ্গি করা বা শিক্ষার্থীদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে, এমন বিষয়গুলো মানসিক শাস্তি হিসেবে চিহ্নিত হবে।

সরকারের নীতিমালায় শিক্ষক-শিক্ষিকা কিংবা শিক্ষা পেশায় নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি অথবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী পাঠদানের সময় কিংবা অন্য কোনো সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এ ধরনের শাস্তিযোগ্য আচরণ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক, নিম্ন-মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ, উচ্চমাধ্যমিক কলেজ, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসাসহ (আলিম পর্যন্ত) অন্য সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হবে বলে উল্লেখ রয়েছে নীতিমালায়। নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে এ ধরনের শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ উপস্থাপন এবং ওই শিক্ষক অভিযুক্ত হলে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫ এর আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনেও এর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। এসব অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে, তা ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার পরিপন্থি হবে এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর আওতায় অসদাচরণের অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। তবে সরকারের ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১১’ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন কতটুকু হচ্ছে, তা উল্লিখিত ঘটনা থেকেই প্রমাণিত।

শিক্ষক হলেন সমাজের নৈতিকতার অনন্য প্রতীক। তিনি যা শিক্ষা দেবেন কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে সে শিক্ষাকে ধারণ করে জীবন পরিচালিত করবে। একজন শিক্ষক মাত্র আট বছরের একটি শিশুর প্রতি মানবিক আচরণে ব্যর্থ হলেন। এ ধরনের শিক্ষকদের হাতে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিশুই নিরাপদ নয়। যারা শিশুর প্রতি অমানবিক আচরণ করেন তাদের অবিলম্বে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এখন সময়ের দাবি। নতুবা শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। অকালে ঝরে যাবে দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধাররা।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"