প্রত্যাশা

জলাশয় সুরক্ষা জরুরি

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

দেশের নদী-খাল-জলাশয় বিলীয়মান অনেক দিন ধরেই। বিলীন হতে থাকার কতক কারণ রয়েছে। একটি কারণ ভাটির দেশ বলে উজানের পানির সঙ্গে প্রচুর পলি বাহিত হয়; সেগুলো সঞ্চিত হয় নদী-খালের তলদেশে, বিল-জলাশয়ে। নিয়মিতভাবে সেই পলি নিষ্কাশন করা হয় না। ভরাট হওয়ার এটিই বড় কারণ। দ্বিতীয় কারণ বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশে ভূমিরূপ ও পরিবেশ-প্রতিবেশের কথা না ভেবে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ নির্মাণ। এর ফলে নদী-খালে পলি সঞ্চয়ন বেড়েছে। তৃতীয় কারণ সরকারি- বেসরকারি দখল ও নদী-খাল-জলাশয় ভরাট করা। কার্যত জলাভূমি বা জলপ্রবাহ দখলের মহোৎসব চলছে। দখল করার বিষয়টি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্ম নদীর পানিতে বয়ে আনা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পলিকণা দিয়ে। লাখো বছরের প্রক্রিয়ায় পলি সঞ্চয় করে নদীই গড়ে তুলেছে ‘ব’ আকৃতির পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের প্রধান নদীগুলো তার যৌবন হারাচ্ছে, শাখা নদী, উপ-নদীগুলো বিলীন হয়ে গেছে। সরকারি তথ্যেই নদ-নদীর সংখ্যা ৭০০ থেকে ৪০৫-এ নেমেছে। বেসরকারি তথ্যে এ সংখ্যা আরো কম ২৩০। নদীর উজানে অন্য দেশের বাঁধ নির্মাণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকা- আর দখল রাজত্ব নদীকে অঙ্গহানি করে তিলে তিলে মারছে। নদীর সঙ্গে মরছে নদীর ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশও। কৃষিপ্রধান উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ দেখা দিয়েছে, সেচ চাহিদা মেটাতে হচ্ছে মাটির নিচের পানি তুলে। তাতে বিপদ আরো বাড়ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে, মাটির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে। নদীভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা হারিয়ে যাচ্ছে, সস্তায় পণ্য পরিবহনের পথ রুদ্ধ হচ্ছে। নদীর মাছ হয়ে উঠছে অমূল্য পণ্য। নদীতে মাছ ধরা, নৌকায় নদী পারাপার করা জেলে-মাঝিদের জীবনধারা বাস্তব থেকে চিত্রশিল্প হয়ে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে।

কেবল ভূখ- সৃষ্টি আর দেশকে সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলাই করেনি নদী; বিশ্বের প্রায় সব সভ্যতার বিকাশও ঘটিয়েছে নদী। খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ বছরের পুরোনো সভ্যতার খোঁজ মিলেছে নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বরে, পুরোনো ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। মহাস্থানগড় থেকে পাহাড়পুর, ময়নামতি, কোটালীপাড়া, সোনারগাঁ, খলিফাতাবাদ, বারোবাজার জনপদ গড়ে উঠতেও ভূমিকা রেখেছে নদী। মুক্তিযুদ্ধেও মায়ের রূপে অবির্ভূত হয়েছে নদী। ‘তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা মেঘনা যমুনা’ সেøাগান বাংলার দামাল ছেলেদের রক্তে স্বাধীনতার খরস্রোত জাগিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে উত্তাল শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চও এই সেøাগানে প্রকম্পিত করে তরুণ প্রজন্মকে। মোগলরাও বাংলা সুরক্ষিত রাখতে এ অঞ্চলে শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তোলে। আবুল ফজলের বিখ্যাত ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে বলা আছে, ‘তখন ঢাকা ছিল নৌবহরের সদরঘাঁটি।’

এ দেশে আছে খরস্রোতা নদী, আছে শান্ত নদী। বিশাল উত্তাল পদ্মা, মেঘনা, যমুনাও রয়েছে। নদীর ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায় মানুষের জীবনও। ১৯ শতকে ভৈরব, কপোতাক্ষ, যমুনা মজে যেতে থাকলে যশোরে লোকসংখ্যা কমতে থাকে। সতীশচন্দ্র মিত্রের মতে, ১৮৮১ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরে যশোরে লোকসংখ্যা কমে যায় ৫০ হাজার। মৃত নদীতে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বাড়ে। ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ ১৯৬৮ সালে মৃত নদী ও নদী-তীরবর্তী মানুষকে নিয়ে লেখেন ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাস। ওই সময়ই চিত্রা নদী তাজা হয়, জনবসতি বাড়তে থাকে নড়াইল ও মাগুরায়।

প্রকৃতির আশীর্বাদ হিসেবে পাওয়া যে নদীর এত দান, সেই নদীর প্রাণ কেড়ে নিতে চলছে যেন প্রতিযোগিতা। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা ছিল ৭০০-এরও বেশি, এখন তা ৪০৫টিতে নেমেছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যে নদীর সংখ্যা আরো কমে ২৩০টিতে নেমেছে। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত ‘মিজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’-এর নদীসংখ্যায় বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ২৩০ থেকে ২৭০টি বলে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ সাড়ে চার দশকে প্রায় ৫০০ নদী মরে গেছে, নদীপথের দৈর্র্ঘ্য-প্রস্থ উভয়ই কমেছে। নদীর সঙ্গে কমছে নৌপথও। স্বাধীনতাকালে নৌপথ ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার, এখন নেমেছে ৬ হাজার কিলোমিটারে। শীতকালে নৌপথ আরো কমে নামে ৩ হাজার ৮২৪ কিলোমিটার।

জলপ্রবাহ ও জলাধার ভরাট বা দখল হয়ে যাওয়ার কারণে বিবিধ সমস্যায় পড়ছে দেশ ও মানুষ। নৌ-যোগাযোগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে; নৌ-ঘাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, মৎস্যজীবীরা সংকটে পড়ছে, অনেকে পেশা ছেড়ে দিয়েছে; সেচের পানির অভাবে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে, জীববৈচিত্র্যও হারিয়ে যাচ্ছে। জরুরিভিত্তিতে এ অবস্থার অবসানের জন্য পদক্ষেপ না নিলে সমূহ বিপদ। আমরা আশা করি, নদী-খাল-জলাশয় রক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো সমন্বিত ব্যবস্থা নেবে।

লেখক : সহসভাপতি, এফবিসিসিআই

 

"