পর্যবেক্ষণ

স্বপ্ন হচ্ছে জীবন রেলের জ্বালানি

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

এস এম মুকুল

কথায় বলে মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। কথাটি প্রতীক অর্থে বলা হলেওÑ বাস্তবতা অনেকটাই এ রকম। কেননা, মানুষ যা আশা করে তা যদি সে বিশ্বাসে রূপান্তরিত করতে পারে, তখনই স্বপ্নপূরণ করা সম্ভব হয়। তাই স্বপ্ন বড় করে দেখতে হয়। বিশ্বাসের সঙ্গে তা ধারণ করতে হয়। তারপর সেই স্বপ্নপূরণের পথ তৈরি করতে হয়। স্বপ্ন মানে বাস্তবতার সিঁড়িপথ। স্বপ্ন মানে একটি গন্তব্যÑ যেখানে আপনি যেতে চান। বাস্তবিক স্বপ্ন ও চেষ্টা কখনোই ব্যর্থ হয় না। মার্কনি স্বপ্ন দেখতেন, স্রষ্টার শক্তিকে জয় করে কাজে লাগাবেন। তিনি যে ভুল স্বপ্ন দেখেননি তার প্রমাণ বেতার ও টেলিভিশন আবিষ্কার। মার্কনি যখন দাবি করলেন তিনি তারের সাহায্য ছাড়াই বাতাসের মধ্য দিয়ে সংবাদ পাঠানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, তখন তার বন্ধুরা তাকে মনস্তাত্ত্বিক হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাই তার স্বপ্ন আর বিশ্বাসের ফলেই অসাধ্যকে সাধন সম্ভব হয়েছে।

তবে স্বপ্নপূরণে, সফলতা অর্জনে সততা ও পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। এর সঙ্গে মেধা ও স্বপ্নের যোগ হলে সফলতা আসবেই। মনে রাখতে হবে, কখনো অন্যকে ঠকিয়ে বড় হওয়া যায় না। এ প্রসঙ্গে একটি গল্প শুনুন। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা কেয়া কসমেটিকসের স্বত্বাধিকারী আবদুল খালিক পাঠান ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখতেন ব্যবসা করে অনেক টাকার মালিক হবেন। তিনি যখন তৃতীয় শ্রেণি বা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়েন, তখন স্কুলে যাওয়ার সময় বাবা টিফিন বাবদ আট আনা বা বারো আনা দিতেন। তিনি সেই টাকা জমিয়ে চকলেট কিনতেন। বিস্কুট আর চকলেট রাস্তার পাশে বসে বিক্রি করলে কিছু লাভ হতো। এভাবেই লাভের লোভে পড়ে গেলেন তিনি। বন্ধুর সঙ্গে শুরু করলেন মুরগির ব্যবসা। স্থানীয় বাজার থেকে কিনে দূরের বাজারে বিক্রি করতেন। লাভের টাকা খরচ করতেন না বলে মূলধন বাড়তে লাগল। কিন্তু সমস্যা বাধল অন্য জায়গায়। মুরগি ব্যবসায়ী হওয়াটা তার পরিবারে কেউই পছন্দ করতেন না। তাই তিনি মুরগি কিনে রাখতেন এক বন্ধুর বাসায়। এক দিন বন্ধু এসে বলল, মুরগিগুলো শেয়ালে নিয়ে গেছে। মুরগির কিছু পাখনা আর মায়াকান্না দিয়ে ভোলানোর চেষ্টা করল বন্ধুটি। সব পুঁজি শেষ। কিছুদিন পর তিনি নানাবাড়ি গেলেন। বহু কষ্টে অল্প কিছু টাকা জোগার করলেন। নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করলেন। ঠিক করলেন এবার আর কোনো অংশীদার নয়। পাইকারি কিনে রাস্তার পাশে বসে খুচরা বিক্রি করতে লাগলেন। পরে স্বাধীনতার যুদ্ধের অটো-প্রমোশনটা বাদ সাধল ব্যবসায়। এক লাফে ক্লাস ফোর থেকে সিক্সে উঠলেন। বাবার কড়া হুকুমÑ ‘অনেক হয়েছে আর নয়, পান-বিড়ি বিক্রি বাদ দিয়ে মন দিয়ে লেখাপড়া করো।’ সুতরাং ব্যবসার অদম্য ইচ্ছাটাকে মনের খাঁচায় পুরে রেখে পড়ালেখায় মনোনিবেশ করলেন। ১৯৭৮ সালে মেট্রিক পাস করলেন। তারপর প্রেম এবং প্রেম থেকে বিয়ে।

বিয়েটা কোনো পক্ষই মানল না। স্ত্রীর জমানো ৬০০ টাকা হাতে তুলে দিল। এই টাকাই তাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাল। শুরু করলেন লাকড়ির ব্যবসা। স্ত্রী তার পরিবার থেকে পাওয়া গয়নাটি বিক্রি করে হাজার পাঁচেক টাকা হলো। পুকুর লিজ নিয়ে রুই মাছের পোনা ছাড়লেন। এই পোনা বড় হতে লাগবে তিন বছর। অত দিন ধৈর্য ধরার মতো সময় বা সামর্থ্য কোনোটাই তার ছিল না। এক বছরের মাথায় সব বিক্রি করে আবার শুরু করলেন লাকড়ির ব্যবসা। অতঃপর শ্বশুর মহাশয়ের মন নরম হলে তিনি তার ইটখোলায় চাকরি দিলেন। বেতন ৬০০ টাকা। কিন্তু সেখানেও বেশিদিন কাজ করা হলো না। মাথায় ছিল ব্যবসার ভাবনা। অনেক টাকার মালিক হওয়ার স্বপ্ন। চাকরি ছেড়ে কিস্তিতে প্রগতি থেকে একটা ট্রাক কিনলেন। ৪০ হাজার নগদ, বাকিটা সুদে পরিশোধ করতে হবে। দিনে ড্রাইভার আর রাতে নিজে চালিয়ে দ্বিগুণ আয় করতে লাগলেন। ছয় মাসে বেশ কিছু পুঁজি তৈরি হলো। শ্বশুর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। দুই লাখ টাকা ঋণ দিলেন। পরের বছর সোনালী ব্যাংক থেকে আরো তিন লাখ টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল পাঁচটা ইটভাটা। তারপরের স্বপ্ন নিটিং অ্যান্ড ডায়িং গার্মেন্ট করার। ভারত থেকে ১৮টি নিটিং মেশিন কিনে নিয়ে কাজ শুরু হলো। একপর্যায়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সবকিছু দেখে গিয়ে ঋণ বরাদ্দ করলেন এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা। এভাবেই স্বপ্নের জাল ছড়িয়ে দিলেন তিনি। এখন এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর কাপড় রফতানি হয়। প্রায় পাঁচ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। সবশেষে হাত দিয়েছেন কসমেটিক ব্যবসায়। কেয়া নারকেল তেল, পাউডার আর সাবান দিয়ে। এখন কেয়া কসমেটিকস দেশের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। এই গল্পের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়Ñ মানুষ তার আশার সমান সুন্দর ও বিশ্বাসের সমান বড় হতে পারে।

লক্ষ্যহীন মানুষ জীবন নদীতে সে মাঝিহীন নৌকার মতো। নদীতে নৌকা যেমন এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করে কিন্তু তীরে ভিড়তে পারে না তেমনি মানুষও হোঁচট খেতে খেতে এগোয় বটে, তবে যেহেতু তার কোনো গন্তব্য জানা নেই, তাই কোথাও পৌঁছাতে পারে না। জীবনের জন্য যেমন বায়ুর প্রয়োজন, তেমনি জীবনে বড় হওয়ার জন্য প্রয়োজন স্বপ্নের। স্বপ্ন ছাড়া কেউই হঠাৎ সফল হয় না। বাস্তব স্বপ্ন ও চেষ্টা কখনোই ব্যর্থ হয় না। যদি স্বপ্নকে বিশ্বাসে রূপান্তরিত করতে পারা যায়, তাহলে তা অর্জনও করা যায়। এই জীবনের চলার পথে মানুষ মাত্রই স্বপ্ন দেখে। লক্ষ্য করুন আমরা সবাই সাফল্য চাই। সবাই জীবনে সেরা জিনিসটি চাই। কেউই সাদামাটা জীবন চাই না। একবার ভাবুন তোÑ বিশাল এই পৃথিবীতে দূর মহাকাশের নক্ষত্র থেকে আলো এসে পড়ে। আমরা সবাই এই পৃথিবীর প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছি মাত্র কিছু সময়ের জন্য, যে সময়টা খুব বেশিও নয় আবার খুব কমও নয়। এ সময়কে নিজের ইচ্ছামতো সাজিয়ে নিতে দরকার সুপরিকল্পিত স্বপ্নের, যা আপনাকে সফল হতে সাহায্য করবে। আসল কথা হচ্ছে, মানুষ প্রতিকূলতা এড়িয়ে একাকি চলতে শুরু করে সে-ই পথ পেয়ে যায়, সে-ই এগিয়ে যায়। আসলে স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। স্বপ্নই মানুষকে জীবনযুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা দেয়। স্বপ্ন না থাকলে আজ পৃথিবীতে কোনো আবিষ্কার হতো না।

ঘুমের মধ্যে সবাই স্বপ্ন দেখে কিন্তু আমি খালি চোখে স্বপ্ন দেখার কথা বলছি, এ স্বপ্ন ঘুমের স্বপ্ন নয়Ñ তা হলো আপনি কী পেতে চান, কোথায় যেতে চান, প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির স্বপ্ন। বলা হয়, স্বপ্ন সাধারণত দুই ধরনের হয়। যার একটি হলো স্বাভাবিক স্বপ্ন, যা আমরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখি। আরেক ধরনের স্বপ্ন আছে, যা স্বপ্ন বা মনছবি অথবা আমরা বলতে পারি ‘জীবন ছবি’। আর এটা হলো বড় হওয়ার স্বপ্ন, জীবনে একটা কিছু করার স্বপ্ন। এই স্বপ্নই আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। স্বপ্নের আরেক মানে হলো লক্ষ্য বা মানুষের জীবনের অভীষ্ট উদ্দেশ্য। লক্ষ্য শুধুই অলীক স্বপ্ন নয়। লক্ষ্য স্থির না হওয়া পর্যন্ত কিছুই করা সম্ভব নয়, প্রথম প্রদক্ষেপটি পর্যন্ত নেওয়া অসম্ভব। হাওয়া যেমন বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন, তেমনি আপনি বা আমি কোথায় পৌঁছাতে চাই, সে সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা চাই। শুরু করার আগে কোথায় যাব, তা স্থির দরকার। আপনার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গড়ার চিন্তার আগে ভালোভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন যে এটাই আপনার স্বপ্নের কাজÑ স্বপ্নের জগৎ। আপনার স্বপ্নের কাজে সবকিছু আনন্দের সঙ্গে করতে ইচ্ছে হবে আর এর ব্যত্যয় হলে আপনি আনন্দ খুঁজে পাবেন না।

লেখক : বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

 

"