প্রত্যাশা

মনসুর মেলা হোক ধানীখোলায়

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদ ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা গ্রামে ১৯৯৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আবদুর রহিম ফরাজী ও মায়ের নাম মীর জাহান খাতুন। তিনি শৈশবে ধানীখোলাতেই লেখাপড়া শুরু করেন। তিনি কিছুদিন দরিরামপুর হাইস্কুল ও ময়মনসিংহের মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে পড়াশোনা করেন। তিনি ১৯১৭ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় এবং ১৯১৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেন। তিনি কলকাতা রিপন কলেজ থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। আবুল মনসুর আহমেদ একধারে ছিলেন একজন সফল রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। আবুল মনসুর আহমেদ নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর কংগ্রেস আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর তিনি মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান কর্তৃক সামরিক আইন জারি হওয়ার পর তিনি কারারুদ্ধ হন এবং ১৯৬২ সালে মুক্তি পান।

১৯৪৬ সালে অবিভক্ত কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। এ ছাড়া তিনি নবযুগ ও কৃষক পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাষানী ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট্রের ইশতেহারের ২১ দফার প্রণেতা ছিলেন আবুল মনসুর আহমেদ। এই ২১ দফার মধ্যেই ছিল বাঙালির রাষ্ট্রভাষা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের দাবি। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের যুক্তফ্রন্ট সরকারে তিনি ছিলেন প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী এবং ১৯৫৭ সালে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আওয়ামী লীগ সরকারে ছিলেন কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী।

আবুল মনসুর আহমেদ একজন শক্তিমান লেখক ছিলেন। তিনি ব্যঙ্গাত্মক রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। আয়না ও ফুড কনফারেন্স গল্পগ্রন্থদ্বয়ে তিনি তৎকালীন মুসলিম সমাজের গোঁড়ামি, ধর্মান্ধতা, ভন্ডামিসহ নানা কুসংস্কারের ব্যঙ্গ করেছেন তীক্ষè দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে। তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থের মধ্যে আত্মকথা, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, শেরে বাংলা থেকে বঙ্গবন্ধু, বেশি দামে কেনা ও কম দামে বেচা স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের কালচার উল্লেখযোগ্য। তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সত্য মিথ্যা, জীবন ক্ষুধা আবে হায়াত, হুজুর কেবলা ইত্যাদি। সাহিত্যচর্চায় অসাধারণ অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার হিসেবে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয় তাকে। এ ছাড়া তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও নাসিরুদ্দিন স্বর্ণপদকে ভূষিত হন।

আবুল মনসুর আহমেদ অত্যন্ত সহজ-সরল ও সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি ছিল তার অপরিসীম দরদ ও সুগভীর ভালোবাসা। কাজের অবসরে গ্রামের বাড়িতে এলে তিনি কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুর ও মুচি সবার সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলতেন। কুশল বিনিময় করতেন। ১৯৭৯ সালের ১৮ মার্চ বহুবিধ গুণের অধিকারী এ মহৎ মানুষটি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের জন্মদিনে যদি ফরিদপুরে পল্লী মেলা, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মদিনে যদি সাগরদাড়িতে মধু মেলা, চিত্রশিল্পী সুলতানের জন্মদিনে যদি নড়াইলে সুলতান মেলা অনুষ্ঠিত হতে পারে; তবে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ মরহুম আবুল মনসুর আহমেদের জন্মদিনে ময়মনসিংহের ত্রিশালের সুতিয়া নদীর তীরে ধানীখোলাতে অবশ্যই মনসুর মেলা উদযাপিত হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে ময়মনসিংহ জেলার কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ এবং ত্রিশাল ও ধানীখোলাবাসীদেরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের জানা দরকার; পুথিঘরের স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমি চত্বরে এক খন্ড চটের ওপর কয়েকটি বই সাজিয়েই শুরু করেছিলে একুশর বইমেলা। আমাদেরও তাই করতে হবে। প্রতিটি মহৎ কাজই ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু হয়ে বৃক্ষের মতো বিশাল রূপ ধারণ করে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তুলে মহাদেশ অতল সাগরÑ এ সত্যকে সামনে রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। ধানীখোলার মনসুর মেলা এক দিন দেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে। হাজার মানুষের সমাগম হবে নড়াইলের চিত্রা নদীর মতো ত্রিশালের সুতিয়া নদীর তীরে।

লেখক : কৃষিবিদ ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"