প্রত্যাশা

নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ নগর

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

২০৫০ সালের পর বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নগরে বসবাস করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রাম থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ নগরে ভিড় করবে। নগর অভিবাসীদের এই স্রোত সহজে থমানো যাবে না। নারীর সঙ্গে নিরাপদ নগরের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ লোক নগরে বসবাস করে। এই নগরীয় জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি হলো নারী। আমাদের রফতানির আয়ের অন্যতম খাত তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ৩২ লাখ নারীশ্রমিক। এ ছাড়া ব্যাংক, বিপণি কেন্দ্র, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত এবং বাসাবাড়ির গৃহপরিচারিকার কাজে নিয়োজিত আছেন অসংখ্য নারী। বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণকে এখন আর অবজ্ঞা করার কোনো অবকাশ নেই। নারীকে কর্মহীন রেখে চার দেয়ালের ভেতর বন্দি রেখে যে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গড়া সম্ভব নয়Ñ এটা সর্বজন স্বীকৃত। যে নগর নারীর জন্য যত নিরাপদ, সে নগর তত বেশি টেকসই; তত বেশি সমৃদ্ধ ও পরিবেশবান্ধব। নগরবাসীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০২৯ সাল নাগাদ দেশের নগরগুলোর জনসংখ্যা আট কোটি ছাড়িয়ে যাবে। সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে নগরগুলোতে নারীদের সংখ্যা। নারীর খাদ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন, বিবাহ বিচ্ছেদ, যাতায়াত, চিত্তবিনোদন ও নিরাপত্তার অভাবসহ সৃষ্টি হবে নানা রকম সমস্যা। তাই ক্রমবর্ধমান নগরীয় নারীদের সমস্যার সমাধান, সেবা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এখন থেকেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এসব সমস্যার কারণে নগরগুলো নারীদের জন্য বসবাসের ও কর্মসম্পাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। স্থবির হয়ে পড়বে দেশের বিকাশমান অর্থনীতির। কারণ একটি শহর কতখানি নিরাপদ, তা বোঝা যায় সেই শহর কতটা নারী-শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীবান্ধব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উঁচু উঁচু ভবন তৈরি করলেই নগরায়ণ হয় না। উন্নত ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি। বাসস্থান, কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চলাফেরাÑ এ চার ক্ষেত্রে নারী ও শিশুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আবার নারীরা সমস্যায় পড়লে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিকার পায় না। সুতরাং নগরে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মা ও শিশু নিরাপদ এবং সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে। নারী ও শিশুরা যদি সম্মানের সঙ্গে নগরে বসবাস করতে না পারে, তাহলে সমাজ স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে না। নগরায়ণ হবে অর্থহীন। আবার পাড়া-মহল্লায় অনেক বিউটি পার্লার গড়ে উঠলেও শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত ডে কেয়ার সেন্টার এখনো গড়ে উঠছে না। নগরে নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদন, খেলার মাঠের ব্যবস্থার দাবি দীর্ঘদিনের। উদ্যোগক্তাদের জন্য ১০০ কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ রয়েছে, যারা নগরে ডে কেয়ার সেন্টার খুলবে, সরকার তাদের সহযোগিতা করবে। তার পরও ঢাকা শহরে হাতে গোনা কয়েকটি ডে কেয়ার সেন্টার ছাড়া সারা দেশে এসবের অস্তিত্ব চোখে পড়ে না। এ ছাড়া অহরহ ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা ঘটছে নগরে। নগরীতে যেকোনো উন্নয়ন করা হলে তার কেন্দ্রে যেন মানুষ থাকে, মানুষ যেন উপকারভোগী হয়, সেটা দেখতে হবে। সুশাসন ও সেবার ঘাটতির সঙ্গে সমাজব্যবস্থায় ধনীরা এত বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, মধ্যবিত্তদের কথা পাত্তাই পাচ্ছে না। নারী ও শিশুরা সমস্যায় পড়লে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ থাকা জরুরি। কিন্তু নারী ও শিশুরা সমস্যায় পড়লে প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগই বেশি। নিরাপদ নগর গড়তে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একা দায়িত্ব নয়, নাগরিকদেরও আচরণের ক্ষেত্রে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে। নগরে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। পরিকল্পনায় ঘাটতিও আছে। ভালো সেবা দিতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য ও সেবার ঘাটতি রয়েছে। অনেক পোশাক কারখানায় ডে কেয়ার সেন্টার রয়েছে। তবে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ডে কেয়ার সেন্টারের সংখ্যা অপর্যাপ্ত। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলোতে ডে কেয়ার সেন্টারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সিটি করপোরেশনগুলোর এ ক্ষেত্রে কাজ করার প্রচুর সুযোগ রয়েছে। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তারা কারো সম্পত্তি নয়। অনেকে মনে করতে পারে তারা বাবা-মার সম্পত্তি। এটাও ঠিক নয়। তারা মূলত রাষ্ট্রের অংশ। রাষ্ট্রের সম্পদ। একসময় তারা বড় হবে। রাষ্ট্রের কর্ণধার হবে। উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। তারা যেহেতু রাষ্ট্রের অংশ, তাই রাষ্ট্রের উচিত তাদের নিয়ে ভাবা। রাষ্ট্রকে শিশুর অধিকার, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কেউ কেউ বলেন, নগরীতে শিশুরা কীভাবে বেড়ে উঠছে, সেদিকে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে সবাই যাতে সমান সুযোগ পায়, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। শিশুদের জন্য খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের জন্য প্রতিটি নগরে পর্যাপ্তসংখ্যক খেলার মাঠ ও পার্কের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো অজুহাতেই এগুলো অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ইশরাত ইসলাম এ ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেছেন, ফ্ল্যাট কেনার জন্য কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলেও নগরগুলোতে উন্মুক্ত স্থান গড়ার লক্ষ্যে সে রকম সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না কেন? ঢাকার অনেক মাঠের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে। অথচ এলাকাভিত্তিক ছোট জায়গাগুলোতে অল্প বিনিয়োগ ও সামান্য সংস্কারের মাধ্যমে সেগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করা হচ্ছে না। নগর পরিকল্পনায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত নারী ও শিশুদের কথা ভাবা হয় কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেন বিশেষজ্ঞরা। কেউ কেউ বলেন, নগরগুলোতে যে শ্রেণিবৈষম্য ও বিভক্তি আছে, তা বহুতল ভবনের ছাদে উঠলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। উঁচু ভবনগুলোর পাশেই হাজার হাজার বস্তিঘর চোখে পড়ে। ঢাকা শহরের প্রায় ৪০ শতাংশ লোক বস্তি বা বস্তির মতো এলাকায় বাস করেন। এসব বস্তিবাসীর সংখ্যাগত সঠিক পরিসংখ্যানেরও অভাব রয়েছে। বর্তমান বাজেটের ১৫ শতাংশই ব্যয় হবে সামজিক নিরাপত্তা খাতে। কিন্তু এ ব্যয় সুষমভাবে বণ্টন হয় না। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ৮৫ শতাংশ ব্যয় হয় গ্রামে। আর বাকি ১৫ শতাংশ ব্যয় হয় শহরের জন্য। এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ বণ্টন ব্যবস্থা নয়। এ থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। ঢাকার গণপরিবহনও নারীবান্ধব নয়। চলন্ত বাসে নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) নারী ও শিশুর উন্মুক্ত স্থানে হাঁটাচলা, খেলাধুলা, সময় কাটানোর নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য নির্ধারিত আছে; কিন্তু উন্মুক্ত স্থানগুলোতে ব্যক্তিস্বার্থেই ইমারত নির্মাণ করা হচ্ছে। নারী ও শিশুর জন্য নগর সেবা নিশ্চিত করতে সবার আগে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৪৫ শতাংশ শিশু। তাই টেকসই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শিশুদের কথাও ভাবতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে তাদের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা, সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও চিত্তবিনোদন এবং খেলাধুলার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। নানা অজুহাতে উন্মুক্ত স্থান পার্ক-মাঠ দখল করে শিশুদের খেলাধুলার অধিকার বঞ্চিত করা কোনো মতেই উচিত নয়। ঢাকায় ১৪৪টি প্রাতিষ্ঠানিক মাঠ আছে; এগুলোতে নারী এবং শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলার ব্যবস্থা করতে হবে। নারী অধিকার ও সমতাকে খাটো করে দেখা হয়। উন্মুক্ত স্থানগুলোতে পার্ক বানানো হলেও নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি সেখানে কিশোরী ও নারীদের সেখানে যাওয়ার জন্য উৎসাহ জোগাতে হবে।

নারীদের অধিকার ও তাদের সুরক্ষায় সরকার ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নে গ্রহণ করেছে নানা পরিকল্পনা। ইভটিজিং ও বখাটেদের উত্ত্যক্তের হাত থেকে নারীদের রক্ষার জন্য সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে করা হচ্ছে জেল-জরিমানা। তার পরও নারীদের প্রায় ৬৭ শতাংশ পরিবার, পরিবহন, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে নিপীড়ন, নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এ অবস্থার অবসানে নারীর পাশাপাশি পুরুষদেরও যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। গ্রহণ করতে হবে সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য নিশ্চিত করতে হলে নারীর কর্মপরিবেশ এবং চলার পথকেও করতে হবে নিরাপদ। নিশ্চিত করতে হবে নারীর পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নসহ সব ন্যায্য অধিকার।

লেখক : কৃষিবিদ ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"