বিশ্লেষণ

অস্তিত্ব সংকটে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

আবু তাহের

প্রাণের শহর ঢাকা। আমাদের রাজধানী। ঢাকা এখন মেগাসিটি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৪৭ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার, ১৯৫১ সালে ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৯২৮ এবং ১৯৬১ সালে ৫ লাখ ৫০ হাজার ১৪৩। ১৯৭৪ সালে আদমশুমারি অনুযায়ী ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৭ হাজার এবং ১০ বছর পর ১৯৮১ সালে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ লাখ ৪০ হাজার। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৬৮ লাখ ৪৪ হাজার এবং ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ১ কোটি ৭ লাখ। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম তার ‘উন্নয়নে নগরায়ণ’ বইতে লিখেছেন ১৯৭৪ সালে যখন স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়, তখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১৬ লাখের মতো। ৮১ সালে এসে ঢাকার জনসংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩৫ লাখে, ৯১ সালে ৭০ লাখে। তখন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ঢাকা মহানগরকে মেগাসিটি নামে আখ্যায়িত করে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনেও ঢাকাকে ৮৬ সালেই মেগাসিটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

এবার মেগাসিটি কী জেনে নেওয়া যাক। মেগাসিটি অর্থ কড শহর। মেগাসিটি বলতে সেসব মেট্রোপলিটন এলাকাকে বোঝানো হয়, যেখানকার জনসংখ্যা ১ কোটি বা ১০ মিলিয়নের অধিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনসংখ্যার ঘনত্ব (প্রতি বর্গকিলোমিটারে ন্যূনতম ২০০০ জন) বিবেচনা করা হয়ে থাকে। জাতিসংঘের হিসাব বাদ দিয়ে যদি আমরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব ধরি তবে ৯১ সালে আমরা মেগাসিটি হয়েছি।

মেগাসিটির দিক দিয়ে ঢাকা চীনের সাংহাই বা বেইজিং এর কাছাকাছি। এর চেয়েও কাছে কলকাতা কিংবা পাকিস্তানের করাচির। চীনের উদাহরণ এ কারণে টানা হলো, ঢাকার সঙ্গে চীনের পার্থক্যগুলো হয়তো খুব সহজেই ধরা পড়বে। সেদিকে দিয়ে বিবেচনা করলে কলকাতা বা করাচির সঙ্গে পার্থক্য করা মুশকিল। মুম্বাইও ঢাকার কাছাকাছি। এই শহরগুলোর সঙ্গে ঢাকার সুযোগ-সুবিধা থেকে সব কিছু বিবেচনা করলে বিস্তর ফারাক চোখে পড়বে। বেইজিংয়ের বর্তমান জনসংখ্যা ২ কোটি ১৭ লাখ। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টের রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ। জনসংখ্যার দিক দিয়ে এগিয়ে থেকেও বেইজিং ঢাকা থেকে অনেক উন্নত।

রাজধানীর ঢাকার পরিধি দিন দিন বিস্তৃত হয়েছে। বেড়েছে কাজের পরিধি। তৈরি হয়েছে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র। ব্যবসা, বাণিজ্যে প্রসার হয়েছে অনেকদূর পর্যন্ত। কোথাও এক ইঞ্চি জায়গা ছাড় পাওয়া এখন মুশকিল। ফুটপাত থেকে শুরু করে রাজধানীর অলিগলি বেয়ে নদীপথ কোথাও যেন ফাঁকা নেই। রাজধানী কোলঘেঁষে বয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা। ঐতিহ্যবাহী এক নদী। মূলত ঢাকার গোড়াপত্তনেই এই নদী। ঢাকার একসময় নাম ছিল জাহাঙ্গীরনগর। বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থ থেকে জানা যায়, খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক থেকে ঢাকায় লোক বসবাস শুরু করে। নবম শতকে সেনশাসন শুরু হওয়ার আগে ঢাকা বৌদ্ধ রাজ্য কামরূপের অধীনে ছিল। সেন-পরবর্তী যুগে ঢাকা তুর্কি ও আফগান শাসনাধীন হয়। এ সময় ঢাকা দিল্লি সালতানাত নির্ধারিত শাসকদের দ্বারা শাসিত হয়। ১৬০৮ সালে ঢাকায় প্রথম মুঘলদের পা পড়ে। ১৬১০ সালে ঢাকার নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীরনগর। আজও বুড়িগঙ্গার কোলঘেঁষে এগিয়ে গেলে দেখতে পাওয়া যায় পুরোনো দিনের হাজারও ঐতিহ্য।

বুড়িগঙ্গাকে ঢাকার প্রাণ বললেও হয়তো ভুল হবে না। সেই শত বছর আগে থেকেই ব্যবসা বাণিজ্য, যাতায়াত থেকে শুরু করে নির্মল বাতাস সব কিছুর জোগান দিত এই নদী। কালের আবর্তে সেই চাহিদা হাজার গুণ বৃদ্ধি পেলেও আজ সেই নদীর রুগ্ণদশা। আমাদের নষ্ট মানসিকতা, মেগাসিটি ঢাকার বর্জ্য, অশুভ শক্তির কালো হাতের ছোঁয়া বুড়িগঙ্গাকে কতটুকু সুস্থ রেখেছে?

রাজধানী ঢাকার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত বুড়িগঙ্গার ঐতিহ্য ফেরাতে নদীর দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার সিদ্ধান্ত অনেকবার নিয়েছে সরকার। ঢাকা জেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলে অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম বিভিন্ন সময়ে করা হয়েছে। যার মাধ্যমে বুড়িগঙ্গার আদি বৈচিত্র্য ফিরে আসবে বলে অনেকেই মনে করছেন। কিন্তু বাস্তবে কতটুকু ফলপ্রসূ হয়েছে এই কার্যক্রমÑ এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেলের নদীর গর্ভে বিস্তৃত এলাকা অবৈধ দখল করে দোকানপাট ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে আছে দখলদাররা। এ ছাড়া এসব দোকান ও স্থাপনা থেকে বর্জ্য ফেলে ভরাট করে নদীদূষণ করা হচ্ছে। হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্পের বর্জ্যরে কারণেও নদীটি দূষিত হয়েছিল ব্যাপক হারে। বুড়িগঙ্গার এ দৈন্যদশা অনেক দিন ধরে। অনেকবারই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সালের ২৫ আগস্ট ওয়াটার সেক্টর ও ড্রেজিংবিষয়ক কমিটির প্রথম সভায় ঢাকা মহানগরীর চারপাশের নদীপথ ড্রেজিং করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়। প্রকল্পটি ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল একনেক বৈঠকে অনুমোদিত হয়। ওই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল নিউ ধলেশ্বরী-পুংলী-বংশাই-তুরাগ নদ খননের মাধ্যমে যমুনা নদী থেকে পানি এনে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকা মহানগরীর চারপাশের নদীগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে হবে। সেই সঙ্গে পানির গুণগত মান ও নাব্য বৃদ্ধি করা, বুড়িগঙ্গাসহ নদীগুলোতে সারা বছরব্যাপী নৌযান চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় গভীরতা নিশ্চিত করা, সেচ ও মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে অবদান রাখা এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন সাধন করাও ছিল প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু সময় গড়ালেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে অবৈধ দখলদারদের থেকে উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়। নদী উদ্ধারে একাধিক অভিযানও শুরু করা হয়। প্রথমদিকে বেশ কিছু সাফল্যও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু কিছু দূর যেতে না যেতেই তা আবার বন্ধ হয়ে যায়। নদী দখল করে নির্মিত বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার কিছুদিন পরই সেগুলো আবার বেদখল হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল হাজারীবাগ এলাকায় অবস্থিত ট্যানারি। এসব কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য দ্বারা ক্রমাগত দূষিত হচ্ছিল পরিবেশ। এসব তরল ও কঠিন বর্জ্যে নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদী ও আশপাশ এলাকার মানুষ। ঢাকা ঘিরে থাকা শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু ও বুড়িগঙ্গার ১১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দুর্বিষহ দূষণ। যেন পানির চেয়ে বর্জ্যই বেশি। মাত্রাতিরিক্ত দূষণে হাজারীবাগের পানির রং হয়ে উঠছিল কালো, ধূসর, গাঢ় নীল। নদীর স্থানে স্থানে বর্জ্য দূষণের বুদ্বুদ উঠতেও দেখা যায়। যার ফলে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি কারখানা সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করা হয়।

কিন্তু কতটুকু সুফল বয়ে এনেছে এই উদ্যোগ? ট্যানারির বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পাশের ধলেশ্বরী। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু না হওয়ায় বর্জ্য গিয়ে পড়ছে ধলেশ্বরীতে। এ ছাড়া চামড়াজাত কঠিন বর্জ্যরে মাধ্যমেও দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। ট্যানারি সাভারে স্থানান্তরের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়ার ১৫ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত পুরোপুরি সিইটিপির কাজই শেষ হয়নি। পুরো ট্যানারির ৫টি মুখ দিয়ে সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে ট্যানারির বর্জ্যরে দূষিত পানি। খোলা স্থানে অস্থায়ী বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশন করার কারণে বর্জ্যরে পানিও সরাসরি গিয়ে পড়ছে ধলেশ্বরীতে। পুরোপুরি সব ট্যানারি চালু না হওয়ায় সিইটিপি ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার কথা বলা হলেও দিনে সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা চালু রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া সিইটিপির ৮টি ইউনিটের মধ্যে মাত্র ৪টি সচল রয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থায়ও রয়েছে যথেষ্ট অবহেলা।

এভাবেই দূষিত হচ্ছে আমাদের আশপাশের নদীগুলো। অনেক নদী হারিয়ে গেছে কালের আবর্তে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতেই একসময় ৪৩টি খাল ছিল। এর মধ্যে ১৭টির অস্তিত্ব এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। গত দুই দশকে নানা পরিকল্পনা ও প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল বুড়িগঙ্গা রক্ষা করতে। এতে ব্যয় হয়ে গেছে দেড় হাজার কোটি টাকা। তার পরও প্রাণ ফেরেনি বুড়িগঙ্গার। দূষণের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে, বুড়িগঙ্গা এখন বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত চারটি নদীর একটি। রাজধানীর প্রান্তঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদীটির পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন পৌঁছেছে শূন্যের কোঠায়।

এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকা মহানগরীতে সৃষ্ট দৈনিক পয়ঃবর্জ্যরে পরিমাণ ১৩ লাখ ঘনমিটার। এর মধ্যে পাগলা পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনাগারে মাত্র ৫০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন করা হচ্ছে। বাকি সাড়ে ১২ লাখ ঘনমিটার অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো থেকে দৈনিক ২১ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় পড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রোমিয়াম, সিসা, সালফিউরিক অ্যাসিড, পশুর বর্জ্য প্রভৃতি। আর বুড়িগঙ্গার পাড়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন টেক্সটাইল কারখানার বর্জ্যসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানার ৯০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য প্রতিদিন নদীটিতে পড়ছে। ১৭৮টি নালামুখ দিয়ে এসব বর্জ্য বুড়িগঙ্গার পানিতে মিশছে।

সরকারি উদ্যোগের অভাব নেই। রয়েছে সদিচ্ছার অভাব। জানা নেই বুড়িগঙ্গা স্বরূপে ফেরার আগে আমরা ধলেশ্বরীকে হারাই কি না! আমরাও পথ চেয়ে আছি। টলটলে পানির বুকে নৌকার গুলুই-এ বসে বুকভরে নির্মল বাতাস নেওয়া আর ওপরে খোলা নীল আকাশ দেখে এক পড়ন্ত বিকাল কাটানো প্রবল বাসনায় পথ চেয়ে আছি। মনে আশা রাখি, কোনো বাধা, কোনো অপশক্তি যেন নদীগুলোর টুঁটি চেপে না ধরে।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক

[email protected]

 

"