প্রত্যাশা

নিশ্চিত হোক দ্রুত বিচার

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন হলে তা যেমন বেমানান; তেমনি ধীরগতির জন্য দ্রুত বিচারের মামলাও তার মাহাত্ম্য হারাচ্ছে। ১২০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও সিংহভাগ মামলা সে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের ৯টি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচার আইনে করা ৩ হাজার ৫১টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ঢাকার চারটি ট্রাইব্যুনালে ঝুলে আছে ২ হাজার ১৩৯টি মামলা। চট্টগ্রামে ৪৬, রাজশাহীতে ১৮১, খুলনায় ৩১৮, বরিশালে ৩৩৮ এবং সিলেটে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ২৯টি মামলা। এর মধ্যে পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে বিচারাধীন ২৮৭টি। আর উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে ৫৬টি মামলা। আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ২০০২ সালে প্রণয়ন করা হয় ‘আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন’। আর এ আইনের অধীনে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একই বছর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনও প্রণয়ন করা হয়। দ্রুত বিচার আইন প্রণয়নের সময় দুই বছরের জন্য আইনটি করা হলেও বিভিন্ন সময়ে এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

সম্প্রতি এ আইনের মেয়াদ আরো পাঁচ বছর বাড়িয়েছে সরকার। সংশোধিত আইনে মামলা নিষ্পত্তিতে বেঁধে দেওয়া হয়েছে ১২০ দিন। এ সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা না গেলে কারণ উল্লেখ করে বিচারক আরো ৬০ দিন সময় বৃদ্ধি করতে পারবেন বলেও সংশোধিত আইনে উল্লেখ রয়েছে। বিলম্বিত বিচার যে বিচারহীনতার নামান্তর, এ বিষয়টি উপলব্ধি করে গুরুতর অপরাধের দ্রুত বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রয়োজনের তুলনায় ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা কম হওয়া, সাক্ষী না আসা এবং আরো কিছু কারণে দ্রুত বিচারের প্রত্যাশা লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত বিচারের মামলায় বছরের পর বছর ধরে আদালতে যাওয়া-আসা করতে করতে হতাশ হয়ে পড়ছেন। দেশে আইনের শাসন ও বিচারপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন মামলা নিষ্পত্তিতে দ্রুতগতি। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অধিকার পূরণে শুধু দ্রুত বিচারের মামলা নয়, অন্য সব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এ উদ্দেশ্যে বিচারকদের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবেÑ এমনটিই প্রত্যাশিত।

সামাজিক অবক্ষয়ের চরম বিপর্যয়কর একটা অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি, ধর্ষণ এক জঘন্য অপরাধ। ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীদের সারাটি জীবন অন্তহীন মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আবার ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়েও নতুন করে নির্যাতিত হতে হয়। সব কিছু দেখেশুনে শুধু হতাশই হতে হয়। একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেই চলেছে দেশে। শিশু-কিশোর-শিক্ষার্থীরাও ধর্ষণের শিকার! ঘরের বাইরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও যেন এখন নিরাপদ নয়। ঘরও এখন যেন নিরাপদ নয় শিশুদের জন্য। রাজধানীর ওয়ারীর বনগ্রামের শিশু সায়মা প্রতিদিনের মতো খেলতে গিয়েছিল। সন্ধ্যায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। পরে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, শিশুটিকে গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল। শিশু সায়মাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় প্রতিবেশী এক যুবককে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অক্সফোর্ড হাই স্কুলের ছাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণা ও ধর্ষণের অভিযোগে আশরাফুল আরিফ নামের এক শিক্ষককে আটক করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করা হয়েছে। ধর্ষণ এক জঘন্য অপরাধ। ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীদের সারাটি জীবন অন্তহীন মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আবার ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়েও নতুন করে নির্যাতিত হতে হয়। যেমন ঘটেছিল নুসরাত জাহান রাফির ক্ষেত্রে। তেমন ঘটনারই পুনরাবৃত্তি যেন ঘটল কুষ্টিয়ার খোকসায়। সেখানে এক কিশোরীকে ধর্ষণের চার দিন পর গ্রাম্য সালিসে কয়েক শ লোকের সামনে মেয়েটির কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা শোনা হয়েছে। এ সময় তাকে নানা প্রশ্ন করে বিব্রত করা হয়।

একটি মহল সালিসের ভিডিও করে এলাকায় মোবাইল ফোনে ছড়িয়ে দেয়। এ কোন সমাজ আমাদের? প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ মামলায় অপরাধীর সাজা হয়।

আইনে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিচার পেতে ভিকটিমকে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিচার না হওয়া কিংবা বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কি অপরাধীদের উৎসাহিত করছে? আমরা চাই, ধর্ষণের সব মামলার বিচার দ্রুততম সময়ে করা হোক। দন্ড কার্যকর করা হোক দ্রুততম সময়ে। এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সমাজ থেকে সব ধরনের অনাচার দূর করার ব্যবস্থা নেওয়া হলে আমাদের প্রত্যাশার বেশ কিছুটা পূরণ হতে পারে। কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই ন্যূনতম একবার হলেও আমাদের তথা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার কথাটি ভেবে দেখবে।

লেখক : সহসভাপতি, এফবিসিসিআই

 

"