পর্যবেক্ষণ

ছাত্রীনিবাসে অমানবিকতা ও অন্যায়

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

আজহার মাহমুদ

আমাদের সমাজ এখন উন্নত। এটা মানতেই হবে। আগেকার সময় ছেলেরাও ভালো করে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করত না। আমার বাবার সময়ও ৩০ শতাংশ মানুষ ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়াশোনা করত। আর মেয়েরা তো সেখানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়লে অনেক বেশি। কিন্তু বর্তমান সময় সেই অন্ধকার ধাঁধা থেকে বের করে এনেছে মানুষকে। এখন পড়াশোনা করে নিজের ওপর নিজে নির্ভরশীল হতে চায় সবাই। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও এখন অনেক এগিয়ে। সবস্থানেই মেয়েরা সমান পারদর্শী। তাই বাবা-মারাও এখন ছেলেদের সমান গুরুত্ব মেয়েদের দিচ্ছেন। পড়াশোনার শেষস্তর পর্যন্ত এখন মেয়েরা পৌঁছে যাচ্ছে সাফল্যের সঙ্গে।

কিন্তু এসব সাফল্যের পেছনে থাকে অনেক কষ্ট, অমানবিকতা এবং নির্যাতন। হয়তো মেয়ে বলেই এমনটা সম্ভব। যাহোক মূল কথায় আসি। উচ্চশিক্ষার জন্য একটি মেয়ে পরিবার-স্বজন রেখে অচেনা শহরে এসে স্থান খুঁজে নেয় হোস্টেলে। আমাদের শহরে এখন এমন অনেক ছাত্রী হোস্টেল রয়েছে। পরিবারের সদস্যরাও এখন মেয়েদের পড়াশোনা করার জন্য হোস্টেলে রেখে নিরাপদে বাড়ি যায়। কারণ এখানে তারা ভালো থাকবে। তাই বেশির ভাগ মেয়েই হোস্টেলে থাকে। শুধু পড়াশোনার জন্য।

যদি ছেলে হতো তাহলেও বাবা-মা এত চিন্তা করত না, কিন্তু মেয়ে বলেই এত চিন্তা। কারণ চারদিকে যেভাবে নরপশুরা ওতপেতে রয়েছে তাতে সব মা-বাবাই চিন্তা করবেন। যেখানে ২ বছরের শিশু রেহাই পাচ্ছে না; সেখানে আর কিইবা বলব। তাই বলে তো পড়াশোনা থেমে থাকবে না! জীবনযুদ্ধে পড়াশোনাটাও জরুরি। এজন্যই সব ছেড়ে অচেনা এক স্থানে এসে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয় এসব মেয়েকে। ছেলেদের বেলায়ও একই। তবে আমাদের সমাজে একটা ছেলে যা করে, একটা মেয়ে তা করতে পারে না। যেমন আমার হোস্টেলের খাবার ভালো লাগল না, আমি হোটেলে গিয়ে খেয়ে আসলাম। আমার ক্ষুধা লাগল, আমি নাশতা করে আসলাম। আমার চা খেতে ইচ্ছা করছে, আমি চা খেয়ে এলাম। কিন্তু একটা মেয়ে হলে? আমাদের এ সমাজে সেটা অনেক কিছু হয়ে যাবে। একটা মেয়ে হোটেলে বসে চা খেলে পুরো হোটেলের মানুষ তার দিকে ফেল ফেল করে তাকিয়ে থাকে। আর কিছু বিকৃত মনষ্কের লোক পরিবেশটাকে আরো নোংরা করে তোলে। অনেকে আবার এটাকে ধর্মের জালে আটকে দিয়ে নানা যুক্তিও দেবে। কিন্তু আমরা একবারও তাদের চাহিদা, ইচ্ছার কথা চিন্তা করি না। আমরা একবারও গভীরে চিন্তা করি না। বাইরে যা দেখি তাতেই মন্তব্য করি।

এবার আসি মূল বিষয়ে। যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুরো পৃথিবীটাই অনিরাপদ। তবু এসব ছাত্রী যখন হোস্টেলে থাকে; তখন মা-বাবাও একটু নিশ্চিন্তে থাকেন। কিন্তু এসব নিরাপদ হোস্টেলেও যখন চলে অন্যায় আর নির্যাতনের মতো কান্ড, তখন বাগশক্তিটাও হারিয়ে যায়। এক দিন আগের বাসি নষ্ট ছোলা দিয়ে পরদিন সকালেও যখন নাশতা করতে হয় হোস্টেলের ছাত্রীদের; তখন বলতে ইচ্ছা করেÑ হে মানবতা, তুমি কি সত্যিই হারিয়ে গেছো?। হ্যাঁ এমনও অমানবিক কাজ করা হয় এখনকার হোস্টেলগুলোতে। চট্টগ্রাম নগরীর একটি ছাত্রীনিবাসের বিরুদ্ধে সম্প্রতি এমন অভিযোগ ওঠে। অথচ এসব ছাত্রীর অভিভাবকরা প্রতি মাসের শুরুতেই ৪৮০০ টাকা করে দিয়ে যান। বিনিময়ে ২ বেলা ভাত, এক বেলা নাশতা। আসলে এখন ছাত্রীনিবাস কিংবা ছাত্রনিবাস বলতে কিছু নেই। সব কিছুই এখন মানুষের টাকা মেরে খাওয়ার ফন্দি।

অভিভাবকরা না পারতে বাধ্য হয়ে হোস্টেলে তাদের সন্তানদের রাখছেন। কিন্তু কে জানত মাসে এতগুলো টাকা দেওয়ার পরও তাদের মেয়েদের বাসি-পচা খাবার খেতে হবে। শুধু সকালের নাশতা নয়, অনেক সময় দুপুরের খাবার কিংবা রাতের খাবারেও এমন অমানবিক কাজ করে হোস্টেলটি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রী জানায়, তারা যখন এ বিষয়ে হোস্টেল সুপারকে নালিশ দেয়; তখন হোস্টেল সুপার তাদের জবাব দেয়, ভালো না লাগলে চলে যাও। যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে পচা-বাসি খাবার খেয়ে থাকলে থাকো, না থাকলে চলে যাও। অর্থাৎ এতগুলো টাকা নিয়েও তিনি ছাত্রীদের পচা-বাসি খাবার দেবেন।

এতে স্পষ্ট প্রমাণ হয় এখন মনুষ্যত্ব বলতে কিছু নেই। মানবতা তো দূরের বিষয়। আমরা এখন মানুষকে তার ন্যায্য পাওনাটাই দেই না। তবু বাধ্য হয়ে থাকতে হচ্ছে এসব ছাত্রীর। কারণ পড়াশোনা আর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত সুবিধা আছে বলে। অনেক ছাত্রী খেয়ে না খেয়ে একমাত্র স্বপ্নপূরণের জন্য থেকে যাচ্ছে এমন নির্মম পরিস্থিতিতেও। এমন কষ্ট আর নির্মমতার পরও এক দিন এসব ছাত্রী সফলতার চূড়ায় উঠবে। যদি তাদের একটু সুন্দর পরিবেশ এবং ভালো খাবার দিয়ে আরো ভালো রাখত এ সমাজ, তাহলে হয়তো তারা পুরো বিশ্ব জয় করত। হয়তো মেয়ে বলে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু যারাই এসব অন্যায় করছেন তাদের শাস্তি প্রাপ্য। এ বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি দেওয়া উচিত। সমাজের উচ্চ মহলের এবং অভিভাবকদের সজাগ হতে হবে। নতুবা এভাবেই অপরাধগুলো বড় হতে থাকবে। তাই সময় থাকতে এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"