মুক্তমত

পরিবেশবিধ্বংসী তৎপরতা বনাম আমরা

প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

একটি রাষ্ট্রের জন্য যে ধরনেরই হোক একটি সরকার অপরিহার্য, গণতন্ত্র অপরিহার্য নয়। অনেক রকম সরকার পদ্ধতির মধ্যে গণতন্ত্রও একটি পদ্ধতি মাত্র। গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা। হাজার হাজার বছর পৃথিবীতে রাষ্ট্র ছিল, গণতন্ত্র ছিল না। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বয়স সবচেয়ে কম। একটি রাষ্ট্রে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম সরকার থাকতে পারে। রাজতন্ত্র-সামন্ততন্ত্র অতীতের বিষয়। একালেও কোথাও গণতান্ত্রিক সরকার থাকতে পারে। সামরিক সরকার থাকতে পারে। অগণতান্ত্রিক অসামরিক সরকার থাকতে পারে। আধা সামরিক, আধা গণতান্ত্রিক সরকার থাকতে পারে। সাংবিধানিক সরকারই যে থাকবে সব সময়, তার নিশ্চয়তা একেবারেই নেই; অসাংবিধানিক সরকার দ্বারাও দেশ পরিচালিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোটেই সমর্থনযোগ্য না হলেও বেশ ভালোভাবেই হয়। বাংলাদেশের হতভাগ্য মানুষের নিয়তি এমনই যে, সব ধরনের সরকার দ্বারাই তারা শাসিত হয়েছে। স্বাধীনতার আগেও হয়েছে, স্বাধীনতার পরেও হয়েছে। গণতন্ত্রের স্বাদ ছাড়া আর সব রকম সরকারের স্বাদই তারা পেয়েছে। রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক সরকার না থাকাটা অস্বাভাবিক নয়, যদিও থাকাটাই কাম্য। তবে গণতন্ত্রহীনতা এক কথা আর রাজনীতিহীনতা আরেক কথা এবং বিরাজনীতি সম্পূর্ণ আরেক জিনিস। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে প্রান্তস্থ অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়নে বিশ্ব সংস্থা ও করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য ক্রমেই বেড়েছে।

১৯৯১ থেকে বেশ কয়েকটি নির্বাচিত সংসদ গঠিত হলেও এই সময়কালে গৃহীত কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রণয়নেই সংসদের কার্যকর ভূমিকা ছিল না। এ সময়কালে গ্যাট চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার দেশের সব ক্ষেত্র কার্যত উন্মুক্ত করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পুঁজির কাছে; তেল-গ্যাস চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন সরকার দেশের খনিজ সম্পদ, যা জনগণের সাধারণ সম্পত্তি তা তুলে দিয়েছে বিভিন্ন বৃহৎ কোম্পানির কাছে; স্বাস্থ্যনীতি-শিল্পনীতি-কৃষিনীতি ইত্যাদি নীতির মধ্য দিয়ে এসব খাতকে অধিক বাণিজ্যিকীকরণ করেছে, নদী ট্রানজিট করিডর বন্দর বিদ্যুৎসহ নানা বিষয়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। এসব চুক্তির কোনোটিই সংসদ প্রক্রিয়ায় হয়নি। যেহেতু কাজের কোনো আলোচনার সুযোগ নেই, তাই তথাকথিত নির্বাচিত’ সংসদ এখন কুৎসা, গালাগাল, নেতা-বন্দনা আর বাগাড়ম্বরের ব্যয়বহুল মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রের ভূমিকা কেবল অন্যত্র গৃহীত নীতি বাস্তবায়নের, তার জন্য প্রয়োজনে বল প্রয়োগকারী সংস্থার শক্তি বৃদ্ধি। কোনো কোনো অনাকাক্সিক্ষত পদ্ধতি এ তথাকথিত গণতন্ত্রের মধ্যেই শুরু হয়েছে। দিন দিন নির্যাতন ও আতঙ্ক সৃষ্টিতে নানামুখী তৎপরতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। বছর বছর এর সম্ভাবনা বাড়ার বদলে অনিশ্চয়তাই বাড়ছে কেবল।

এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেই এখন কোটি টাকার কথা শোনা যায়। দশক শতক তো সংসদ নির্বাচনে আসবেই। এ টাকার সঙ্গে আয়ের উৎস মেলাতে গেলে খুবই সমস্যা। এ অঙ্ক গোপন, নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সীমার তুলনায় শতগুণ বেশি থাকার পরও এসব বিষয়ে কমিশন ভদ্রলোকের মতো চুপ থাকে। প্রচলিত ভাষায় ‘কালো’, ভদ্র ভাষায় ‘অপ্রদর্শিত’ এবং প্রকৃত অর্থে চোরাই টাকাই নির্বাচনের প্রধান চালিকাশক্তি। আর এই টাকা বহু গুণে ফেরত নিয়ে আসা এই চোরাই কোটিপতিদের জীবনের প্রধান বাসনা। দেশের রাজনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব কতটা প্রকট হয়ে উঠেছে, এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। অস্বচ্ছ রাজনীতি, নির্বাচন ও নির্বাচনহীনতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যে নড়বড়ে অবস্থা দিন দিন আরো প্রকট হচ্ছে, যেমন : সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদসহ বিভিন্ন ধারার মাধ্যমে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এক ব্যক্তির হাতে। বর্তমান ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করা দলীয় সংসদ সদস্যদের পক্ষে সম্ভব নয়। দলগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া খুঁজে পাওয়া যাবে না। দল ও সংসদে ‘এক নেতা এক দল’ নীতি কার্যকর থাকায় কোনো স্বচ্ছতা, জবাবদিহির সুযোগ থাকে না। তাই যেভাবে দল ও দেশ চলছে, তা কেবল জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। দলগুলো দৃশ্যত এক ব্যক্তিনির্ভর, কার্যত তা দলের কর্মীদের কাছেও গোপন বা দায়হীন সুবিধাভোগীদের স্বেচ্ছাচারিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত, দুর্নীতি, লুণ্ঠন, রাষ্ট্রীয় ও গণসম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমে দ্রুত বিত্ত অর্জনের নানা সহজ পথের সুবিধাভোগীদের কখনো সুস্থির হতে দেয়নি।

একটা উন্মত্ত প্রতিযোগিতা, লুট, দুর্নীতি আর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যে কোটিপতি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে ও উঠছে, তাদের বড় অবলম্বন বাজার প্রতিযোগিতা নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা। সুতরাং রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কিংবা তা নিজের আয়ত্তে আনার জন্য গত কয়েক দশকে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো যা করেছে, তাতে গণতান্ত্রিক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া দাঁড়াতে পারেনি। এর ফাঁকেই বৃদ্ধি পেয়েছে একদিকে চোরাই কোটিপতি, সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের প্রভাব; অন্যদিকে নানা ধর্মীয়-অধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থায় অনেক রকম পরিবর্তন হয়েছে। সামরিক-বেসামরিক, প্রেসিডেন্সিয়াল-সংসদীয়, একদলীয়-বহুদলীয়; কিন্তু সব ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতির গতিমুখ নির্মাণে একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। আর তাতে বাংলাদেশ ক্রমে আরো বাজারিকৃত হয়েছে, রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব কমিয়ে সব কিছুই বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, উৎপাদনশীল খাতের তুলনায় কেনাবেচার খাত, যা সেবা খাত নামে পরিচিত তার বিকাশ ঘটেছে অনেক বেশি হারে, দুর্নীতি ও কমিশননির্ভর প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েছে, ব্যাংক ঋণখেলাপির পরিমাণ রেকর্ড ভেঙে বাড়ছে, ৮ বছরে পুঁজি পাচার হয়েছে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি। পরিবেশবিধ্বংসী তৎপরতা বেড়েছে অবিশ্বাস্য হারে। সম্পদ কেন্দ্রী ভবনের সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে বেড়েছে বৈষম্য, শহরগুলোতে দামি গাড়ি আর জৌলুসের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা। বেড়েছে সন্ত্রাস আর দখলদারিত্ব, এসব কারণে জনগণের জীবন যত দুর্বিষহ হচ্ছে, রাষ্ট্র ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তত বেশি বেশি করে ধর্মকে আঁকড়ে ধরছে।

স্বচ্ছতা রাজনীতি থেকে নির্বাসিত হয়ে গেছে। ধর্মপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানাভাবে জোটবদ্ধ হয়েছে প্রধান দুইধারার সঙ্গে। তাদের অনেক এজেন্ডা প্রধান জোট দুটির দ্বারা এখন আত্মীকৃত হয়েছে। ধর্ম আর জাতীয়তাবাদের নামেই শ্রেণি, ভাষা, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গবৈষম্য ও নিপীড়ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মধ্যে সম্পৃক্ত হয়েছে, বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ ও উপসাম্রাজ্যবাদের আঞ্চলিক কৌশলে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর কৌশলগত অবস্থান, বৃহৎ বাজার ও বিপুল খনিজ সম্পদের সম্ভাবনার কারণে। বিদ্যমান নীতি কাঠামো বজায় রাখার মতো সরকার ‘নির্বাচিত’ হলে তাদের সমস্যা নেই; কিন্তু প্রকৃত অর্থে জনপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার তারাও বিরোধী এবং দেশের নীতিনির্ধারণে দেশি ও আন্তর্জাতিক লুটেরাদের যে শৃঙ্খল তা থেকে কী করে বের করা যাবে বিশাল সম্ভাবনার এই দেশকে? জনগণ তাদের সত্যিকার প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা তাহলে পাবে কোত্থেকে? শাসকশ্রেণির বিভিন্ন অংশের রাজনীতির মধ্যে যে তার সম্ভাবনা নেই, তা বলাই বাহুল্য। আর বিদ্যমান নীতি কাঠামো বজায় রেখে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীর বিজয় তো দূরের কথা, লড়াই করার চেষ্টার চিন্তা করাই কঠিন। কোনো ব্যক্তি যদি পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে সেখানে যায়ও, তাহলে তার ভূমিকা কী হবে ‘নিধিরাম সর্দার’ সংসদে? এটা কান্ডজ্ঞানের বিষয় যে, যখন জনগণের সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি এমন পর্যায়ে দাঁড়াবে, যাতে চোরাই অর্থ, অস্ত্র বা গণবিরোধী আইন কোনো বাধা হিসেবে কার্যকর থাকতে পারবে নাÑ একমাত্র তখনই নির্বাচনও প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক হতে পারবে। জনগণের এই সংগঠিত শক্তি এমনি এমনি গড়ে উঠবে না। তার জন্য দরকার দেশের সর্বত্র মানুষের সে রকম শক্তি বা সংস্থা গড়ে তোলা।

গত চার দশকে জনগণের অপ্রতিরোধ্য শক্তির কিছু নমুনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু তার ধারাবাহিকতা না থাকা জনপন্থি আন্দোলন ও সংগঠনের দুর্বলতা নির্দেশ করেছে বারবার। আর তার সুযোগেই নড়বড়ে গণতন্ত্রের মধ্যে বাসা বেঁধেছে দেশি-বিদেশি মাফিয়াদের নানা গোষ্ঠী। স্বশাসিত বা স্বাধীনতার মুখ পৃথিবীর সেরা মুখ। জনগণের নির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা শাসিত হওয়ার আনন্দ অন্যরকম। বহু পরাধীন জনগোষ্ঠীই খেয়েপরে ভালো আছে। স্বাধীনতার সুখটা থেকে তারা শুধু বঞ্চিত। কোনো কোনো স্বৈরশাসনের মধ্যে বা একনায়কত্বে সাধারণ মানুষ পেটভরে খায়, সন্ধ্যায় প্রিয়জনদের নিয়ে নদীর তীরে অথবা পার্কে হাওয়া খায়, রাতে শান্তিতে নাক ডেকে ঘুমায়, নিরাপদে পথেঘাটে চলাফেরা করে। সে ধরনের শাসনে বিপদ ও ভয় শুধু সরকারবিরোধী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের। তাদের প্রতি সরকারের শূন্য দৃষ্টি থাকে। তাদের ফাটকে ঢোকায় অথবা ফাঁসিকাষ্ঠে লটকায়। দমন-পীড়ন তাদের ওপর দিয়েই যায়। সাধারণ মানুষ আথালে বাঁধা গরুর মতো খেয়েদেয়ে ভালোই থাকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে খুব ধীরে ধীরে একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে ও সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে উন্নতি করে। তার উজ্জ্বল উদাহরণ ভারত। গণতন্ত্র ছাড়া ধারদেনা করে রাতারাতি অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নতির চেষ্টা করলে বিপর্যয় অনিবার্য।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"