স্মরণ

নন্দিত রিজিয়া রহমান

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নন্দিত পুরোধা ব্যক্তিত্ব, প্রখ্যাত একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান আর নেই। গত ১৬ আগস্ট শুক্রবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে রাজধানীর এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তার মত্যুতে বাংলা সহিত্যে এক ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হলো।

রিজিয়া রহমান ছিলেন স্বাধীনতা-উত্তর কালের বাংলাদেশের একজন নারী ঔপন্যাসিক। তিনি ষাটের দশক থেকে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, রম্যরচনা ও শিশুসাহিত্যে বাংলাকে করেছেন সমৃদ্ধ। তার প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ ছিল ‘অগ্নি স্বাক্ষর’। এ ছাড়া তার জনপ্রিয় ও পাঠকনন্দিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ঘর ভাঙা ঘর’, ‘উত্তর পুরুষ’, ‘রক্তের অক্ষর’, ‘বং থেকে বাংলা’ প্রভৃতি। তিনি আত্মজীবনীমূলক দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলো হলো ‘অভিবাসী আমি’ ও ‘নদী নিরবধি’। বাংলা উপন্যাসে অবদানের জন্য রিজিয়া রহমান ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। চলতি বছরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে।

১৯৩৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর ভারতের কলকাতার ভবানীপুরে এক মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান। তার পৈতৃকবাড়ি ছিল কলকাতার কাশিপুর থানার নওবাদ গ্রামে। রিজিয়া রহমানের পারিবারিক ডাক নাম ছিল জোনাকী। তার বাবা আবুল খায়ের মোহম্মদ সিদ্দিক ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং মা মরিয়াম বেগম গৃহিণী। রিজিয়া রহমানদের পুরো পরিবার ছিল সংস্কৃতিমনা। তার দাদা মুন্সী আব্দুল খালেক প্রচুর পড়ালেখা করতেন। দাদার ঘরে সেলফভর্তি ছিল ইংরেজি আর ফার্সি বই। তবে বাবা আবুল খায়ের মোহম্মদ সিদ্দিক ছিলেন একজন সংগীত অনুরাগী। তিনি এসরাজ আর বাঁশি বাজাতেন। শুনতেন উচ্চাঙ্গসংগীত। বাবার চাকরির কারণে রিজিয়া রহমানের বাল্যকাল কাটে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পর তারা সপরিবারে বাংলাদেশে চলে আসেন। বাংলাদেশে রিজিয়া রহমানের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় ফরিদপুরে। সেসময় থেকেই কবিতা লিখতেন তিনি। ১৯৫০ সালে তিনি যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়েন তখন তার লেখা গল্প ‘টারজান’ সেসময়ের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘সত্যযুগ’-এ ছোটদের পাতায় ছাপা হয়। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। ১৯৫২ সালে রিজিয়া রহমানের বাবা আবুল খায়ের মোহম্মদ সিদ্দিক মারা যান। অল্প বয়সেই পিতৃহীন রিজিয়া রহমান তার পরিবারের সফঙ্গ ঢাকার শাইনপুকুরে অবস্থিত নানাবাড়িতে চলে আসেন। তার এক মামা সেসময় চাঁদপুরে চাকরি করতেন। রিজিয়া রহমান লেখাপড়ার জন্য মামার বাসায় চলে যান এবং একটি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। তার মামার পরিবার ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল। তাই তাকে সেসময়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বোরকা পরতে হয়। এক দিন স্কুলে যাওয়ার পথে বোরকায় পা আটকে তিনি রাস্তায় পড়ে যান। সেসময় রাস্তায় অনেক লোক ছিল। ফলে লজ্জায় তিনি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন। পরে অবশ্য প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্রিক পাস করেন।

খনিজ ভূতত্ত্ববিদ ও পেট্রোবাংলায় কর্মরত মো. মীজানুর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রিজিয়া রহমান। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে চলে যান এবং সেখানে কোয়েটা গভর্মেন্ট কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে দুই বছর লেখাপড়া করেন। কিন্তু মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট স¤পর্কিত জটিলতার কারণে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় তাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি না দিলে দেশে এসে ইডেন মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৫ সালে এই কলেজ থেকেই ¯œাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

রিজিয়া রহমান সাহিত্য পত্রিকা ‘ত্রিভুজ’-এর স¤পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন জাতীয় জাদুঘরের পরিচালনা বোর্ডের ট্রাস্টি ও জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের কার্যনির্বাহী পরিচালক হিসেবে। তিন বছর বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬০ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় তার লেখা গল্প এবং দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায় তার লেখা কবিতা ছাপা হয়। ১৯৬৭ সালে তিনি ‘লাল টিলার আকাশ’ শিরোনামে গল্প লেখেন। ‘লাল টিলার আকাশ’ গল্পটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের বার্ষিক ম্যাগাজিনে ছাপার জন্য দিলে তারা অশ্লীলতার অভিযোগে ছাপাতে নারাজ ছিল। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী স¤পাদনা বোর্ডকে রাজি করিয়ে তা প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। পরে ‘ললনা’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে তার ‘ঘর ভাঙা ঘর’ ছাপা হয়। যা ১৯৭৪ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয়। বস্তির মানুষের দুঃখ-দুর্দশা-ক্লেদ নিয়ে রচিত এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত তার ‘উত্তর পুরুষ’ উপন্যাসে তিনি চট্টগ্রামে হার্মাদ জলদস্যুদর অত্যাচার এবং পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের দখলদারিত্বের চিত্র তুলে ধরেছেন। এতে চিত্রিত হয়েছে আরাকান-রাজ-সন্দ-সুধর্মার অত্যাচার, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বীরত্ব, পর্তুগিজদের ব্যবসায়ীদের গোয়া, হুগলি, চট্টগ্রাম দখলের ইতিহাস। নিষিদ্ধ পল্লীর দেহপসারিণীদের মানবেতর দৈনন্দিন জীবনের ঘটনাবলি নিয়ে তিনি ১৯৭৮ সালে লিখেছেন ‘রক্তের অক্ষর’। একই বছর প্রকাশিত ‘বং থেকে বাংলা’ তার একটি অন্যতম জনপ্রিয় উপন্যাস। বাঙালি জাতীয়তাবোধ ও বাংলা ভাষার বিবর্তন এই উপন্যাসের মূল বিষয়। এই উপন্যাসের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের জাতি গঠন ও ভাষার বিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে রং থেকে বাংলা উপন্যাসের সৃষ্টি।’ ১৯৮০ সালে নীল বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে খুলনা অঞ্চলের বিপ্লবী রহিমউল্লাহর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বীরত্বগাথা নিয়ে লিখেছেন ‘অলিখিত উপাখ্যান’। রিজিয়া তার স্বামীর কর্মস্থল বেলুচিস্তানে কয়েক বছর অবস্থান করেন। ১৯৫৮ সালে বেলুচিস্তান বিদ্রোহের পটভূমিতে তিনি ১৯৮০ সালে রচনা করেন ‘শিলায় শিলায় আগুন’। স্বামীর আরেক কর্মস্থল বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে কাজ করার সময় তিনি আদিবাসী সাঁওতালদের জীবনচিত্র পর্যবেক্ষণ করেন। তাদের শিকারি থেকে কৃষক ও পরে শ্রমজীবী হয়ে ওঠা। এই বদলে যাওয়া জীবন নিয়ে তিনি ১৯৮৪ সালে রচনা করেন ‘একাল চিরকাল’। ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয় তার উপন্যাস ‘বাঘবন্দি’। এ উপন্যাসে তিনি তুলে ধরেছেন বঞ্চনা থেকে মুক্তি আবশ্যকতা। একই বছরে ‘প্রাচীন নগরীতে যাত্রা’ উপন্যাসে তিনি লিখেছেন রাজধানী ঢাকার অতীত ও বর্তমান জীবনযাপন সম্পর্কে। শৈশব থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত পুরো সময়ের বর্ণনা সংবলিত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘অভিবাসী আমি’ এবং দ্বিতীয় আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘নদী নিরবধি’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। এতে রিজিয়া রহমান তার শৈশবের পাশাপাশি লেখক জীবনের বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন। একই বছরে প্রকাশিত হয় তার গল্পগ্রন্থ ‘চার দশকের গল্প’। বইটিতে ১৭টি গল্প রয়েছে। এসব গল্পের রচনাকাল ১৯৭৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত। গল্পগুলোতে সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে।

১৬ আগস্ট ২০১৯ কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"