মুক্তমত

সিন্ডিকেট এবং আমাদের অর্থনীতি

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

শরীফুর রহমান আদিল

প্রতি বছর কোরবানি শেষে মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থাকে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রয়। গত কয়েক বছরের মতো এবারও কোরবানির চামড়া নিয়ে সাধারণ মানুষসহ অন্যদের মাথায় হাত। একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক- ঈদুল আজহার দিন সন্ধ্যায় সিলেটের একটি মাদরাসার শিক্ষক-ছাত্র মিলে প্রায় ১০২৮টি কোরবানির চামড়া বিক্রি করতে এসেছিল, কিন্তু ন্যায্যমূল্য না পেয়ে সবগুলো চামড়াই প্রতিবাদস্বরূপ রাস্তায় ঢেলে দিয়ে চলে যান। শুধু তাই নয়, তারা সিটি মেয়রকে পরিচ্ছন্ন কর্মী দিয়ে এসব আবর্জনা পরিষ্কার করারও অনুরোধ জানান। কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নিয়ে ব্যবসায়ীরা কী ধররেন ফাঁদ পেতে আছেন উপরোক্ত প্রতিবাদটি থেকে তা সহজেই অনুমেয়।

ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে দেশের সর্বত্রই চামড়ার দাম একেবারে নিম্ন, কোথায় কোথায় চামড়া অবিক্রীত অবস্থায় থেকে গেছে, কোথায়ও বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়েছে এবং কেউ কেউ মাটিতে পুঁতে ফেলছে। আর এসব তথ্য দিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে দেশের সর্বস্তরের মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। গত ৭ আগস্ট চামড়াশিল্প মালিক ও সরকার যৌথভাবে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে, যেখানে গত বছরের তুলনায় কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১২ সালে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিদেশে রফতানি করে অর্জিত হয়েছে মাত্র ৫৮ কোটি ডলার! আর এই রফতানি হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা ২০১৩ সালে প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছিল ৯০ টাকা। বলতে গেলে বলা যায়, দেশে চামড়ার সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ২০১৩ সালে এবং সে বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও রফতানি হয়েছিল ২৩ শতাংশ বেশি। এবং ২০১৭ সালের চামড়া রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১২৩ কোটি ডলার! কিন্তু ওই বছর ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করেছে অনেকটা কম মূল্যে। রফতানি ব্যুরোর আরেক পরিসংখ্যানে যদিও গত বছর রফতানির লক্ষ্যমাত্রার চাইতে ৮ শতাংশ কম রফতানি হয়ে ১০৩ কোটি ডলার অর্জন হয়েছে মর্মে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবু ২০১৮ সালে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা গেছে তাতে প্রতিটি চামড়া মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১৮০০ টাকা দিয়ে ক্রয় করলেও ট্যানারি মালিকদের ৫ গুণ মুনাফা থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

প্রতি বছরই ব্যবসায়ীরা দেশে লবণের সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা কম, পুঁজি সংকট, উৎপাদন খরচ বেশি প্রভৃতি বলে দেশের মানুষকে বোকা বানিয়ে চামড়ার দাম কমিয়ে ট্যানারি মালিকরা মুনাফা করেছেন হাজার কোটি টাকা। আর এ বছরও অযৌক্তিক কারণ কিছু কারণ দাঁড় করিয়েছেন ব্যবসায়ীরা যেমনÑ আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার মূল্যের দরপতন, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ, পুঁজি সংকট এবং গত বছরের বিক্রীত চামড়ার টাকা এখনো না পাওয়া। ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম কমার অন্যতম কারণ হিসেবে গত বছরের ৪০ শতাংশ চামড়া রয়ে যাওয়ার কথা বলেন অথচ এবারে তাদের চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সোয়া ৫ লাখ; যা গতবারের তুলনায় অনেক বেশি। প্রশ্ন হলোÑ যদি চামড়া অবিক্রীত অবস্থা রয়ে যায়; তবে চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াবে কেন? কিছু অসাধু ও অনৈতিক ব্যবসায়ী গরিব-মিসকিনদের টাকা নির্লিপ্তভাবে আত্মসাৎ করতে আন্তর্জাতিক দরপতনের ধোয়া তুলছেন। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম বিশেষ করে ভারত, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে গতবারের তুলনায় এবারেও চামড়ার দাম বেশি। ভারতের চাইতে বাংলাদেশের চামড়া অত্যন্ত উন্নত ও ভালো আর ভারতের নিম্নমানের চামড়া হওয়া সত্ত্বেও সেখানকার চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৯০ টাকা অথচ বাংলাদেশের চামড়া উন্নত হয়েও এর দাম তার অর্ধেক তথা ৪৫ টাকা! পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে যে পরিমাণ প্রক্রিয়াজাত চামড়া রফতানির চাহিদা রয়েছে, তা বাংলাদেশ সারা বছর যতগুলো চামড়া অর্জন করে তা তার অর্ধেক অর্থাৎ বিশ্বে চামড়ার চাহিদা রয়েছে দ্বিগুণ, কিন্তু তার পরও কেন এ অজুহাত! তবে ব্যবসায়ীরা যাই বলেন না কেন, এটা যে এক ধরনের প্রতারণা ও ষড়ষন্ত্র তা অনেকের কাছে স্পষ্ট। এই স্পষ্টতার মধ্য দিয়ে মানুষের জিজ্ঞাসাÑ পানির দামে চামড়া ক্রয় করার ফলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে কি? এ বছর চামড়ার দাম যেভাবে কমেছে তার ফল কি জনগণ ভোগ করবে? এবার কি জুতা, ট্রাভেল ব্যাগ, বেল্ট কিংবা মানিব্যাগর দাম কমবে? কারণ যেখানে এসব পণ্য উৎপাদনকারী উপাদানের মূল্য কম; তবে উৎপাদিত পণ্যের দামও তো কমে আসার কথা। বাস্তবতা হলো কখনোই আমরা দেখি না এসবের দাম কমতে বরং প্রতি বছরই এসব পণ্যের দাম বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। তবে কেন চামড়ার এই পানির দর? ব্যবসায়ীদের নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য কোরবানিকৃত পশুর চামড়ার দরপতনের ফলে মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি শেষ পর্যন্ত ফকির-মিসকিন, এতিম কিংবা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের টাকা আত্মসাতের জন্য লেলুপ চোখে তাকাচ্ছি? আমাদের অর্থের লোভে আমরা এতটাই নির্লিপ্ত যে, আমরা শেষমেশ ভিক্ষুকের টাকা কেড়ে নিচ্ছি! তবে ব্যবসায়ীদের এহেন প্রবণতা আমাদের উন্নত মানের চামড়া ভারতে পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভারতের বামতলা, কানপুর, চেন্নাই ও পাঞ্জাবে কয়েক হাজার ট্যানারিশিল্প রয়েছে, কিন্তু এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান চামড়ার অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। কেননা, বর্তমানে ভারতে গরু জবাই করা এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর এ নিষেধাজ্ঞা বিরাজ ছিল ২০১৬ সালেও। ভারতের গরু জবাই নিষিদ্ধ হওয়ার প্রভাব কি তা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বিস্তারিত উঠে এসেছে। ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার একটি শিরোনাম ছিলো, ‘গো হত্যা নিয়ে রাজনীতির জেরে ভারতে কাঁচা চামড়ার জোগানে টান’ আর রিপোর্টটিতে বলা হয়, প্রায় গো হত্যা নিয়ে রাজনীতির কারণে ওই বছর প্রায় ৭৪ হাজার কোটি রুপি বলি দিতে হচ্ছে ট্যানারি মালিকদের। তবে বাংলাদেশের চামড়া সিন্ডিকেটের কল্যাণে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পেরেছিল তারা আর এ বছরও ভারতে গরু জবাই নিয়ে রয়েছে তুমুল বিতর্ক। ফলে চামড়া পাচার হওয়ার আশঙ্কা এবারও প্রকট।

কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল চামড়া সিন্ডিকেটদের খুঁজে বের করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। আক্ষেপের বিষয় হলো, সরকারের দেওয়া নির্ধারিত দামেও কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয় করেনি আড়তদারসহ ট্যানারি মালিকরা। এর পরও কর্তৃপক্ষের যেন কিছুই করার নেই। কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। আমাদের মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য রফতানি যেমন অপরিহার্য শর্ত; তেমনি আবার রফতানি বাড়ানোর জন্য কাঁচামাল জাতীয় পণ্য অন্যতম শর্ত। আর এ শর্ত পূরণ করতে পারে চামড়াশিল্প। চামড়া খাতের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে বর্ষপণ্য বা প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার-২০১৭ ঘোষণা করেন এবং চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে আরো দুটি চামড়া শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কথা ঘোষণা করেন। এ চামড়াশিল্পকে ধরে রাখতে না পারলে আমাদের এ চামড়াগুলো পাচার হয়ে যাওয়ার যেমনি আশঙ্কা রয়েছে; তেমনি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং দেশীয় এ শিল্প রক্ষা ও গরিবদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারকে এ বিষয়ে যথার্থ পদক্ষেপ নিতে হবে, একই সঙ্গে এর সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : গবেষক ও বিশ্লেষক

[email protected]

 

"