মুক্তমত

এতিমের হকে থাবা

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

এবার দরিদ্র-এতিমের হকে থাবা বসিয়েছে অসাধু চামড়া ব্যবসায়ীরা। কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা দরিদ্র, এতিম, মিসকিনদের হক। ওই টাকা কোরবানিকারক দরিদ্র-এতিমদের মাঝে বণ্টন করার বিধান হচ্ছে ইসলাম ধর্মে। এবার সারা দেশে এবার পশুর চামড়া বিক্রি হয়েছে পানির দামে। সরকার কর্তৃক চামড়ার নির্ধারিত দর দেশের কোথাও কার্যকর হয়নি। কোন কোন স্থানে পশু কোরবানি করে চামড়া পার্শ্ববর্তী মাদ্রাসা ও এতিমখানায় দান করার পর এসব চামড়া নিয়ে মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষও পড়েন বিপাকে। লাখ টাকায় কেনা গরুর চামড়ার দাম হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। ছাগল বা খাসির চামড়া আকারভেদে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম উঠেছে। এ কারণে অনেকেই তাদের কোরবানিকৃত পশুর চামড়া গর্ত করে মাটিচাপা দিয়েছেন। অনেকে ফেলে দিয়েছেন রাস্তায়। দেশের ইতিহাসে এত কম দামে আর কখনোই পশুর চামড়া বিক্রি হয়নি।

শুধুমাত্র দেশের একটি শহরের দিকে তাকালে দেখতে পাই সিলেট নগরীতে যারা কোরবানি করেছেন তাদের অধিকাংশই চামড়ার কাক্সিক্ষত মূল্য না পাওয়ায় তা রাস্তায় রাস্তায় ফেলে দেন। ঈদের রাতের নগরীর বিভিন্ন স্থানে ফেলে রাখা চামড়া অপসারণ করে সিলেট সিটি করপোরেশন। এক রাতেই সিলেট নগরী থেকে ১০ টনের অধিক চামড়া অপসারণ করে দক্ষিণ সুমরমার ময়লার ভাগাড়ে ফেলা হয়। এটি সিলেট নগরীর দৃশ্য হলেও দেশের প্রায় সব জেলায় এমন ঘটনা ঘটেছে।

এবার ঢাকায় কোরবানির পশুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকা ব্যতিত সারা দেশে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল সরকার। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়ার দর প্রতি বর্গফুট নির্ধারণ হয়েছিল ১৮ থেকে ২০ টাকা। বকরির চামড়ার দর প্রতি বর্গফুট নির্ধারণ হয়েছিল ১৩ থেকে ১৫ টাকায়। মহিষের চামড়া গরুর চামড়ার দরে বিক্রি হবে। কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে এ দরে লবণ ছাড়া চামড়া কিনবেন ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীরা সরকার এমন ঘোষণা দিয়েছিল। এ দরে ৩০ থেকে ৩৫ বর্গফুটের লবণযুক্ত বড় গরুর চামড়া ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় ট্যানারি-মালিকরা কেনার কথা। প্রতিটি চামড়া সংরক্ষণে লবণ, গুদাম ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহনসহ মোট ব্যয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা এবং ১০০ টাকা মুনাফা ধরলেও মাঠপর্যায়ে ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকায় চামড়া কেনাবেচা হওয়ার কথা। কিন্তু অধিকাংশ স্থানেই চামড়া বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। সরকারের নির্ধারিত দর হিসাবে গড়ে প্রতি ছাগলের চামড়ার দাম ১০০ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও তা বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে। গত ৪০ বছরে দেশে চামড়ার এমন দরপতন হয়নি।

আজ থেকে ২০ বছর আগে (১৯৯৯-২০০০ সালে) একটি বড় গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে গড়ে ২ হাজার থেকে ২২০০ টাকা পর্যন্ত। আর ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। সে হিসাবে বর্তমানে ২০ বছর আগের তুলনায় কমপক্ষে প্রতিটি চামড়া ডাবল দামে বিক্রি হওয়ার কথা। অর্থের মূল্যমান ক্রমশ বৃদ্ধি হওয়ায় তাই হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ২০ বছর আগের তুলনায় এখন অবিশ্বাস্য কম দামে চামড়া বিক্রি হওয়ায় অনেকেই তাদের কোরবানিকৃত পশুর চামড়া ফেলে দিয়েছেন। কেউ কেউ গর্ত করে পুঁতে রেখেছেন। আর যারা মাদ্রাসা বা এতিমখানায় দিয়ে দিয়েছিলেন ওই চামড়া নিয়ে মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষও পড়েছেন বিপাকে। তারা পরিবহন খরচ দিয়ে চামড়া সংগ্রহ করে মাটিচাপা দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোতে যারা লেখাপড়া করে তাদের অধিকাংশই এতিম বা হতদরিদ্র। কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির টাকায় এসব এতিম ও হতদরিদ্রদেও লেখাপড়ার খরচ জোগান এবং সারা বছরের লিল্লাহ বোডিং পরিচালিত হয়ে থাকে। কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির টাকা দরিদ্র মানুষকে দিতে হয়। ফলে যারা কোরবানি করেন তারা কওমি মাদ্রাসা বা কোনো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে চামড়া দান করেন। আর এই দুর্বলতার সুযোগে এবার দেশের চামড়া ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে শত শত কোটি টাকা ছিনতাই করে পকেটস্থ করার প্রচেষ্টা চালালেন।

বর্তমানে বাজারে কৃত্রিম চামড়ার পণ্যের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা সেবামূলক কাজে ব্যবহার হয়। কিন্তু এটি নিয়ে এবার অমানবিক ব্যবসায় লিপ্ত হলো চামড়া ব্যবসায়ীরা। গত বছর যে দাম ছিল তার প্রায় দশগুণ কম দামে এবার চামড়া বিক্রি হলো। সরকার আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ে কাঁচা চামড়ার বাজার দর বিবেচনা করে কোরবানির পশুর চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করেছিল। এছাড়া কোরবানির পশুর চামড়া গরিবের হক। তারা যেন ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে অবলিলায়। এতে চামড়া শিল্পের বর্তমান দুর্দশার চিত্র ফুটে ওঠেছে। চামড়ার দাম নিয়ে অন্তরালে কেউ কেউ নোংরা খেলা খেলে নিজেরা লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেছেন। এবার যেভাবে সিন্ডিকেট করে চামড়া শিল্পকে ধসের দিকে ধাবিত করা হয়েছে এ ধারা অব্যাহত থাকলে পাট শিল্পের মতো চামড়া শিল্পও এক সময় বাংলাদেশে অতীত ঐতিহ্য বা ইতিহাস হয়ে থাকবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

"