আলোচনা

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

মাহবুবুল আলম

পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসনকালের ১৪ বছরই বাঙালিদের দাবি আদায়ের জন্য যে মহান নেতার কারাগারে কেটেছে, যার উজ্জীবনী নেতৃত্বে ঘুমন্ত বাঙালি জাতি পাকিস্তানি দুঃশাসনের নাগপাশ ছিঁড়ে জেগে উঠেছিল মুক্তির অদম্য সাহসে, যার ডাকে সাড়া দিয়ে আবালবৃদ্ধবনিতা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে এবং ত্রিশ লাখ মানুষের জীবন ও তিন লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার লাল সূর্য পতাকা। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সেই দেশপ্রেমিক মহান নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা। যতই দিন যাচ্ছে, ততই এ হত্যাকা-ে দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্টতার তথ্য-প্রমাণ বেরিয়ে আসছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ে জিয়াউর রহমানের যে পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ও সংস্রব ছিল, তা এখন মার্কিন আর্কাইভসের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত গোপন দলিলপত্র থেকেই বেরিয়ে আসছে। তাই এই হত্যাকা-ে ইতিহাসের রহস্যপুরুষ জিয়াউর রহমানের গোপন সম্পৃক্ততা নিয়ে আজ আর কারো মনে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। ইতিহাসের এ নৃশংস জঘন্যতম হত্যাকা-ে জিয়াউর রহমানের জড়িত থাকার বিষয়ে একটি বিদেশি মিডিয়ায় প্রথমেই হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেয় খুনি কর্নেল রশীদ। খুনি রশীদ সে সাক্ষাৎকারে বলেছিল, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের মানুষকে উজ্জীবিত করার এমনই এক ক্ষমতা ছিল, তাকে এভাবে সরিয়ে না দিলে কিছুতেই ক্ষমতা থেকে হটানো সম্ভব ছিল না। কর্নেল রশীদ তার ওই সাক্ষাৎকারে আরো বলেছে, ‘আমরা শেখ মুজিবকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আলাপ করতে গেলে তিনি আমাদের এই বলে বিদায় করেছিলেন, ‘আমাকে এ ব্যাপারটিতে সরাসরি না জড়িয়ে তোমরা জুনিয়ররা যা পার তা করে ফেল।’ জিয়াউর রহমানের এ বক্তব্যের মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়, তিনিও ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের মূলহোতাদের অন্যতম।

জিয়াউর রহমান সরাসরি হত্যাকা-ে অংশগ্রহণ না করে পর্দার আড়ালে থেকে জুনিয়র অফিসারদের দ্বারা এ হত্যাকা- সংঘটিত করেছিলেন। খুনি রশীদের এ সাক্ষাৎকারটি দেশের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্টনিকস মিডিয়ায় বহুবার প্রচারিত হয়েছে। তা ছাড়াও ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আফজালুর রহমানের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় লে. কর্নেল রশীদের স্ত্রী জোবায়দা খাতুন যে স্বীকারোক্তিমূলক জবাববন্দি দিয়েছেন, তার অংশবিশেষ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে এখানে তুলে ধরা হলো : ...বঙ্গবন্ধুর হত্যার ষড়যন্ত্রকারী মেজর রশীদ ও মেজর ফারুক এ বিষয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। ওই সময় এক রাতে মেজর ফারুক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসা থেকে ফিরে রশীদকে জানায়, সরকার পরিবর্তন হলে জিয়া প্রেসিডেন্ট হতে চায়। জেনারেল জিয়া নাকি তাদের বলেছিল, যদি এ মিশন সফল হয় আমার কাছে এসো, না হলে আমাকে সংশ্লিষ্ট করো না।... জোবায়দা রশীদ আরো বলেন, (১৯৭৫ সালের) পনেরো আগস্ট বিকেলেই বঙ্গভবনে জেনারেল জিয়াউর রহমান মেজর রশীদের কাছে সেনাপ্রধান হওয়ার জন্য ঘুর ঘুর করছিল। পরে ১৬ বা ১৭ আগস্ট সাবেক মন্ত্রী সাইফুর রহমানের গুলশানের বাসায় সাইফুর রহমান, রশীদ ও জিয়ার উপস্থিতিতে জিয়াকে সেনাপ্রধান করা ঠিক হয় এবং এও ঠিক হয়, পরে জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হবে...। এ ছাড়া ১৫ আগস্ট ২০০৯ বিটিভিতে প্রচারিত জাতীয় শোক দিবসের এক স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংস্থাপন মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট খুনিদের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সখ্য ও তার রহ্যজনক ভূমিকার কথা বলেছেন। মোশতাক সরকারের আমল থেকে খুনিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করার ধারাবাহিকতায় তাদের বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসে চাকরি, ফরেন সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করাসহ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

আমি এখন আলোচনা করতে চাই এই নৃশংস হত্যাকা-ে আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয় নিয়ে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- যে শুধু গুটিকয়েক বিপথগামী জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা দ্বারা সংঘটিত হয়েছে, তা আর বিশ্বাস করার কোনো অবকাশ আছে বলে আমি মনে করি না। কেননা, বঙ্গবন্ধুর মতো এমন একজন বিশ্ববরেণ্য জাতীয়তাবদী নেতাকে আন্তর্জাতিক কোনো সহযোগিতা ও ইন্দন ছাড়া আর্মির কয়েকজন চুনোপুটি পেটি অফিসার আক্রোশের বশবর্তী হয়ে হত্যা করে ফেলবে তা কোনো সুস্থ মানুষ কেন, বদ্ধ পাগলেও বিশ্বাস করবে না। এই হত্যাকা-ে আন্তর্জাতিক যে শক্তিবলয়টি কাজ করেছে, তার মধ্যে অন্যতম পাকিস্তান, আমেরিকা, চীন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরো কয়েকটি দেশ; বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত হত্যাকারীদের কোনো কোনো আরব দেশ আশ্রয় দিয়ে এবং তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে এ হত্যাকা-ের সঙ্গে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ দিয়েছে।

স্বাধীনতা লাভের সূচনালগ্ন থেকেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশের পেছনে লেগে আছে। এ ক্ষেত্রে কাজে লাগায় আইএসআইয়ের সাবেক বিশ্বস্ত কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- যে আইএসআইয়ের সবচেয়ে বড় অ্যাসাইনমেন্ট ছিল, তা বহু রাজনৈতিক ভাষ্যকারের লেখায় উঠে এসেছে।

১৫ আগস্টের নৃশংস জঘন্য হত্যাকা- সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইসলামাবাদ বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের এ তড়িগড়ি সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করলেই এ রক্তাক্ত হত্যাকা-ে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৬ আগস্ট ১৯৭৫ টাইমস অব ইন্ডিয়া ও পেট্রেয়টের রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের খবর সর্বপ্রথম আমেরিকাই পেয়েছিল। সেই সুবাধে ১৫ আগস্ট সকাল থেকেই মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর থেকে এ অভ্যুত্থানের খবর ফলোআপ করা হচ্ছিল। এমনই এক বার্তায় বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত বোস্টার বাংলাদেশ বেতারের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেন, ‘শেখ মুজিব নিহত হয়েছেন, খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী সরকার গঠন করেছে। মুজিবের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’ বোস্টার তখন বাংলাদেশ পরিস্থিতির ওপর কিছুক্ষণ পরপরই রিপোর্ট পাঠাচ্ছিলেন। অন্যদিকে ওয়াশিংটন স্টেট ডিপার্টমেন্ট মুখপাত্র এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নয়া সরকারের সঙ্গে স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। কাজেই আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, আমেরিকাও বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল।

এসব দেশের মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ ছাড়াও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্ববরেণ্য নেতায় অধিষ্ঠান হওয়াকেও তাদের আরো অধিক প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তুলেছিল। তারা ভেবেছিল শেখ মুজিবুর রহমান বেঁচে থাকলে এক দিন সে তার ক্যারিশমেটিক লিডারশিপের মাধ্যমে বিশ্বনেতায় পরিণত হবেন। এর পেছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বঙ্গবন্ধুর জুলিওকুরি উপাধি লাভ, আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন উপলক্ষে বিশ্বের জীবিত কোনো নেতার মধ্যে শুধু বঙ্গবন্ধুর নামে তোরণ নির্মাণ, ১৯৭৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণে অস্ত্রসংবরণের আহ্বানও পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। অস্ত্রসংবরণ ও শোষিতের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এ দৃঢ় অবস্থান পরাশক্তির ভিতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। উপরন্তু ওআইসি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর যোগ দেওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের স্বীকৃতিদানের বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিলে পাকিস্তানের সঙ্গে ওআইসি সম্মেলনে একই ছাতার নিচে কিছুতেই আমার যোগদান করা সম্ভব নয়। তার এ দৃঢ়চেতা অবস্থানের কারণেই ইসলামী বিশ্বের চাপে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিল এবং ইসলামী বিশ্বের বেশ কজন প্রভাবশালী নেতা বিশেষ বিমানে উড়ে এসে বঙ্গবন্ধুকে ওআইসি সম্মেলনে নিয়ে যান। বিশ্ব ও বিশ্ব নেতাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর এ উচ্চ অবস্থানও তার হত্যাকা-ের অন্যতম কারণ বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন।

এ ছাড়া ভারতের ইন্দিরা গান্ধী সরকারের সঙ্গেও স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ফিরিয়ে নেওয়ার বঙ্গবন্ধুর আহ্বান নিয়ে অন্তর্গত মনোমালিন্যের বিষয়টিও কাজ করেছে বলে অনেক বোদ্ধাই মনে করেন। কারণ, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ভারতের নিষ্ক্রিয়তা এবং সহসাই মোশতাক সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়টিও হেলাফেলার ছিল না। কেননা, বাংলাদেশ থেকে অতিদ্রুত ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ফিরিয়ে নেওয়ার বঙ্গবন্ধুর আপসহীন মনোভাবও এর পেছনে কাজ করতে পারে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের সাক্ষাৎকার ও এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন লেখায় বিষয়টি উঠে এসেছে। বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য ছিল, ‘এক দখলদার বাহিনীকে সরিয়ে আরেক দখলদার বাহিনীর হাতে আমি আমার স্বাধীন বাংলাদেশকে তোলে দিতে পারি না। সুতরাং আমাদের প্রথম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের আগেই বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ফিরিয়ে নিতে হবে। ভারত মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে অস্ত্র দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে, এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছে, তাদের সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য জীবন দিয়েছে, এ জন্য বাংলাদেশের মানুষ চিরদিন ভারতবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে; তাই বলে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবস্থান আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এ আপসহীন নেতৃত্বের কারণেই মাত্র ৫০ দিনের মাথায় ১২ মার্চ ১৯৭২ ভারত তার সেনাবাহিনী ফিরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করে, যা ছিল সদ্য স্বাধীন একটি দেশের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

সুতরাং আমি আজ নির্দ্বিধায় এ কথা বলতে পারি, যতই দিন যাবে, ততই বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের এ জঘন্য নৃশংস হত্যাকাণ্ডের আরো অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে এবং তা আসবে ইতিহাসের অমোঘ বিধানেই। কেননা, ইতিহাসের পথে কেউ কোনো দিন বাধা দিয়ে রাখতে পারে না। ইতিহাস তার আপন নিয়মেই নিজের পথ তৈরি করে নেয়।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

[email protected]

"