পর্যালোচনা

স্মৃতিতে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ

ধন ধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা। সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতার উৎকর্ষতাকালের বিবর্তনে সারা বিশ্বে সুনামের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছিল। এর সংস্কৃতি, সম্পদ, শিল্প, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যÑ সবই ছিল উচ্চমানের। সে জন্য বিভিন্ন সময়ে এ ভূমি-বাণিজ্যের উৎকৃষ্ট স্থান হয়েছিল। বিভিন্ন আগ্রাসী শক্তি বারবার এ ভূমির সম্পদ লুণ্ঠনে ও ক্ষমতা দখলে তৎপর হয়েছে এবং ফলে শোষণও করেছে বিভিন্ন সময়। শেষ দুটি শোষক গোষ্ঠী ছিল ইংরেজ ও পাকিস্তানি। বাংলার বহু সন্তান ও রাজনীতিবিদ শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন, জীবন দিয়েছেন, পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে এ ভূমিকে রক্ষা করার জন্য। সর্বশেষ পাকিস্তানিরা যখন নানা কায়দায় পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলাকে শোষণ করছিল, তখনই এক ত্রাণকর্তার জন্ম হয় এ বঙ্গে। তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যার নেতৃত্বে বাঙালি জাতি জেগে ওঠে, শুরু করে মহাসংগ্রাম। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের ১১ দফার আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এসবই বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় কোটি কোটি বাঙালি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ৯ মাসে দেশকে স্বাধীন করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ঘটনা বিরল। কিন্তু এ দেশের কতিপয় বিশ্বাসঘাতক ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বাঙালি জাতির জন্য সত্যিই এটি একটি কলঙ্কজনক ঘটনা। নৃশংস এই হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে আমাদের স্বাধীনতার মূলে আঘাত করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের একজন প্রত্যক্ষ সহযোগী হিসেবে এ মৃত্যুকে কোনোভাবে মেনে নিতে পারছিলাম না। মানসিকভাবে আর একটা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলাম। আশা করেছিলাম সেদিন অনেক নেতা প্রতিবাদ করবে। কিন্তু ঘটনা ঘটল তার উল্টো। জাতীয় চার নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ এইচ এম কামরুজ্জামান এবং তোফায়েল আহমদ, আবদুর রাজ্জাক ছাড়া অনেকেই খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় শপথ নিয়েছিল। আসলেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করে পাকিস্তানি মূল্যবোধসম্পৃক্ত একটি দেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যা সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশবিশেষ। ১৫ আগস্টের পরপরই স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ওপর, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ আর সংখ্যালঘুদের ওপর। বুঝে ওঠার আগেই প্রশাসনের সব ক্ষেত্র বদলে যায়। পাকিস্তানপন্থিরা শুরু করে স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের ওপর নির্মম অত্যাচার।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মাত্র তিন-চার দিন পর দেখেছি সর্বত্র নামকরা রাজাকারদের উত্থান, দেখেছি তাদের আক্রমণে কী করে নির্যাতিত হয়েছিল, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকরা। মনে আছে এখনো, হোমনা থানার আওয়ামী লীগ নেতা দক্ষিণ ইউনিয়নের তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম ও নিলখী ইউনিয়নের ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রুক্কু মিয়াকে হত্যা করা হয়েছিল। এটা শুধু একটি এলাকার কথা তুলে ধরলাম, এভাবে সারা দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করার জন্য খুনিরা মেতে উঠেছিল। যা বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে চলছিল। তাদের নির্যাতনের ভয়ে এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছিল, তাদের অপরাধ ছিল তারা মুক্তিযোদ্ধা। দেখেছিলাম কী করে রাতারাতি ভারতবিদ্বেষী উসকানিমূলক কর্মকা-, ভারতীয় কোনো পণ্যের জন্য স্থানীয় হিন্দুদের বাসাবাড়িতে তল্লাশির নামে চলে নির্যাতন।

নিজের অজান্তেই সেই ১৫ আগস্টের কলঙ্কিত সেই ভোর আমার বিবেককে দংশিত করেছিল, যৌবনের দুঃসহ সেই স্মৃতি আমাকে পীড়িত করে। তবে, সেদিনের সেই শোককে শক্তি হিসেবে ধরে সত্যিকারের বঙ্গবন্ধু প্রেমিক হয়ে ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষক রাজনীতিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলার কারণে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। নানা অত্যাচার-হয়রানির শিকার হয়েও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হইনি।

খুনিদের বাঁচানোর জন্য ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্ব-ঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাকের স্বাক্ষর আছে। সেই অধ্যাদেশে তৎকালীন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এইচ রহমানের স্বাক্ষরও আছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দেন। এরপর ক্ষমতায় আসে সামরিক শাসক মেজর জেনারেল জিয়া। সেদিন জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেছিলেন তিন মাসের মধ্যে ব্যারাকে ফিরে যাবেন, কিন্তু এটি বাস্তবে হয়নি। তিনি হ্যাঁ-না ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি হন, যা ছিল একটি প্রহসনের নির্বাচন। ক্ষমতা দখল করে জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেন। এভাবেই মোস্তাক-জিয়া-খালেদা গং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রক্ষা করার ষোলোকলা পূর্ণ করেন। শুধু তাদের রক্ষা করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা ওই খুনিচক্রের অনেককে পুরস্কৃত করেছিল। দিয়েছিল বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে গুরুত্বপূর্ণ পদ, মন্ত্রিত্ব, দেশদ্রোহী গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব। পাকিস্তানপন্থি শাহ আজিজুর রহমানকে করা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী।

দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত করা হয়। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর নিম্ন আদালত বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় ঘোষণা করে ১৫ জন সাবেক সেনা সদস্যের মৃত্যুদ-াদেশ দেন। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল উচ্চ আদালত ১২ জনের মৃত্যুদ- অনুমোদন করেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাঁচ বছরেও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের আপিল শুনানির ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা আদালতে ওঠে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হলে সেই চূড়ান্ত বিচারের কাজটি শুরু হয়। বিচার শেষে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি কারাগারে আটক ৫ খুনি লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব.) মহিউদ্দিন আহমদ, লে. কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা এবং মেজর (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আর যাদের এখনো ফাঁসি কার্যকর হয়নি, তাদের দেশে ফেরত এনে অবিলম্বে রায় কার্যকর করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে এই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে ওই অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করার শপথ নিতে হবে আজই।

মনে রাখতে হবে, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট শুধু বঙ্গবন্ধুর দেহকেই বুলেটবিদ্ধ করা হয়নি, আঘাত করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর। তাদের লক্ষ্য ছিল শুধু বঙ্গবন্ধু পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করাই নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশটাকেই ধ্বংস করে দেওয়া। তাই তো ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায় একই বছরের ৩ নভেম্বর কারা অভ্যন্তরে হত্যা করা হলো বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর চার জাতীয় নেতাকেও।

আজ ২০১৯ সালের ১৫ আগস্ট। জাতির জনকের মেয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ও তার পুরো পরিবার এখনো ১৫ আগস্টের দোসরদের কাছ থেকে হত্যার হুমকি পাচ্ছেন। শুধু একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলাই নয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ২১ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কখনো নিজ বাসভবনে, কখনো জনসভায় আবার কখনো তার গাড়ির বহরে। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমত ও জনগণের আশীর্বাদে এখনো তিনি বহাল তবিয়তে দেশ ও জনগণের সেবা করে চলেছেন। বায়ান্ন থেকে একাত্তর। বাঙালির মুক্তির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি হলেন বিশ্বের একমাত্র নেতা যিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার জাতির পিতার সম্মান পেয়েছিলেন। হাজার বছরের শ্র্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালনের প্রস্তুতিলগ্নে সবাইকে আহ্বান জানাই মনেপ্রাণে ও কাজকর্মে তার আদর্শকে অনুসরণ করার। বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে দেশপ্রেম, সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত একটি দেশ গড়তে হবে। তবেই জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার ন্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে এবং তার রক্তের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ হবে। এদিনে জাতির পিতাসহ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে শাহাদাতবরণকারী বঙ্গবন্ধু পরিবারের সব শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

লেখক : উপাচার্য, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"