পর্যবেক্ষণ

চায়ের ফুল থেকে প্রসাধনী

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

বিশ্বে যতগুলো ফুল রয়েছে, কম-বেশি সব ফুলেরই কদর রয়েছে। কিন্তু ‘টি ফ্লাওয়ার’ বা চা-গাছের ফুলের কোনো কদর নেই। উল্টো চা-শিল্পাঞ্চলে যুগ যুগ ধরে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, চা-গাছে ফুল ফোটা মানেই চা-গাছটি খুবই কষ্টে রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে চা-শিল্পাঞ্চলে চা-গাছে ফুল ফোটে। তবে কিছু কিছু বাগানে প্রায় সারা বছরই চা-গাাছে ফুল ফুটতে দেখা যায়। চা-গাছে ফুল ফোটার পর ফুলটির স্থায়িত্ব থাকে দুই থেকে তিন সপ্তাহ। থোকা-থোকা সাদা সেই ফুল দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর আপনা-আপনি ঝরে পড়ে যায়। আমাদের দেশের চা-শ্রমিকরা চা ফুল ভেজে খেয়ে থাকেন। এটি বছরের নির্দিষ্ট সময়ে তাদের প্রিয় একটি খাবার।

আমাদের দেশে চা ফুল অচ্যুত বা অবহেলিত থাকলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চা ফুল নির্যাস থেকে তৈরি প্রসাধনী আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে চলেছে। এবার সেই চা ফুল থেকে প্রসাধনী তৈরি করতে শুরু করেছে আমাদের পাশের দেশ ভারতের শিলিগুড়ির একটি চা প্রস্তুতকারী কোম্পানি। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ভারতের দার্জিলিং চা পাতার বেশ কদর রয়েছে। দার্জিলিং চা বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও মূল্যমানের দিক থেকে সবচেয়ে দামি চা হিসেবে গণ্য। শিলিগুড়ির চা প্রস্তুতকারী কোম্পানি চীনের সহায়তায় দার্জিলিং চায়ের ফুল থেকে তৈরি করা শুরু করেছে প্রসাধনী। অল্পদিনের মধ্যেই এ প্রসাধনী নিজস্ব বাজার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। প্রসাধনী বাজারে গোলাপ, জুঁই প্রভৃতি ফুলের ‘ফেস প্যাক’ পাওয়া যায়। এবার সংযোজন চা ফুলের ‘ফেস প্যাক’। এ ফেস প্যাক তৈরি করতে বাগান থেকে ফুলের মৌসুমে চা ফুল সংগ্রহ করে শুকিয়ে নেওয়া হয়। শুকনো ফুল গুঁড়ো করে তার সঙ্গে কিছু ভেষজ উপাদান মিলিয়ে সেই প্রসাধনী তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। শিলিগুড়ির চা প্রস্তুতকারী কোম্পানি চীনের একটি চা বিপণন সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সেই প্রসাধনী গত ফেব্রুয়ারি মাসে স্থানীয় বাজারে এনেছে। এটির নাম রাখা হয়েছে ‘টি ব্লসম’।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, দার্জিলিংয়ের চা পাতা উন্নত স্বাদ ও গন্ধযুক্ত। আর এর ফুলও চা পাতার মতো সুগন্ধি। সে সুগন্ধই ওই প্রসাধনীর মূল আকর্ষণ। শিলিগুড়ির চা প্রস্তুতকারী কোম্পানির দাবি, প্রসাধনী তৈরির পর নানা গবেষণাগারে পরীক্ষা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তা স্বল্প পরিসরে বাজারে বিক্রি শুরু হয়েছে। চা ফুলের ফেস প্যাক লাগিয়ে রাখার সময় একটি ঠা-া অনুভূতি পাওয়া যাবে। ফেস প্যাক ধুয়ে উঠিয়ে দেওয়ার পরে ত্বক অনেকটাই ঝলমলে দেখাবে। ত্বক থাকবে সতেজ। ত্বকের যতেœ এ ধরণের প্রসাধনী বিশ্বে যথেষ্ট জনপ্রিয়।

বাগানগুলোতে শীতকালে পরিচর্যা করার সময় চা ফুলের কুড়ি কেটে ফেলা হলেও বেশির ভাগ পুরোনো বাগানেই গাছের নিচের দিকে চা ফুল ফোটে। সাদা রঙের এই ফুলে ছোট ছোট পাপড়ি থাকে। যেসব বাগানে গাছের পরিচর্যা হয় না, বিশেষত বন্ধ বাগানে বড় ধরনের চা ফুলও দেখা যায়। ভারতের ফেস প্যাক প্রস্তুতকারী কোম্পানির সূত্র জানায়, বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে তাদের বাগানের একাংশে নিয়মিত ফুল ফোটানোর ব্যবস্থা হবে। পাতা নয়, শুধু ফুলের জন্য আলাদা করে গাছ তৈরি করা হবে। অবশ্য ফুল ফোটানোর সেই গাছেও চায়ের মান হবে যথেষ্ট উন্নত।

চীনে দীর্ঘদিন ধরেই চা ফুল নিয়ে নানা ধরনের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়েছে। চায়ের সুগন্ধি বাড়াতে চা ফুল শুকিয়ে গুঁড়ো করে চা পাতার মধ্যেই মেশানো হয় সেখানকার চা বাগানগুলোতে। কিছু ওষুধ, বিস্কুট, ফলের রসের সুগন্ধীর জন্য সে দেশে চা ফুল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে সেখানে চা ফুল থেকে প্রসাধনী তৈরির কথা জানা যায়নি। এবার চীনের সঙ্গে যৌথভাবে চা ফুল দিয়ে প্রসাধনী তৈরির কাজ করছে ভারতের শিলিগুড়ির চা প্রস্তুতকারী কোম্পানি।

শিলিগুড়িতে গত বছরের অক্টোবর মাস থেকেই চা বাগান থেকে ফুল সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে। সংগ্রহ করা সেই ফুল ভারত থেকে পাঠানো হয়েছে চীনে। সে দেশের পরীক্ষাগারেই তৈরি হচ্ছে ‘ফেস প্যাক’। দার্জিলিংয়ের চা পাতা যেহেতু অত্যন্ত সুগন্ধি, সে কারণে এখানের চা ফুলকেই বেছে নেওয়া হয়েছে ‘ফেস প্যাক’ তৈরির কাজে। বাংলাদেশের ১৬৬টি চা বাগানের চা ফুল সংগ্রহ করে এ ধরনের প্রসাধনী তৈরি করা গেলে ভারতের মতো আমাদেরও চা-শিল্পে নবদিগন্তের সূচনা করা সম্ভব হবে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন হামিদিয়া টি কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার মো. সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এতে অন্য ফুলের মতো চা ফুলেরও কদর বাড়বে। বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হবে চা-শিল্পের মালিকপক্ষ। আর সমৃদ্ধ হবে দেশের অর্থনীতি।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"