পর্যালোচনা

বিশ্ব রাজনীতিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

এশিয়া মহাদেশের একটা উপ-অঞ্চল হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। ভৌগোলিকভাবে এর চারদিকে রয়েছে দক্ষিণে চীন ও জাপান, পূর্বে ভারত, পশ্চিমে পাপুয়া নিউগিনি এবং উত্তরে অস্ট্রেলিয়া। চার বাউন্ডারির মধ্যের উপ-অঞ্চল হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। একজন আমেরিকান লজিক হাওয়ার্ড ম্যাক কলাম তার বই, ‘ট্র্যাভেলস ইন সাউথ-ইস্টার্ন এশিয়া’তে অর্থাঞ্চলকে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হিসেবে অভিহিত করেছিলেন ১৮৩৯ সালে, সেই থেকে এ অঞ্চল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হিসেবে পরিচিত পেয়েছে বিশ্ব পরিমন্ডলে। এ অঞ্চল আবার মেইনল্যান্ড এবং মেরিটাইম দুটি অঞ্চলে বিভক্ত। এ অঞ্চলের মোট রাষ্ট্র সংখ্যা ১১। সেগুলো হলো ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দ্য ফিলিপাইনস, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, ব্রুনাই ও পূর্ব তিমুর। এ রাষ্ট্রগুলোর মোট জনসংখ্যা ৬৪২ মিলিয়নেরও অধিক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান জলপ্রবাহ হলো দক্ষিণ চীন সাগর। পিপিপির হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মোট জিডিপি হলো ৭.৬ ট্রিলিয়ন আমেরিকান ডলার। ইউরোপ, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকায় পণ্য রফতানির পাওয়ার হাউসখ্যাত এশিয়ার চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানÑ এ তিন দেশ তার কনজ্যুমার বাজারে পণ্য রফতানির জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জলপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ, শিপিং লাইনস ব্যবহার করা ব্যতীত বিকল্প নৌপথ নেই। একই সঙ্গে এ তিন দেশে কাঁচামাল, তেল-গ্যাস ইত্যাদি সরবরাহকারী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকেও ওপরে বর্ণিত শিপিং লাইনস ব্যবহার করতে হয়। এ শিপিং লাইন দিয়ে প্রতি বছর ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন আমেরিকান ডলার সমপরিমাণের পণ্যদ্রব্যাদি এবং তৈল-গ্যাস বাণিজ্য সম্পন্ন হয়ে থাকে।

আর তাই এ শিপিং লাইন কোনো কারণে বন্ধ বা অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে বর্ণিত পাওয়ার হাউসগুলোর উন্নয়নের চাবিকাঠি আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে চীনের একক এশিয়ান শক্তি ও বিশ্বশক্তি হিসেবে উত্থানের পথে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতারও সৃষ্টি হবে। তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে চীনা কর্তৃপক্ষের অভিমত। তা ছাড়া ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে এবং এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক বিবেচনায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্ব বিশ্ব রাজনীতির একটা আলোচ্য বিষয় বলে অভিমত সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের। বিশ্বশক্তিগুলোর বিশেষ করে পশ্চিমের ঠান্ডাযুদ্ধ পরবর্তীতে এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য আমেরিকা অব্যাহতভাবে চেষ্টা চালিয়ে আসছে। অপরদিকে, এশিয়ার উদীয়মান শক্তি চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রসমূহ ও এর পানিপ্রবাহের ওপর প্রভাব-প্রতিপত্তি স্থাপনের লক্ষ্যে বহুমুখী প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আমেরিকাও ঠান্ডাযুদ্ধের পর থেকে তার পররাষ্ট্রনীতিকে এশিয়ামুখী করেছে। তারও লক্ষ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পানিপ্রবাহ ও এর বৃহৎ মার্কেটের দিকে। ওখানকার রাষ্ট্রগুলোর সংগঠন ‘আসিয়ান’ বা অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ-ইস্ট এশিয়ার ন্যাশন্সের অন্তর্ভুক্ত ১০টা রাষ্ট্রের কমপক্ষে হাফ মিলিয়ন জনসংখ্যার মার্কেটের প্রতিনিধিত্ব করছে আসিয়ান। আসিয়ানের সবচেয়ে বৃহৎ পানিপ্রবাহ হলো দক্ষিণ সাগর। এ সাগরের বিভিন্ন চৌক পয়েন্ট দিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ, নৌ-বাণিজ্য এবং সামরিক কনটেইনারগুলো চলাচল করে।

কিন্তু বৃহৎ শক্তি হিসেবে ওখানটায় আধিপত্য স্থাপন করা যেমন চীনের জন্য অপরিহার্য, তেমনি আমেরিকার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকাও তাই অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা আগের তুলনায় ব্যাপকতর করেছে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে। আসিয়ানের কম্বাইন্ড জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বিশ্বের এভারেজ জিডিপির প্রায় দ্বিগুণ। কানাডা, মেক্সিকো ও চীনের পরই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার পণ্য রফতানির দিক দিয়ে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ আমেরিকার জন্য বৃহৎ পণ্য আমদানির বাজার হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। অন্যদিকে আমেরিকা মোট রফতানি পণ্যের ৫.২ শতাংশ অত্রাঞ্চলে রফতানি করে থাকে। যেমন : ২০১৮ সালে আমেরিকা ওই অঞ্চলে ৮৬.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে রফতানি করেছিল। অন্যদিকে, ভূকৌশলগত অবস্থান ও ভূ-রাজনীতির গুরুত্বের কারণে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা স্বার্থের দিক বিবেচনায় এবং সর্বোপরি চীনের উত্থানের দিকে লক্ষ রেখেই আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও জাপান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের প্রভাববলয় বৃদ্ধি ও অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে এবং এজন্য এ দেশগুলো তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিরও চেষ্টা করছে। অর্থাৎ এটা স্পষ্ট যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজ নিজ প্রভাব-প্রতিপত্তি বা ডমিন্যান্স স্থাপনের জন্য চীন এবং অপরদিকে আমেরিকা ও তার মিত্র অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও জাপান প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত রয়েছে এবং এ কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চল হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর অর্থনীতি, এর জনসংখ্যা, এর জলপ্রবাহের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা, পশ্চিম ও এশিয়ার মধ্যে নৌ-যোগাযোগের সুবিধা, গুরুত্বপূর্ণ চৌক পয়েন্টগুলোর সঙ্গে দক্ষিণ চীন সাগর, ভারত মহাসাগর, আরব মহাসাগরের সঙ্গে সংযোগ থাকা, সামরিক ও কৌশলগত দিক দিয়ে বিশ্ব রাজনীতির প্রভাবকের ভূমিকা পালন করার সুবিধা রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর। চীন-আমেরিকার মধ্যকার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও শত্রুতার মূল ক্ষেত্র হবে দক্ষিণ চীন সাগর। এ সাগরের ওপর চীন একক প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে আসছে অনেক বছর ধরেই। পক্ষান্তরে আমেরিকা বলে আসছে, এ সাগরের ওপর তার মিত্র রাষ্ট্রগুলোর ভূমি-অধিকার রয়েছে তার সমাধান করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সাগরের ওপর সব রাষ্ট্রের নেভিগেশনের স্বাধীনতার অধিকার মেনে নিতে হবে চীনকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ চীন সাগরই হবে উভয় রাষ্ট্রের সংঘাত বা যুদ্ধের বড় ক্ষেত্র। তাছাড়া আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্কোন্নয়ন দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নে সুফল দিয়েছে, আবার আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে। অপরদিকে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে চীনের ব্যবসায়িক ও ফিন্যানসিয়াল সম্পর্কও জোরদার হয়েছে। বর্তমানে চীনের অর্থনীতি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি। অর্থাৎ আমেরিকার অর্থনীতির পরই চীনের অবস্থান এবং ২০৩০ সালের মধ্যেই আমেরিকাকে পেছনে ফেলে চীনের অর্থনীতি বিশ্বের প্রথম স্থান দখল করবে।

এসব বিবেচনায় এটা সত্যিকারভাবে বিবেচ্য যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো আমেরিকার বৃহৎ একটা বাজার। এ বাজার হাতছাড়া হলে আমেরিকার অর্থনীতির চরম ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটা ত্রিমুখী বাজার। যেমন আমেরিকান পণ্য সেবা ইত্যাদি রফতানি করছে ওই দেশগুলোতে, আবার ওই দেশগুলো থেকে প্রয়োজনীয় পণ্যাদি আমদানি করছে; যার পরিমাণ আমেরিকা বিদেশ থেকে সর্বমোট যা আমদানি করে তার ৭.৩ শতাংশই ওখানকার দেশগুলো থেকে করে থাকে। আর তৃতীয়টা হলো ওই অঞ্চলে আমেরিকানদের চাকরির বাজারও সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগগুলো আছে বলেই আমেরিকা এই বাজার হারাতে চাইবে না কোনো অবস্থাতেই।

অন্যদিকে, চীনের উত্থান মোকাবিলার জন্য দক্ষিণ চীন সাগর আমেরিকার জন্য অপরিহার্য। এ সাগরের ওপর চীনের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে গোটা এশিয়ায় আমেরিকার অবাধ প্রবেশের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে এবং অত্রাঞ্চলে আমেরিকান মিত্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তার বিঘœ ঘটবে এবং আমেরিকানদের ভাষ্যমতে, এতে আমেরিকান জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে; এশিয়ায় আমেরিকান বৃহৎ শক্তির অবনমন ঘটবে। তাই চীনা ডমিন্যান্স বা প্রভাব রুখে দেওয়ার জন্য আমেরিকা তার মিত্র ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামকে সঠিক সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্রনীতি এখন তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর নিবদ্ধ। আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে আমদানি-রপতানি বাণিজ্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের কারণে সবচেয়ে বৃহৎ ট্রেডিং অংশীদার এখন আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো।

কিন্তু চীনের লক্ষ্য হচ্ছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, পার্টিকুলারলি আসিয়ানের অন্তর্ভুক্ত। জোর করে নয়, স্বাভাবিক উপায়ে চীনের প্রতি আনুগত্য আদায় করার নীতি; যার মূলেই হলো অর্থনৈতিক সাহায্য-সহযোগিতা। অর্থ নেবে, সহযোগিতা ও আনুগত্য দেবেÑ এমন নীতি নিয়েই চীন এগিয়ে চলছে। বিশেষজ্ঞরা এ নীতিকে সিনিসাইজেশন ধারণা বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ চীনাকরণ নীতি বলে গণ্য করা হয়। যা হোক, আসল কথা হলো; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আধিপত্য স্থাপনকে কেন্দ্র করে দুই বৃহৎ শক্তি এখন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত এবং একসময় এর পরিণতি সামরিক সংঘাতের দিকে মোড় নিতে পারে বলে ভয় করছেন বিশেষজ্ঞরা। চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক উন্নয়ন ও শক্তি সঞ্চয় এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এমনকি বিশ্ব রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত। কারণ চীনের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সম্পর্কিত অর্থনৈতিক নীতির কারণে ওখানকার রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। অন্যদিকে আমেরিকাও ওই অঞ্চলে তার অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতিতে রি-ব্যালান্স করে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি ঠেকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ অঞ্চলের আধিপত্যকারী অন্যতম খেলোয়াড় আমেরিকা কখনো চাইবে না ওখানটায় চীন একক শক্তিধর খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হোক। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গ্রেট গেইম অব জিওপলিটিকস-সংক্রান্ত প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে। এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই অডিটসাইডার খেলোয়াড় চীন ও আমেরিকার ভূকৌশলগত সংঘাত ও দ্বন্দ্বের ফলে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর বড় ধরনের অর্থনৈতিক, সামরিক এবং অন্যবিধ ঝুঁকি বিদ্যমান রয়েছে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"