পর্যালোচনা

সভ্যতার অভিশাপ হিরোশিমা-নাগাসাকি

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

অলোক আচার্য

পারমাণবিক অস্ত্রের কথা উঠলেই চলে আসে জাপানের নাম। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের শেষপ্রান্তে ১৯৪৫ সালের আগস্টের ৬ ও ৯ তারিখ হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়। সারা বিশ^ দেখে ‘লিটল বয় ও ফ্যাট ম্যান’ নামের সেই অস্ত্রের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ। এই বোমা নিক্ষেপের ফলে হিরোশিমায় ১ লাখ ৪০ হাজার এবং নাগাসাকিতে ৭৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। আমেরিকার পরে দ্বিতীয় দেশ হিসেবে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৪৯ সালে তারা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। তৃতীয় দেশ হিসেবে ব্রিটেন এই বোমার পরীক্ষা করে। এর ফলে পৃথিবী বুঝে যায় যে এই ভয়ংকর অস্ত্র হাতে থাকলে বিশে^ খবরদারি করা যাবে। এরপর চীন, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হয়। একসময় পৃথিবী বুঝতে পারে এই অস্ত্র বিশে^র জন্য হুমকি। এই অস্ত্র বিস্তার রোধে চুক্তিও হলো। পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী বোমা আবিষ্কৃত হয়েছে। হাইড্রোজেন বোমা পারমাণবিক বোমার চেয়েও ৭০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। তবে তা কোনো যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়নি। মোট কথা বিশ^ এখন ভয়ংকর অস্ত্রের ঝুঁকিতে কাঁপছে। পরমাণু অস্ত্র ধ্বংস ক্ষমতার দিক থেকে অন্য সব অস্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক। অন্য অস্ত্রের চেয়ে পরমাণু অস্ত্র নিয়ে বিশে^র মাথাব্যথা বেশি। সারা বিশে^ পরমাণু অস্ত্র-সমৃদ্ধ দেশের সংখ্যাও কম নয়। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের বিষয়টি ওঠে আসে। এতে বিশে^র অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে। ছোট এই পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার জন্য যেটুকু অস্ত্র দরকার তার থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র পৃথিবীতে মজুদ রয়েছে। বিজ্ঞানের আশীর্বাদে মানবসভ্যতা আজ বহুদূর অগ্রসর হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমরা যেমন পৃথিবীকে উন্নত করতে পেরেছি; তেমনি নিত্যনতুন অত্যাধুনিক অস্ত্রে নিজেদের সজ্জিত করে সভ্যতাকেই হুমকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছি।

এটা আমাদের সফলতা না ব্যর্থতা তা একবাক্যে স্বীকার করার সময় আমাদের এখনই আসেনি। তবে একবাক্যে এ কথা বলতে দ্বিধা নেই আমাদের এই সুন্দর ধরণির অস্তিত্ব হুমকিতেই রয়েছে। বিশে^র পরাশক্তিগুলো একের পর এক মারণাস্ত্র বানিয়ে পৃথিবীকে হুমকির মুখে ফেলছে। নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে রেখেই যে এটা করছে তা নিশ্চিত। কিন্তু কেবল নিরাপত্তার অজুহাতে একের পর এক আধুনিক মারণাস্ত্র দিয়ে পৃথিবী ভরে ফেলছে এ কথা পুরোপুরি হয়তো সত্যি নয়। কোনো দিন যদি এই নিরাপত্তার অজুহাতই বুমেরাং হয়ে আমাদের ওপর চেপে বসে; তখন মানবজাতি কোথায় আশ্রয় নেবে? অন্য গ্রহে? হলেও হতে পারে। তবে তার সম্ভাবনাও খুব বেশি নয়। এক দেশ নতুন কোনো অস্ত্র বানাচ্ছে তো আরেক দেশ তার থেকেও ভয়ংকর কোনো অস্ত্র বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। এসব অস্ত্রের ভয়াবহতা এতই যে, এই সুন্দর সবুজ শ্যামল পৃথিবী তার অস্তিত্ব হারাতে পারে। বহুবার এ ধরণি আধুনিক মারণাস্ত্রের আঘাতে কেঁপে উঠেছে। জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকির কথাই উদাহরণ হিসেবে বারবার ওঠে আসে। সেই বোমা হামলার কয়েক দশক পার হলেও তার ক্ষত আজও জাপানের মানুষ বয়ে বেড়ায়। সেই হামলায় মৃত্যু এত ভয়ংকর ছিল যে, কোনো ধ্বংসের সঙ্গেই এর তুলনা হয় না। এরপর শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কি বিশে^ শান্তি বিরাজ করছে। বিশে^র অধিকাংশ দেশেই উত্তেজনা। পেশিশক্তি দেখানোর প্রবণতা বিশে^র মোড়ল দেশগুলোর মধ্যে। একজন আরেকজনকে ধ্বংস করতে ব্যস্ত। ভালো কাজের উদ্দেশ্যে ডিনামাইট আবিষ্কার করা হলেও সেই ডিনামাইট আজ মানুষের জীবন নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে আরো আধুনিক অস্ত্র মানুষ তৈরি করছে কেবল মানুষকে মারার জন্য! নিজের আধিপত্য বিস্তারের জন্য। ভাবতেই অবাক লাগে!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এসব উন্নত দেশ প্রতিনিয়তই নতুন নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্র তৈরি করছে। চীনের তৈরি অস্ত্র পেছনে ফেলছে পশ্চিমা বিশে^র তৈরি অস্ত্রকে। অস্ত্রের বাজারেও তাই চীনের আধিপাত্য। আইআইএসএসের গবেষকরা বলছে, চীনের অস্ত্র পশ্চিমা অস্ত্রের তুলনায় অন্তত ৭৫ ভাগ সক্ষমতা সম্পন্ন। কিন্তু দামে প্রায় অর্ধেক। সাম্প্রতিক সময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধে দুই দেশেরই কিছু ক্ষতিসাধন হয়েছে। ক্ষমতাশালী অস্ত্রে রাশিয়া সমানতালে এগিয়ে চলেছে। সম্প্রতি রাশিয়া সবথেকে শক্তিশালী পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন ৫৮৬ ফুট লম্বা বরফভেদী জাহাজ সাগরে ভাসিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেরুপ্রদেশ সামরিক দখল নেওয়া এর একটা অন্যতম লক্ষ্য। এর সঙ্গে সঙ্গেই চলেছে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশই এমন জাহাজ আনার কথা ঘোষণা করেছে। কেউ কারো থেকে পিছিয়ে নেই। কী মাটিতে, কী আকাশে বা মহাসাগরে। মহাশূন্যও দখলে নেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি নতুন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার তথ্য প্রকাশ করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী মহাকাশে সেন্সর বসানো হবে শত্রুর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র চিহ্নিত করার জন্য। সেই ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার জন্য মহাকাশেই স্থাপন করা হবে অস্ত্র। রাশিয়ার মতে, এতে মহাকাশে বিপজ্জনক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করতে পারে। তারা বিষয়টিকে ¯œায়ুযুদ্ধকালীন সময়ের দিকে ইঙ্গিত করেন। এসব থেকে বোঝা যায়, বিশে^ অত্যাধুনিক সব সমরাস্ত্রে ভরে যাচ্ছে। এসব অত্যাধুনিক অস্ত্রের ভারে পৃথিবী কি সত্যিই করুণ কোনো পরিণতি বরণ করতে হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। আর যদি করুণ পরিণতি বরণ করেই তা হলে অস্তিত্ব রক্ষার্থে মহাজগতের অন্য কোথাও নিজের ঠিকানা খুঁজে নিতে সক্ষম হবে?

অস্ত্রের ব্যবহার এবং তার ঝুঁকি অত্যন্ত মারাত্মক এবং দীর্ঘস্থায়ী। বিশে^র অস্তিত্বের জন্য হুমকি। নিজেদের শক্তি এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি পৃথিবীর জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠলে তা মানবকল্যাণে কোনো কাজেই আসবে না। গত বছর ভারত ও পাকিস্তানের ভেতর যুদ্ধের উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভারতে জঙ্গি হামলায় সেনাসদস্যের মৃত্যুর পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে চরম এই উত্তেজনা বিরাজ করেছে। নিজের ভূখন্ড ছাড়িয়ে আরেক দেশে বিমান হামলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। বর্তমানে কাশ্মীর ইস্যুতেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দুটি দেশ ভারত ও পাকিস্তান। এই অঞ্চলের সামগ্রিক শান্তির জন্য দুই দেশের শান্ত থাকা আবশ্যক। কারণ দুটি দেশই পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন দেশ। দুই দেশের হাতেই রয়েছে পরমাণু অস্ত্র। এক দেশ অন্য দেশকে আঘাত করতে সক্ষম। এখন দুই দেশ যদি নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারে, তা দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ^ নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আর পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার মারাত্মক ঝুঁকির ভেতর ফেলবে গোটা এশিয়াকে। আমাদের দেশও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সবদিক থেকেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বিশ^। তাছাড়া দুই দেশের যুদ্ধাবস্থাকে কেন্দ্র করে বিশ^যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। বিভিন্ন দেশ পক্ষ-বিপক্ষে ভাগ হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। বলা হয়, তৃতীয় বিশ^যুদ্ধ হলে তা বিশে^র অস্তিত্বই ধ্বংস করে দেবে। কারণ এখন সেসময়ের বিশ^যুদ্ধের চেয়ে বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী দেশগুলোর হাতে মারাত্মক সব অস্ত্র। রয়েছে রোবটের ব্যবহার। তাই দুই দেশই যদি সংযত থাকতে পারে, তা হলেই মঙ্গল। বিশ^ পারমাণবিক অস্ত্র শঙ্কামুক্ত হোক এবং নিরাপদ হোকÑ এটাই সবার জন্য মঙ্গল। আমরা আর কোনো হিরোশিমা বা নাগাসাকির মতো পরিণতি দেখতে চাই না। লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"