কোরবানির তাৎপর্য ও ইতিহাস

প্রকাশ | ০৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

এহসান বিন মুজাহির

কোরবানি গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব। কোরবানির ফজিলত সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে অনেক আয়াত ও হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে। কোরবানির ফজিলত প্রসঙ্গে মহান রাব্বুল আলামিন কোরআন কারিমে এরশাদ করেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানি নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা হালাল পশু জবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। (সুরা হজ : ৩৪)। আল্লাহতায়ালা কোরআনে আরো বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমার নিকট কোরবানির পশুর গোশত ও রক্ত কিছুই কবুল হয় না, তবে আমার নিকট পৌঁছে একমাত্র তাকওয়া। (সুরা হজ : ৩৭)। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগে কোরবানিদাতার কোরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায় এবং তার অতীতের সকল গুনাহ মোচন করে দেওয়া হয়। (তিরমিজি : ১/১৮০)। মহানবী (সা.) আরো এরশাদ করেন, ‘তোমরা মোটাতাজা পশু দেখে কোরবানি করো, কারণ এ পশুই পুলসিরাতের বাহক হবে। (মুসলিম : ২৬৩৯)। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসুল (সা.) পবিত্র মদিনায় ১০ বছর জীবনযাপন করেছেন প্রতি বছরই তিনি পশু কোরবানি করেছেন। (তিরমিজি : ১/১৮৯)। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘কোরবানির দিন আল্লাহর নিকট কোরবানি অপেক্ষা উত্তম কোনো আমল আর নেই। (মেশকাত : ১৯৩৭)। বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানির দিন কোরবানি করে না, সে যেন ঈদুল আজহার দিন ঈদগাহের ময়দানের কাছে না যায়। (ইবনে মাজাহ : ১৭২১)। এক দিন হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) রাসুলুল্লাহর (সা.) নিকট জিজ্ঞাসা করলেন হে আল্লাহর রাসুল! কোরবানি কী? তখন উত্তরে রাসুল (সা.) এরশাদ করলেন কোরবানি হচ্ছে ‘তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.) এর জীবনাদর্শ’। সাহাবি পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন কোরবানির ফজিলত কী? রাসুল (সা.) বললেন, পশুর পশমের পরিবর্তে একেকটি করে নেকি দেওয়া হয়’। (মেশকাত : ১/১২৯)।

কোরবানি শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ হলো নৈকট্য, সান্নিধ্য, আত্মত্যাগ, জবেহ, রক্তপাত ইত্যাদি। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় কোরবানি বলা হয়, মহান রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য ও সন্তুষ্ট লাভের আশায় নির্ধারিত তারিখের মধ্যে হালাল কোনো পশু আল্লাহর নামে জবেহ করা। কোরবানি নতুন কোনো প্রথা নয়, বরং এটা আদিকাল থেকে চলে আসছে। হজরত আদম (আ.) এর যুগে কোরবানির সুচনা হয়েছিল। আদম (আ.) এর সন্তান হাবিল-কাবিলের মধ্যে বিবাহ-শাদি নিয়ে যখন মতানৈক্য দেখা দিল; তখন আল্লাহতায়ালা তাদের ইখলাসের সঙ্গে হালাল পশু কোরবানি করার নির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে যার কোরবানি আমার নিকট কবুল হবে, তার নিকট মেয়ে বিবাহ দেওয়া হবে। হাবিল এবং কাবিল কোরবানির নির্দেশ পেয়ে কোরবানি করল। হাবিলের কোরবানি আল্লাহর কাছে কবুল হলো, কাবিলের হলো না। কাবিলের কোরবানি কবুল না হওয়ার কারণে সে ক্ষিপ্ত হয়ে হাবিলকে বলল, আমি তোমাকে হত্যা করে ফেলব। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘হে নবী আপনি তাদের নিকট যথাযথভাবে আদম (আ.)-এর পুত্রদ্বয়ের কথা আলোচনা করেন, যখন তারা মহান রবের নিকট তাদের কোরবানিকে পেশ করল, তখন একজনের কবুল হলো অন্যজনের হলো না। যার কোরবানি কবুল হলো না, সে ক্ষিপ্ত হয়ে অন্যজনকে বলল, আমি তোমাকে খুন তথা হত্যা করে ফেলব। পালনকর্তা একমাত্র মুত্তাকিদের কোরবানি কবুল করেন। (সুরা মায়িদা : ২৭)।

কোরবানির ঐতিহাসিক ও প্রেক্ষাপট

প্রথমে হজরত ইবরাহিম (আ.) এর কোনো সন্তান ছিল না, তাই তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমাকে আপনি নেক্কার সন্তান দান করেন। তার এ দোয়া মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে কবুল হয় এবং তিনি তাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিলেন। ইবরাহিম (আ.) এক দিন স্বপ্নে দেখলেন যে, মহান রাব্বুল আলামিন তাকে নির্দেশ দিচ্ছেন তার কলিজার টুকরা পুত্রসন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি দেওয়ার জন্য। কোনো কোনো রেওয়াত থেকে জানা যায় যে, এই স্বপ্ন ইবরাহিমকে (আ.) পরপর তিন দিন দেখানো হয়। এ প্রসঙ্গে তাফসিরের কিতাবে বর্ণিত রয়েছে যে, হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর বয়স যখন তেরো অথবা পূর্ণবয়স্কে পৌঁছেছিল তখন তাকে এ স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নের মাধ্যমে এ নির্দেশ পেয়ে চিন্তিত হয়ে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন ইসমাঈল কি মেনে নেবে। সে কি আল্লাহর রাস্তায় জান বিলাতে রাজি হবে। তিনি তার ছেলের কাছে গেলেন এবং বললেন আমি স্বপ্নের মাধ্যমে তোমাকে কোরবানি করার নির্দেশ পেয়েছি তোমার কী মতামত? তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, আব্বা আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নির্দেশ পেয়েছেন তা বাস্তবায়ন করেন। ইনশাআল্লাহ আমাকে আনুগত্য ও ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। পুত্র ইসমাইল (আ.) এর মুখ থেকে প্রাণভরা কথা শুনে তিনি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তাকে কোরবানি করার জন্য ময়দানে নিয়ে গেলেন। ইসমাঈল (আ.) এর হাত, পা বেঁধে জমিনে শুয়ে দিলেন। ধারালো চাকু দ্বারা তার গলাতে পোঁচ দিতে লাগলেন, কিন্তু আল্লাহর কি অপার মহিমা ছুরি তথা চাকু দ্বারা গলা কাটবে তো দূরের কথা তার গলায় দাগও বসাতে পারেনি। ইবরাহিম (আ.) নতুন আরেকটি ছুরি হাতে নিলেন এবং পুত্রের গলায় ছুরি চালাতে লাগলেন, তখন গায়েবীভাবে একটি আওয়াজ তার কানে পৌঁছাল, হে ইবরাহিম তুমি মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ, তোমার কলিজার টুকরা সন্তানকে আর কষ্ট দিও না, এবার তাকে ছেড়ে দাও। তোমার কোরবানি হয়ে গেছে। পুত্রের বদলে তুমি একটি তরতাজা দুম্বা কোরবানি করো। তখন ইবরাহিম (আ.) একটি দুম্বা কোরবানি করে আল্লাহর নির্দেশ পালন করলেন। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন)। হজরত ইবরাহিম (আ.) ইসমাইল (আ.) কে কোরবানি করতে গিয়ে শয়তান অনেক কুমন্ত্রণা ও প্রতারণা দেওয়ার প্রাণপণ প্রচেষ্টা করেছিল কিন্তু খলিলুল্লাহ শয়তানের সব প্ররোচনাকে পেছনে ফেলে মহান রবের নির্দেশ পালনে মনোযোগী হলেন। হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বললেন যখন ইবরাহিম ছুরি চালালেন তখন জিবরাইল আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, না জানি আমি পৌঁছার আগেই জবাই কাজ শেষ হয়ে যায় কি না, তাই তিনি জোরে জোরে আল্লাহু আকবারের ধ্বনি বলে আসছিলেন, আর এ তাকবিরের আওয়াজ ইবরাহিম (আ.) এর কানে পৌঁছাল তিনি ওপরের দিকে তাকালেন এবং বুঝতে পারলেন যে, জিবরাইল আল্লাহু আকবার তাকবির ধ্বনি দিয়ে আসছেন; তখন তিনি বলে উঠলেন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’ আর এই তাকবির শোনার পর ইসমাঈল (আ.) পরবর্তী লাইন ‘ওয়ালিল্লাহিল

হামদ’ বলে উঠলেন। (তাফসিরে মাজহারি)। পিতা-পুত্রের এই মহা আত্মত্যাগ আজও আমাদের প্রেরণা জোগায়। এই অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগের ইতিহাসকে স্মরণ রাখার জন্য আল্লাহতায়ালা উম্মতে মোহাম্মদির ওপর কোরবানি ওয়াজিব করেছেন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"