মুক্তমত

থেমে নেই সড়ক দুর্ঘটনা

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

সড়ক-মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন আর চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব দূর করা যায়নি। কোনোভাবেই সড়কে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হচ্ছে না। গত শুক্রবার সকালে ঠাকুরগাঁওয়ে দুটি যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে তিন নারী, চালকসহ ১০ জন নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ২৪ জন।

এক জরিপের ফল থেকে জানা যাচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রতিদিন গড়ে ২০ জনের মৃত্যু হয়ে থাকে। ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে চুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট বা এআরআই বলছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতির কারণে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে। আর পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনা ১০ শতাংশ। পথচারীদের অসচেতনতা ও সড়কের ত্রুটির কারণেই এসব দুর্ঘটনা ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এসব সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তির বেশির ভাগই শিশু, তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তি। সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব দুর্ঘটনার কারণে বছরে মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ হারাচ্ছে বাংলাদেশ।

গতি নিয়ন্ত্রণ, মহাসড়কে ছোট যানবাহন বন্ধ ও বেপরোয়া যানবাহন চলাচল বন্ধে সাফল্য নেই। এখনো দেশের সড়ক-মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ১০ লাখ নছিমন-করিমন-ইজিবাইক। অবাধে আমদানি হচ্ছে অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক। দেশব্যাপী অন্তত ৫ লাখ ফিটনেসবিহীন বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, হিউম্যান হলার অবাধে চলছে। নিবন্ধনবিহীন কয়েক লাখ অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করছে সড়ক-মহাসড়কে। এসব যানবাহন সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান উৎস।

এ ছাড়া চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে, যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। ইদানীং মোবাইল ফোন কানে রেখে গাড়ি চালানো যেন ফ্যাশন অনেক চালকের কাছে। যদিও এ কাজ থেকে বিরত রাখতে আইন আছে, কিন্তু সে আইনের ব্যবহার হয় না। এ কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনার জন্য যা-ই দায়ী হোক না কেন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতিসংঘ ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময়কে ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ সময়ের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়ে সদস্য দেশগুলো একমতও হয়েছে। এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাতে (এসডিজি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বহু দেশে সড়ক নিরাপত্তায় দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তৎপরতা দৃশ্যমান নয়।

এ ছাড়া সড়কের পাশে বিশ্রামাগার তৈরি, সিগন্যাল নিয়ে কড়াকড়ি, অনিয়মতান্ত্রিক রাস্তা পারাপার বন্ধ, গাড়িতে সিটবেল্ট বাঁধার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এসব নির্দেশনার অগ্রগতি কতদূর তা আমাদের জানা নেই। আমরা সড়ক নিরাপত্তায় সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখতে চাই। সড়কে মৃত্যুর মিছিল আর যেন দীর্ঘ না হয়। এককথায় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সব রকম ব্যবস্থা নিতে হবে। দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি পরিবহন সংশ্লিষ্ট সবার উপলব্ধিতে আনতে হবে।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে করণীয় সরকারের জানা। সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সরকার সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির স্বার্থের কারণে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের হিসাবে দেশে যানবাহনের সংখ্যা ৩৩ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে চালকের লাইসেন্স আছে ১৮ লাখ। অর্থাৎ বাকি ১৫ লাখ যানবাহন চলছে লাইসেন্সবিহীন চালক দিয়ে। এ ছাড়া পেশাদার চালকদের মধ্যে অন্তত দুই লাখ চালক লাইসেন্স পেয়েছেন শ্রমিক সংগঠনের চাহিদা মেনে, যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই। ফলে যা ঘটছে, তা দেখাই যাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

সরকারকে এখনই জরুরি ভিত্তিতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা করে তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে মহাসড়কে চালকদের ‘ডোপ টেস্ট’ করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নেবেÑ এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : সহসভাপতি, এফবিসিসিআই

 

"