পর্যবেক্ষণ

জাল মুদ্রা আগের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

মোহাম্মদ আবু নোমান

বাজারে জাল টাকার নানা প্রতীকী নাম রয়েছে। ব্যবসার সুবিধার্থে জাল কারবারিরা নানা নামকরণ করে থাকে। ওইসব নামে ডাকা হলে যারা বোঝার তারা ঠিকই বোঝে, কীসের কথা বলা হচ্ছে। এ জন্য ব্যবসায়ীরা এসব টাকার নানা সাংকেতিক নাম ব্যবহার করে থাকে। সূত্র জানায়, ১০০০ টাকার নোটের নাম লারেলাপ্পা, শাহরুখ, জুব্বা। ৫০০ টাকার নোটকে বলা হয় সালমান, ছক্কাপাঞ্জা, পাঞ্জাবি। ১০০ টাকার নোটকে বলা হয় কারিশমা, আলীবাবা ও ধোপা। আবার এলাকাভেদে ভিন্ন নামও রয়েছে।

আগেও জাল টাকা বানানো হতো। জানা যায়, ১৯৯০ সাল থেকে বাজারে জাল টাকার সরবরাহ শুরু হয়। তবে বর্তমানের উদ্ধার হওয়া জাল টাকা আগের টাকার চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত; যা সাধারণ চোখে বোঝা খুবই কঠিন যে, এটা জাল টাকা কি না।

নিখুঁতভাবে দেখলে আসল টাকা বা ভারতীয় রুপির সঙ্গে গ্রেফতারদের তৈরি করা জাল রুপির পার্থক্য বোঝা যায়। তবে সহজেই তা কারো নজরে আসার মতো নয়। মূলত দেশে বছরের দুটি ঈদ উৎসব, কোরবানির গরুর বাজার, বৈশাখী কেনাকাটা ও পূজা কেন্দ্র করে বেড়ে যায় জাল নোট চক্রের ব্যস্ততা। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, জালিয়াত চক্রের দক্ষ কারিগরদের তৈরি নিখুঁত জাল টাকাতেও নিরাপত্তা সুতা বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সাধারণভাবে দেখে সেগুলোকে জাল বলে ধরার কোনো সুযোগই নেই বলে মনে করেন একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

বর্তমানে সারা দেশে জাল টাকা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ছে যে, তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকটা আয়ত্তের বাইরে গিয়ে পড়েছে। এখন জাল টাকার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য ব্যাংকের সিলমোহর ও টাকার ওপর লাগানো ব্যাংকের কাগজও জাল হচ্ছে। জাল টাকার বান্ডিলে শুরুতে ও শেষ দিকে থাকে আসল নোট। মাঝখানে নকল নোট রাখা হয়। হুবহু ব্যাংকের মতো বান্ডিল বানানো হয়। এর ওপর সুতা দিয়ে বান্ডিল বাঁধা হয়। পরে ব্যাংকের সিলমোহর দেওয়া সিøপও লাগানো হয়। জাল নোটগুলো যেভাবে তৈরি করা হয়, তাতে আসল টাকা আর জাল টাকার মাঝে পার্থক্য খুঁজে পাওয়া দায়। সহজে চেনার উপায় নেই, কোনটা আসল আর কোনটা নকল টাকা।

মুসলমানদের ঈদ ছাড়াও অন্য ধর্মাবলম্বীদের উৎসবমুখর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আগে মার্কেটে কেনাকাটার সময় তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে বিক্রেতাদের এসব জাল মুদ্রা গছিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিটি উৎসবের আগমুহূর্তে জাল নোট তৈরির চক্রগুলোর ভেজাল টাকা নিখুঁত করার ব্যাপারে প্রতিযোগিতা চলে। কারণ যে চক্রের টাকা যত নিখুঁত, তার টাকার দাম তত বেশি, বিক্রিও বেশি। জানা যায়, প্রতি ১০০ পিস ১০০০ টাকার নোট অর্থাৎ ১ লাখ টাকা তৈরি করতে তাদের খরচ পড়ে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। সেই টাকা তারা পাইকারি বিক্রেতার কাছে ১৫ হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে থাকে। পাইকারি বিক্রেতা প্রথম খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রয় করে ২০-২৫ হাজার টাকা, প্রথম খুচরা বিক্রেতা দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রয় করে ৪০-৫০ হাজার টাকায় এবং দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতা মাঠপর্যায়ে সেই টাকা আসল ১ লাখ টাকায় বিক্রয় করে থাকে। এখানে পর্যায়ক্রমে তৈরিকৃত জাল টাকা বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে সারা দেশে। জাল টাকা তৈরি থেকে শুরু করে বাজারজাত করা পর্যন্ত কয়েকটি ভাগে তারা এ কাজ করে থাকে। প্রথমে অর্ডার অনুযায়ী জাল নোট তৈরি, দ্বিতীয় পর্যায়ে এ টাকাগুলো যে অর্ডার দেয় তার কাছে পৌঁছে দেওয়া, তৃতীয় পর্যায়ে জাল টাকা বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। চক্রগুলো বাজারে জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এটিএম বুথেও আসল টাকার সঙ্গে জাল টাকা মিশিয়ে ব্যবসা করছে বলে জানা গেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য বলছে, জাল টাকা তৈরির কারিগরদের (মাস্টার) মধ্যে সগির, কামাল, হুমায়ূন, জাকির, কাওসার, মাহবুব মোল্লা, আলাউদ্দীন, বাবু, লিয়াকত হোসেন ওরফে জাকির, রহিম বাদশার মতো অন্তত ২০ জন কারিগর রয়েছে। এর মধ্যে লিয়াকত হোসেন ওরফে জাকিরসহ তার দুই সঙ্গী শান্তা আক্তার ও মমতাজ বেগমকে সম্প্রতি যাত্রাবাড়ী থেকে আটক করেছে ডিবি পুলিশ। দেশব্যাপী জাল টাকা তৈরির চক্রদের একটা চেইন অব কমান্ড রয়েছে। বিভিন্ন ধাপে রাজধানীসহ সারা দেশে অন্তত ৫০ জন জাল টাকার ডিলার রয়েছে। প্রত্যেক ডিলারের সঙ্গে কমপক্ষে ৮-১০ জন বাজারজাতকারী রয়েছে।

ঈদে কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে জাল টাকা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে থাকে। রাজধানী ঢাকা ও জেলা শহরগুলোতে জাল নোট শনাক্তকরণ যন্ত্র থাকলেও গ্রামেগঞ্জের হাটবাজারগুলোতে সে ব্যবস্থা না থাকায় জাল টাকার কারবারিরা সে সুযোগ নিয়ে থাকে। গ্রামের বাজারগুলোতেও কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়ে থাকে। এটাকে মওসুম হিসেবে বিবেচনা করেই সারা দেশে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জাল টাকা তৈরি ও এর অবৈধ ব্যবসায়ী চক্রগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত এক হাজার টাকার মূল্যমানের ৬ লাখ ৮২ হাজার টাকার জাল নোট ধরা পড়েছে। একই সময়ে ৫০০ টাকা মূল্যমানের এবং ১০০ টাকা মূল্যমানের ৬২ হাজার ৭০০ টাকার জাল নোট ধরা পড়েছে। তবে চরম আশঙ্কার কথা হলো, সাধারণ বাজারই নয়, এখন ব্যাংকও পূর্ণ নিরাপদ নয়। জাল টাকার বিস্তার ব্যাংকের ভল্ট পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। সেখানেও মিলছে জাল নোট। চলতি বছরেই বাংলাদেশ ব্যাংক ২৭টি ব্যাংকের ভল্ট পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ১৪টি ব্যাংকের ভল্টে জাল নোট পাওয়া যায়। ওইসব টাকার কোনটি আসল নোট আর কোনটি জাল, এটা পরীক্ষা না করে বোঝার উপায় ছিল না। ভল্টে জাল টাকা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক চিন্তিত। অন্যান্য ব্যাংকের বিষয়টি বাদ দিলেও খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জাল টাকা পাওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। এতে বোঝাই যায়, বিভিন্ন ব্যাংকের অসাধু চক্রের সঙ্গেও জাল মুদ্রা তৈরির কারবারিদের যোগসাজশ রয়েছে। এটিএমের বুথগুলোর ব্যাপারে আগে থেকেই ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এটিএম বুথ থেকে গ্রাহকদের হাতে জাল টাকা আসছে।

আশার কথা হলো, এসব জাল মুদ্রা কারবারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ‘জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ’ আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে সরকার। নতুন আইনটি পাস হলে এটি হবে দেশে জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে প্রথম আইন। আইনটি বাস্তবায়নে ‘জাতীয় এবং জেলা’পর্যায়ে কমিটি থাকবে। কমিটির সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে আইনের আওতায় গঠন করা হবে ‘জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সেল’। জাল নোট-সংক্রান্ত খবর দেওয়া হলে পুরস্কার দেওয়া হবে সংবাদদাতাকেÑ এ বিধানও থাকছে নতুন আইনে। পরপর তিনবার কোনো ব্যক্তির কাছে ৫০০ পিসের বেশি যেকোনো মূল্যমানের জাল নোট পাওয়া গেলে তাকে সর্বোচ্চ ‘যাবজ্জীবন’ কারাদন্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে। তবে প্রথমবার একইসংখ্যক জাল মুদ্রা পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদন্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে। দ্বিতীয়বার একই ব্যক্তির কাছ থেকে তা পাওয়া গেলে তাকে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদন্ড বা আর্থিক জরিমানা প্রথমবারের তুলনায় দ্বিগুণ অথবা উভয় দন্ড দেওয়া হবে।

কোরবানির ঈদে ভারত থেকে গরু আনার হিড়িক পড়ে যায়। আর এ সুযোগে ভারতীয় অংশে লেনদেনের টার্গেট করে থাকে জাল রুপি তৈরির চক্র। সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আগ্রহী ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী জাল রুপি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। কতিপয় জাল রুপি চক্র ভারতীয় প্রত্যন্ত অঞ্চলে সক্রিয় থাকে। তাদের কাছে জাল রুপিগুলো বিভিন্ন দামে পাচার করে থাকে হোতারা। পুলিশ এবার জাল টাকার ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীদের ধরতে বেশ কয়েকটি সফল অভিযান পরিচালনা করে। তবে তাদের গডফাদাররা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর কারণ হিসেবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেশ কয়েকটি স্তরে এ ব্যবসা হচ্ছে বলে ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীদের ধরা সম্ভব হলেও তাদের নেতাদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে জাল নোট-সংক্রান্ত মামলা হয় ১৩৩টি। এর আগে ২০১৭ সালে ২৮৭টি, ২০১৬ সালে ৩৪৪, ২০১৫ সালে ৪১০ এবং ২০১৪ সালে ৩৬৮টি মামলা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, আইনি দুর্বলতার কারণে দেশে জাল নোটের বিস্তার ঘটছে। গত তিন বছরে প্রায় তিন কোটি টাকার জাল নোট শনাক্ত করা হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে যেসব জাল নোট উদ্ধার করা হয় এবং ওইসব মামলায় যাদের সাক্ষী করা হয়, তারা নিয়মিত সাক্ষ্য দিতে আসেন না। ফলে মামলাগুলো নিষ্পত্তি হচ্ছে না। আর যেগুলোর নিষ্পত্তি হচ্ছে, সেগুলোয় সাজা হচ্ছে না। মাঝেমধ্যে র‌্যাব, পুলিশের অভিযানে যারা ধরা পড়ে তাদের অধিকাংশই সাধারণ কারিগর। মূলত নোট জাল করার কাজে গ্রেফতাররা সরাসরি জড়িত থাকে, কিন্তু নেপথ্য কারিগরদের খোঁজ কেউ পায় না। ফলে জালিয়াত চক্রের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় কিছুদিন পরপরই তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। আর মাঝে মাঝে কোনো একটি চক্রের মূলহোতা গ্রেফতার হলেও দেখা যায় কিছুদিন না যেতেই সে ছাড়া পেয়ে যায়, আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে। নোট জালিয়াত চক্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কথাও শোনা যায়। উগ্র জঙ্গিবাদী গ্রুপও এসবের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। গোয়েন্দাদের হিসাবে প্রতি বছর প্রায় ২৫০ কোটি টাকার জাল মুদ্রা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক বিরাট হুমকিস্বরূপ।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"