মতামত

জাতীয় সংগীত নিয়ে নোবেলের ধৃষ্টতা

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

মাহবুবুল আলম

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পবিত্র জন্মস্থান গোপালগঞ্জের ছেলে ভারতীয় টিভি চ্যানেল জি-বাংলার রিয়্যালিটি শো ‘সা রে গা মা পা’য় হঠাৎ করে তারকাখ্যাতি পেয়ে যাওয়া নোবেল গ্রেন্ড ফিন্যালে-২০১৯-এ প্রীতমের সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় রানার্সআপ অর্থাৎ তৃতীয় হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে বাংলাদেশের মাঈনুল আহসান নোবেলকে। এতে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের বিশেষ করে ভক্ত তরুণ-তরুণীদের মন ভেঙে যায়। উল্লেখ্য, সা রে গা মা পার গ্র্যান্ড ফিনালেতে প্রিন্স মাহমুদের লেখা ও সুর করা আর জেমসের কণ্ঠে জনপ্রিয় হওয়া ‘বাংলাদেশ’ গানটি গেয়েছিলেন নোবেল। এ ছাড়া অনুষ্ঠানের শুরুতে আইয়ুব বাচ্চুর ‘সেই তুমি’ ও প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গান গেয়েছিলেন।

এক লাইভ সাক্ষাৎকারে ‘বাংলাদেশ’ গানটি গাওয়া প্রসঙ্গে নিজের আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে গিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের কথা বলে বিতর্কের জন্ম দিলেন নোবেল। নোবেলের মন্তব্য শুনে অনেকেই তার ওপর অভিযোগ তুলেছেনÑ ‘জাতীয় সংগীত’কে অপমান করেছেন নোবেল। ইতোমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় চলছে। কোনো গানই জাতীয় সংগীতের সমতুল্য নয় বলে মনে করেন দেশপ্রেমিক বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষ। সেই সাক্ষাৎকারে নোবেল বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের লেখা জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ যতটা না দেশকে প্রকাশ করে তার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি প্রকাশ করেছে প্রিন্স মাহমুদের লেখা ‘বাংলাদেশ’ গানটি। আমাদের জাতীয় সংগীত অতুলনীয়। এটি শুধু সংগীতই নয়; বাংলাদেশের প্রাণ। তার এভাবে তুলনা করাই অনুচিত ছিল। এসব মন্তব্যই শেষ নয়; অনেকে এর জন্য নোবেলকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন। বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে তার বিচারও দাবি করেছেন কেউ কেউ।

অবশ্য নোবেলকে নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক এটিই প্রথম নয়। এর আগেও গান গাওয়ার আগে গীতিকার ও সুরকারের নাম না বলায় বেশ নিন্দিত হয়েছিলেন নোবেল। এ ছাড়া এক সাক্ষাৎকারে তারকা ব্যান্ডশিল্পী জেমসের ম্যানেজারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন নোবেল। নোবেল দাবি করেছিলেন, জেমসের গাওয়া তুমুল জনপ্রিয় ‘পাগলা হাওয়া’ গানটি ‘সা রে গা মা পা’র মঞ্চে গাওয়ার পরও প্রচার করা সম্ভব হয়নি। জেমসের ম্যানেজারই নাকি তাকে ফোন করে গানটি টেলিকাস্ট করতে নিষেধ করেন। তবে নোবেলের সে দাবি নিয়ে সাক্ষাৎকারের ঘটনাটি এবার সামনে এনে জেমসভক্তরা প্রশ্ন করছেন, পাগলা হাওয়া গানটি টেলিকাস্ট না করতে দিলে কেন বা কার অনুমতি নিয়ে নোবেল সেদিন জেমসের ‘বাংলাদেশ’, ‘বাবা’, ‘মা’ গানগুলো সা রে গা মা পা অনুষ্ঠানে গেয়েছেন?

তবে এটিই প্রথম জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের উদ্যোগ বা দাবি নয়। জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের নেয় খুনি মোশতাক সরকার। ৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর জিয়া-ফারুক-ডালিম চক্র রাষ্ট্রপতির আসনে বসায় খন্দকার মোশতাক আহমেদকে। ক্ষমতায় বসেই মোশতাক ‘বাংলাদেশ বেতার’ নাম পরিবর্তন করে রেডিও বাংলাদেশ করেন। ‘জয় বাংলা’ বাদ দিয়ে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ করেন। মিডিয়ায় প্রচারিত বিভিন্ন তথ্যমতে, (মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নথি অনুযায়ী) ১৯৭৫-এর ২৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতির অভিপ্রায় অনুযায়ী জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. দ্বীন মুহাম্মদকে। কমিটিকে ‘এক মাসের মধ্যে পরিবর্তিত জাতীয় সংগীত’ প্রস্তাব করতে বলা হয়। দ্বীন মুহাম্মদ কমিটি তিনটি বৈঠক করে।

তারা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’ এবং ফররুখ আহমেদের ‘পাঞ্জেরী’ থেকে যেকোনো একটিকে জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাব করে প্রতিবেদন জমা দেয় ১ নভেম্বর। কিন্তু ক্যু পাল্টা ক্যুতে ওই প্রস্তাবের মৃত্যু ঘটে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দ্বিতীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান এক গোপন চিঠিতে বলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি গান ভারতীয় জাতীয় সংগীত। তিনি বাংলাদেশের নাগরিকও নন। হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন কবির লেখা গান ‘জাতীয় সংগীত’ হওয়ায় মুসলিম উম্মাহ উদ্বিগ্ন। এই গান আমাদের সংস্কৃতির চেতনার পরিপন্থি বিধায় জাতীয় সংগীত পরিবর্তন আবশ্যক।”

ওই চিঠিতে ‘আমার সোনার বাংলা’র পরিবর্তে ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ’কে জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাব করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই চিঠি পেয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রেডিও, টেলিভিশন এবং সব সরকারি অনুষ্ঠানে ‘প্রথম বাংলাদেশ’ গানটি প্রচারের নির্দেশনা জারি করে। এ সময় রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীতের পাশাপাশি ‘প্রথম বাংলাদেশ’ গানটি গাওয়া শুরু হয়।

জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের তৃতীয় দফা উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০১-২০০৬ সালে জামায়াত-বিএনপি জোট সরকারের সময়। ২০০২ সালে শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদ জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি যৌথ ডিও প্রধামন্ত্রীর বরাবরে জমা দেন। ২০০২ সালের ১৯ মার্চ স্বাক্ষরিত এই চিঠিতে দুজন যৌথভাবে বলেন, ‘সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের ইসলামী মূল্যবোধ ও চেতনার আলোকে জাতীয় সংগীত সংশোধিত হওয়া প্রয়োজন।’ প্রধানমন্ত্রীর নিকট উপস্থাপিত এই ‘অনুরোধ পত্র’টি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী প্রয়াত খুরশীদ জাহান হক, বিষয়টি ‘অতীব গুরত্বপূর্ণ’ বলে সচিবের কাছে প্রেরণ করেন। সচিব জাতীয় সংগীত পরিবর্তন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এখতিহারবহির্ভূত বিষয় বলে, তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করেন ২০০২ সালের ১৯ আগস্ট। এরপর এ সম্পর্কে আর কোনো তৎপরতা নথিতে পাওয়া যায়নি। সে যাত্রায়ও রক্ষা পায় আমাদের প্রাণের জাতীয় সংগীত, যা আমাদের বাঙালি চেতনার উৎস। এতে দেখা যায়, তিনবারই জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি করেছিল মোস্তাক, জিয়া এবং বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি।

কিন্তু এবারই প্রথম স্বাধীনতাবিরোধী ও জঙ্গি মানসিকতাসম্পন্ন ‘নোবেল’ নামক উঠতি এক সংগীত শিল্পীকে দিয়ে তার প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে এবং তাকে দিয়েই এই দেশ ও জাতিবিরোধী কুকর্ম সম্পন্ন করার অপচেষ্টা হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। এই নতুন ষড়যন্ত্র দেশকে নতুন করে অস্থিতিশীল করার অপপ্রয়াস মাত্র! এই নতুন ষড়যন্ত্রের পক্ষাবলম্বন করে দেশবিদ্বেষীরা হামলে পড়েছেন তাদের ভীষণ যুক্তির তকমা নিয়ে, ফেবুতে, এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায়। এতে খুশি পাকিপন্থি রাজনীতিবিদ ও তাদের প্রজন্ম। তাদের কেউ কেউ বলছেন, “পাকিস্তান যদি ভারতীয় কবির লিখা তাদের ১ম জাতীয় সংগীত ‘তারানা এ পাকিস্তান’ বদলে ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ রেখে লেজ কাটতে পারে, বাংলাদেশের তেমনটি করতে দোষ কী, জাতীয় সংগীত তো আর কোরআনের বাণী নয় যে, পরিবর্তন করা যাবে না।” কেউ কেউ এও বলছেন, “আমেরিকাও তাদের জাতীয় সংগীত বদলিয়েছে, বাংলাদেশের বদলালে দোষ কী?” শুধু তাই নয়, মৃত রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু চিহ্নিত করে বাংলাদেশ বিদ্বেষী বানাচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথকে ‘গান চোর’ আখ্যা দিচ্ছেন! যা খুবই নিম্নরুচির পরিচায়ক!

যাক সা রে গা মা পার গ্র্যান্ড ফিনালেতে প্রিন্স মাহমুদের লেখা ও সুর করা আর জেমসের কণ্ঠে জনপ্রিয় হওয়া ‘বাংলাদেশ’ গানটি গেয়েছিলেন নোবেল। গ্র্যান্ড ফিনালেতে ‘বাংলাদেশ’ গানটি গাওয়া প্রসঙ্গে নিজের আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে গিয়ে নোবেল এ কথা বলে এমন বিতর্কের জন্ম দিলেন। নোবেলের মন্তব্য শুনে অনেকেই তার ওপর অভিযোগ তুলেছেনÑ ‘জাতীয় সংগীত’কে অপমান করেছেন নোবেল। ইতোমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় চলছে। এসব মন্তব্যই শেষ নয়; অনেকে এর জন্য নোবেলকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন। বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে তার বিচারও দাবি করেছেন কেউ কেউ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছেÑ নোবেল কি আবেগের বশে নাকি অন্য দেশবিদ্বেষীদের এজেন্ট হয়ে এমন সময়ে এমন একটি বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন, তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা দরকার আছে বলে অনেকেই মনে করেন। আবার কেউ কেউ বলেন, “নোবেলের বাবা একজন আওয়ামী লীগার তার ছেলে হয়ে নোবেল এমন কথা বলা মোটেই উচিত হয়নি।” তবে এ কথাও মানতে হবে, বাবা আওয়ামী লীগ হলেই যে, ছেলে পাকিপন্থি হবে না, এর কোনো যুক্তি নেই!

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট

"