মুক্তমত

দুর্নীতিরোধে মানবীয় গুণাবলি

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

সতীর্থ রহমান

বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে দুর্নীতি শব্দের অর্থ লেখা হয়েছেÑ নীতিবিরুদ্ধ, কুনীতি, অসদাচরণ। যারা নীতিবিরুদ্ধ আচরণ করেন তারা দুর্নীতিপরায়ণ বা দুরাত্মা। নীতিভ্রষ্ট মানুষ দুর্নীতিবাজ হয়। এরা সমাজবিরোধী, মানবতার শক্র। অন্যদিকে মানবীয় শব্দের অর্থ হলো মনুষ্যোচিত; মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক। মানবতা মানে মানুষের গুণ, মনুষ্যধর্ম, মনুষ্যত্ব, মানবের ভাব, যঁসধহরঃু। স্বামী বিবেকানন্দের মতে, তাদেরই মহাত্মা বলি, যাদের হৃদয় থেকে গরিবদের জন্য রক্তমোক্ষণ হয়, তা না হলে সে দুরাত্মা। ‘নীতি’ শব্দের পূর্বে ‘দুঃ’ উপসর্গ যুক্ত হয়ে দুর্নীতি শব্দটি গঠিত হয়েছে। এর অর্থ নীতির খেলাপ। যা অন্যায়, অনিয়ম তাই দুর্নীতি। যা করা উচিত, যা করা দরকার, যা ন্যায়সংগত এর বিপরীতই দুর্নীতি। সুদূর প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সভ্য সমাজেও অন্যায় ও দুর্নীতি বন্ধ হয়নি বরং দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশের সমাজ জীবনের পরতে পরতে আজ দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। দুর্নীতির বিষবাষ্প আজ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় এমনকি ব্যক্তি জীবনকেও গ্রাস করছে।

মানুষের পরিচয় তার মনুষ্যত্বে। বিবেক ও বুদ্ধি আছে বলেই মানুষ অন্যান্য প্রাণী হতে শ্রেষ্ঠ। বিবেক ও বুদ্ধির বিকাশ সাধনের মাধ্যমে মানবজাতি প্রতিষ্ঠা ও উন্নতি লাভ করতে পারে। পশুবল ও অর্থবল দ্বারা উন্নতি সম্ভব নয়। জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের গুণেই মানুষ যুগে যুগে পৃথিবীতে অক্ষয় কীর্তি স্থাপন করে গেছেন। বিধাতা মানুষকে দোষ-গুণে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের মধ্যে পাশাপাশি অবস্থান করছে প্রেম-ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা এবং হিংসা-বিদ্বেষ। সুনীতি ও দুর্নীতি দুটোই মানুষের মধ্যে রয়েছে। দুর্নীতি যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে; তখনি মানুষ পরিণত হয় অমানুষে। আর দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের সমাজ হয়ে যায় বসবাসের অযোগ্য। সমাজবিজ্ঞানীদের অভিমত, সমগ্র পৃথিবীতে আজ চারটি ব্যাধি প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রথম ব্যাধিÑ মানুষ মানুষকে অবিশ্বাস করে। দ্বিতীয় ব্যাধিÑ সুস্থ জীবন দর্শনের অভাব। তৃতীয় ব্যাধিÑ অন্তর জীবনে অসংখ্য বাধা। চতুর্থ ব্যাধিÑ স্বাধীন চিন্তার অভাব। সূত্র : অর্ঘ্য। আমাদের মনে রাখতে হবে অনুদার গণতন্ত্র আমরা চাই না। মাস্তানি গণতন্ত্র আমরা চাই না। গণতন্ত্রে অন্যায় চাপ প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। গণতন্ত্রে দ্বিমত থাকবেই। যেখানেই উদার গণতন্ত্র সচল থাকে, সেখানেই সুন্দর দেশ গড়ে ওঠে। আর প্রকৃত উদার গণতন্ত্র কায়েম হলেই টেকসই মানবিক উন্নয়নের ধারা সূচিত হবে। এই ধারার শক্ত ভিত্তি তৈরির প্রক্রিয়ায় তরুণ সমাজের অবদান হতে হবে মুখ্য।

হিন্দুধর্মীয় মহাপুরুষ এবং দার্শনিক স্বামী বিবেকানন্দ পত্রাবলিতে উল্লেখ করেন। পত্রাবলি ১. রাজনীতিক ও সামাজিক পরিবর্তন যতই হউক না কেন, মনুষ্য জীবনের দুঃখ-কষ্ট কিছুতেই দূর হইবে না। কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতি বিধান করিতে পারিলেই সর্বপ্রকার দুঃখ-কষ্ট ঘুচিবে। যতই শক্তি প্রয়োগ, যতই শাসন প্রণালির পরিবর্তন, যতই আইনের কড়াকড়ি করো না কেন, কোনো জাতির অবস্থার পরিবর্তন করিতে পারিবে না। আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষাই কেবল অসৎ প্রবৃত্তি পরিবর্তিত করিয়া জাতিকে সৎপথে চালিত করিতে পারে। যে সমাজ বা যে জাতি আধ্যাত্মিকভাবে যত অগ্রসর, সে সমাজ ও সে জাতি তত সভ্য। নানা কল-কারখানা করিয়া ঐহিক জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি করিতে পারিলেই যে জাতি বিশেষ সভ্য হইয়াছে, তাহা বলা চলে না। বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতা লোকের হাহাকার ও অভাবই দিন দিন বৃদ্ধি করিয়া দিতেছে।

২. ধর্ম একটি ইতিবাচক (চড়ংরঃরাব) ব্যাপার, নেতিবাচক নয়; যোগের ব্যাপার, বিয়োগের নয়। ধর্ম অনুরাগে, বাহ্য অনুষ্ঠানে নয়। হৃদয়ের পবিত্র অকপট প্রেমই ধর্ম। যা উন্নতির বিঘœ করে বা পতনের সহায়তা করে, তাই পাপ বা অধর্ম; আর যা উন্নত ও সমন্বয় ভাবাপন্ন হওয়ার সাহায্য করে, তাই ধর্ম। যদি দেহমন শুদ্ধ না হয়, তবে মন্দিরে গিয়ে শিবপূজা করা বৃথা। যাদের দেহমন পবিত্র, শিব তাদেরই প্রার্থনা শোনেন। আর যারা অশুদ্ধচিত্ত হয়েও অপরকে ধর্মশিক্ষা দিতে যায়, তারা অসৎ্গতি প্রাপ্ত হয়। বাহ্যপূজা মানসপূজার বহিরঙ্গ মাত্র, মানসপূজা ও চিত্তশুদ্ধিই আসল জিনিস, এগুলি না থাকলে বাহ্যপূজায় কোনো ফল হয় না। নীতিপরায়ণতা ও সাহস ব্যতীত কোনো ধর্ম নেই। এ ব্যতীত ধর্মের আর কোনো মতামত তোমাদের জন্য নয়। যেন কাপুরুষতা, পাপ, অসদাচরণ ও দুর্বলতা একদম না থাকে, বাকি আপনাআপনি আসবে। পাঁচজনে মিলে কোনো কাজ করা আমাদের স্বভাব আদতেই নয়। এজন্যই আমাদের দুর্দশা। ঐব যিড় শহড়ংি যড়ি ঃড় ড়নবু, শহড়ংি যড়ি ঃড় পড়সসধহফ, ষবধৎহ ড়নবফরবহপব ভরৎংঃ. অর্থাৎ যিনি হুকুম তামিল করতে জানেন, তিনি হুকুম করতে জানেন, প্রথমে আজ্ঞাবহতা শিক্ষা করো। বসে বসে রাজভোগ খাওয়ায়, আর ‘হে প্রভু রামকৃষ্ণ’ বলায় কোনো ফল নেই, যদি কিছু গরিবদের উপকার করিতে না পারো। মধ্যে মধ্যে অন্য অন্য গ্রামে যাও, উপদেশ করো, বিদ্যা শিক্ষা দাও। কর্ম, উপাসনা, জ্ঞানÑ এই কর্ম করো, তবে চিত্তশুদ্ধি হইবে, নতুবা সব ভস্মে ঘৃত ঢালার ন্যায় নিষ্ফল হইবে।

৩. এসো, মানুষ হও। প্রথমে দুষ্ট পুরুতগুলোকে দূর করে দাও। কারণ এই মস্তিষ্কহীন লোকগুলো কখনো শুধরাবে না। তাদের হৃদয়ের কখনো প্রসার হবে না। শত শত শতাব্দীর কুসংস্কার ও অত্যাচারের ফলে তাদের উদ্ভব; আগে তাদের নির্মূল করো। এস, মানুষ হও। নিজেদের সংকীর্ণ গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে বাইরে গিয়ে দেখো, সব জাতি কেমন উন্নতির পথে চলেছে। তোমরা কি মানুষকে ভালোবাস? তোমরা কি দেশকে ভালোবাস? তা হলে এস, আমরা ভালো হওয়ার জন্য, উন্নত হওয়ার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করি। পেছনে চেও না, অতিপ্রিয় আত্মীয়স্বজন কাঁদুক; পেছনে চেও না, সামনে এগিয়ে যাও।... মনে রেখো, মানুষ চাই, পশু নয়। ভারতবর্ষে তিনজন লোকও পাঁচ মিনিট কাল একসঙ্গে মিলিয়া মিশিয়া কাজ করিতে পারে না। প্রত্যেকেই ক্ষমতার জন্য কলহ করিতে শুরু করে। ফলে সমগ্র প্রতিষ্ঠানটিই দুরবস্থায় পতিত হয়। হায় ভগবান! কবে আমরা হিংসা না করিবার শিক্ষা লাভ করিব!

৪. কপট, হিংসুক, দাসভাবাপন্ন, কাপুরুষ, যারা কেবল জড়ে বিশ্বাসী, তারা কখনো কিছু করতে পারে না। ঈর্ষাই আমাদের দাসসুলভ জাতীয় চরিত্রের কলঙ্গস্বরূপ। ঈর্ষা থাকলে সর্বশক্তি মান ভগবানও কিছু করে উঠতে পারেন না। সর্বপ্রকার বিস্তারই জীবন, সর্বপ্রকার সংকীর্ণতাই মৃত্যু। যেখানে প্রেম, সেখানেই বিস্তার; যেখানে স্বার্থপরতা, সেখানেই সংকোচ। অতএব প্রেমই জীবনের একমাত্র বিধান। যিনি প্রেমিক, তিনিই জীবিত; যিনি স্বার্থপর, তিনি মরণোন্মুখ। অতএব ভালোবাসার জন্য ভালোবাস। কারণ প্রেমই জীবনের একমাত্র নীতি, বাঁচিয়া থাকার জন্য যেমন নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস। ইহাই নিষ্কাম প্রেম, কর্ম প্রভৃতির রহস্য। পরোপকারই জীবন, পরহিত চেষ্টার অভাবই মৃত্যু। শতকরা ৯০ জন নরপশুই মৃত, প্রেততুল্য, কারণ হে যুবকবৃন্দ, যাহার হৃদয়ে প্রেম নেই, সে মৃত ছাড়া আর কী?

বর্তমানে আমরা দুঃখের সঙ্গে উপলব্ধি করছি যে, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ঘিরে একটি অস্থির, অশুভ অমানবিক অবস্থা বিরাজ করছে। কালোটাকা আর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে রাষ্ট্র আজ হুমকির মুখে। ‘রাষ্ট্র ব্যক্তিকে গিলে খাচ্ছে’ হবস অবশ্য সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগেই রাষ্ট্রের ওই প্রবণতা আঁচ করেছিলেন এবং একে তুলনা করেছিলেন এক বিশাল তিমি লেভিয়াথানের (খবারধঃযধহ) সঙ্গে, যার পেটের মধ্যে আমরা। দুর্নীতি হয় যখন স্বচ্ছতা থাকে না, জবাবদিহি থাকে না। বাংলাদেশের উন্নতির পথে দুর্নীতি এখন প্রধান অন্তরায়। এমন কোনো সরকারি অফিস নেই, যেখানে অবৈধ অর্থের লেনদেন হয় না, টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে নাÑ এ যেমন এক অমোঘ সত্য, তেমনি সত্য মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তাদের এক বিরাট অংশ

দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার ব্যাপারটি। সামান্য বেতনে চাকরি করে রাতারাতি বিরাট বিল্ডিং আর ব্যাংক ব্যালান্সের মালিক হয়ে গেছেনÑ এমন সরকারি কর্মকর্তার নজির হাজারো। টিআইর ‘গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটার ২০০৫’ নামে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থা হচ্ছে রাজনৈতিক দল, এরপর রয়েছে পার্লামেন্ট, পুলিশ, বিচার ও আইন ব্যবস্থা। দুর্নীতি আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন নেতৃত্ব, ইচ্ছাশক্তি এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব।

লেখক : সহকারী শিক্ষক

নুনসাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দিনাজপুর

[email protected]

 

 

"