নিবন্ধ

ত্যাগই হচ্ছে সফলতার মূলমন্ত্র

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

জীবনে সফল হতে চান? তবে প্রথমেই আপনাকে ত্যাগ করতে হবে পরনির্ভরশীলতা। কারো ওপর প্রতিনিয়ত নির্ভরশীল হলে আপনার জীবনে কোনো কাজেই সফলতা আসবে না। প্রতিদিন আপনাকে গড়ে তুলতে হবে ভালো অভ্যাস; পরিত্যাগ করতে হবে মন্দ অভ্যাসগুলো। মন্দ অভ্যাস আপনার জীবনে নিয়ে আসবে শুধু হতাশা। ব্যক্তিজীবনের কিছু উন্নত বা ভালো অভ্যাস মানুষকে নিয়ে যায় সফলতার উচ্চ অবস্থানে। ভালো অভ্যাসগুলোর সংস্পর্শে এবং মন্দ অভ্যাসগুলো পরিত্যাগে আপনি একসময় হয়ে উঠবেন সমাজের সফল ও উন্নত মানুষরূপে। সফলতার জন্য আপনার প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়। এ ছাড়া সঠিক সময়ে সঠিক কাজের পরিকল্পনাও সফলতার চাবিকাঠি হিসেবে গণ্য। পরনির্ভরশীলতা ত্যাগ করে ভালো কাজগুলো করা আপনার জন্য কঠিন নয়। নিজেকে বদলে ফেলাও কঠিন কোনো কাজ নয়। প্রয়োজন উদ্যোগ ও পরিকল্পনা। সফলতার জন্য ন্যূনতম ৫টি বিষয় মাথায় রাখতে হবে

ত্যাগ করতে হবে পরনির্ভরশীলতা : বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের সাফিয়ান নামের এক ব্যক্তির পরিবারের লোকজন কর্মসূত্রে ইউরোপের বাসিন্দা। তার জীবনে যথেষ্ট সুযোগ এসেছে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার। কিন্তু পরিবারের লোকজন বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোর কারণে তিনি দেশে বসে বসে শুধু অন্ন গিলেই গেছেন। কোনো ধরনের টেনশন বা কাজ করার মানসিকতা তার মধ্যে ছিল না। তার কাজের মধ্যে একটি কাজই ছিল বাড়িতে বসে বসে অন্ন গেলা; আর মোটরবাইক নিয়ে পাড়াময় ঘুরে বেড়ানো। কেউ যদি তাকে কোনো দিন বলত, একটা চাকরি তো করতে পারেন। তখন তার উত্তর থাকত আমি কি দরিদ্র পরিবারের নাকি? পরের চাকরি কেন করব? গত কয়েক বছর আগে তার ওপর একাধিক মামলা হয়। এদিকে তার ভাই বিদেশে স্টোক করে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর থেকে তার ভাবি বিদেশ থেকে তাকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেন। প্রায় দুই মাস এ অবস্থায় ভালো চললেও এখন সাফিয়ানের করুণদশা। কেউ তাকে একটি টাকা দিয়েও সাহায্য করেন না। কোথাও কোনো চাকরিও পাচ্ছেন না। ব্যবসা করারও পুঁজি নেই তার। এখন তিনি ভাবছেন, আগে থেকে একটা কিছু করার চেষ্টা করলে হয়তো এ অবস্থায় উপনীত তাকে হতে হতো না। কিন্তু তার এ ভাবনা এখন আর কোনো কাজে আসছে না। সময় গেলে যে আর সাধন হয় নাÑ এ কথাটি এখন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন অসহায় সাফিয়ান।

সুন্দর আচার-ব্যবহার : কোনো ধরনের পুঁজি ছাড়াই ব্যবসায় হাত দিয়েছিলেন মুজিবুর রহমান রেনু নামের এক ব্যক্তি। এর আগে তিনি ছিলেন এক দোকানের কর্মচারী। সেখানে যেসব খদ্দের বা গ্রাহক আসতেন তাদের সঙ্গে তিনি অত্যন্ত সুন্দর আচার-ব্যবহার করতেন। কারো সঙ্গে তিনি হাসিমুখ ছাড়া রূঢ় আচরণ করতেনÑ এমন কথা তার শত্রুরাও বলতে পারবেন না। একসময় তিনি নিজেই ব্যবসার উদ্যোগ নেন। কিন্তু ব্যবসা করতে পুঁজির প্রয়োজন। কিন্তু তিনি যখন একটি ছোট দোকান-কোটা ভাড়া করলেন, তখন বিভিন্ন কোম্পানির লোকজন তার দোকানের সামনে ভিড় জমাতে শুরু করল। সবাই তাকে ওই কোম্পানির মালামাল দিয়ে সাহায্য করতে চান! একপর্যায়ে সপ্তাহের মধ্যে তার দোকানটি মালামালে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। প্রতিদিনের বিক্রি থেকে কোম্পানিগুলোকে কিছু কিছু টাকা শোধ করতে থাকেন। বর্তমানে তার দোকানে যে কয়েক কোটি টাকার পণ্য রয়েছে, তার পুরোটাই কোম্পানিগুলোর অবদান। আজ তিনি শূন্য থেকে কোটিপতি। তিনি তার দোকানে আগত খদ্দের বা গ্রাহক এলে তিনি বলতেন, ‘দোকানটি আপনাদের। আপনারা এখানে না এলে আমার পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে থাকতে হতো। আপনারা আসেন বলেই আপনাদের কাছে পণ্য বিক্রি করে এ বিক্রির লভ্যাংশ দিয়ে আমি পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখে-শান্তিতে আছি। তাই এ প্রতিষ্ঠানের মূল মালিক আপনারাই। আমি কেয়ারটেকার মাত্র।’ অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শূন্য পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করেছিলেন সোলপক। এখন শিকাগোয় কোটি কোটি ডলারের সরঞ্জাম বিক্রির ব্যবসা করেন। তিনি বলতেন, ‘খদ্দেরের সঙ্গে আমার ব্যবহারই আমার ক্যাপিটাল। আমি তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে অতিথির মতো ব্যবহার করি।’ এ থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয় ভালো ব্যবহার করলে সমাজের সর্বত্র আপনার জন্য সুসংবাদ অপেক্ষমাণ। তাই সফল হতে হলে আপনার আচার-ব্যবহার হতে হবে সুন্দর।

পরাজিত ভাববেন না নিজেকে : জীবনের সব খেলায় আপনি জিততে পারবেন না। জেতার মতো হারার জন্যও সব সময় প্রস্তুত রাখুন নিজেকে। মনে রাখতে হবে, জীবনের সর্বক্ষেত্রেই সাফল্য ও ব্যর্থতা পাশাপাশি অবস্থানে থাকে। কোথাও কোনো কাজে হেরে যাওয়া মানে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর হাতছানি। মনে রাখতে হবে, ‘পরাজয়ে ডরে না বীর’। পরাজিত মানসিকতা, বিপর্যস্ত মানসিকতার চেয়ে অনেক-অনেক-অনেক বেশি ক্ষতিকর। জীবনযাপন করবেন পরিকল্পনা মাথায় রেখে। আগামী বছর কী করবেন তার পরিকল্পনা করুন এ বছর। আগামী মাসে আপনার কাজ কী; সে পরিকল্পনা করুন এ মাসে। অথবা আজ রাতে ঘুমানোর আগেই সেরে ফেলুন আগামীকালের কাজের পরিকল্পনা। কোনো কাজে হাত দিয়ে ব্যর্থ হলে হতোদ্যম না হয়ে সে কাজ আবার শুরু করুন পূর্ণোদ্যমে। একটি কথা আছে, ‘যেখানে হারিয়েছি সেখানেই খুঁজে ফিরতে হয়।’ অর্থাৎ যেখানে বা যে কাজে আমি ব্যর্থ শুরু সেখানেই সফল হওয়ার উৎস খুঁজতে হবে।

বিখ্যাত লেখক মিল্টন যখন চোখের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলেন, তখন চিকিৎসক অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে মিল্টনকে জানালেন, তিনি তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলবেন। তার আর কোনো চিকিৎসা নেই। মিল্টন এতে হতোদ্যম হলেন না। তিনি অন্ধ হওয়ার আগেই তার মহাকাব্য ‘প্যারাডাইস লস্ট’ লিখে ফেলেন। তিনি হতোদ্যম হয়ে সব কিছু ছেড়ে বসে থাকেননি। ভাবেননি তিনি পরাজিত। বরং চোখের জ্যোতি নষ্ট হওয়ার আগেই তিনি তার মহাকাব্য লিখে শেষ করেছিলেন।

থাকুন সুযোগের অপেক্ষায় : ধরা যাক কোনো কারণে আপনি আজ বাইরে যাননি। অলস বসে রয়েছেন। এটা হতে পারে আপনার জন্য সুবর্ণ একটা সুযোগ। অলস এ সময়ে ভালো মানের একটা বই পড়তে পারেন। সন্তানদের উন্নত জীবন গড়নের পরামর্শও দিতে পারেন। এতে সন্তানরা মানসিকভাবে পরিপূর্ণ হয়ে গড়ে উঠবে।

মনকে করতে হবে সমৃদ্ধ : গরিব পরিবারে আপনার জন্ম হতেই পারে। তাতে আপনার কোনো হাত নেই। কিন্তু গরিব হিসেবে নিজেকে নিয়ে কুণ্ঠিত বোধ করা বা সব সময় ছোট হয়ে থাকা সফলতার ক্ষেত্রে বিরাট বড় বাধা। গরির ঘরে জন্ম নেওয়া অপরাধ নয়; অপরাধ হলো আপনার গরিব হয়ে থাকাটা। অর্থনৈতিকভাবে গরিব হলেও মনটাকে গড়ে তুলুন সমৃদ্ধ করে। সেটা ইচ্ছা করলেই পারেন আপনি। অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র হলেও ইচ্ছা করলেই আপনি মনের দিক থেকে ধনী হতে পারেন। সেজন্য সর্বপ্রথম যেটি প্রয়োজন; সেটি হলো মনের দরিদ্রতাকে ঝেটিয়ে বিদেয় করা। রাজার মতো বিলাসিতা না করতে পারেন, তবে রাজার মতো আচরণ করতে বাধা কোথায়!

লেখক : গণমাধ্যম কর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"