উদ্ভাবন

পাটপাতায় চা

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

বাংলাদেশের ১৬৪টি চা বাগানে প্রতি বছর গড়ে মোট চায়ের উৎপাদন হয় প্রায় ৮ কোটি কেজির মতো। অথচ দেশের মানুষ প্রতি বছর গড়ে ৮ কোটি ৭৫ লাখ কেজির অধিক চা পান করছে। এতে চায়ের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এ ঘাটতি পূরণে এখন চা আমদানি করতে হচ্ছে। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশ চা রফতানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতো। কিন্তু দেশে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ও আশানুরূপ উৎপাদন না হওয়ায় ঘাটতি পূরণে এখন আমদানি করতে হচ্ছে চা। বাংলাদেশ চা বোর্ডের হিসাব মতে, দেশে গত ১০ বছরে চা উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২ কোটি কেজি। এর বিপরীতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়েছে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ কেজি। বাড়তি চাহিদা মেটাতে এখন চা আমদানি করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় দেশে চা উৎপাদন বাড়াতে ১৫ বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ চা বোর্ড। আশার কথা হলো, চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে চা বোর্ড ও চা বাগানের পাশাপাশি অন্যভাবে চায়ের চাহিদা মেটাতে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা পাটের পাতা থেকে চা উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। এরই মধ্যে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাটের পাতা থেকে উদ্ভাবিত চা বাজারজাত ও রফতানি করার উদ্যোগ নিয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা ১৯৯৩ সালের শেষদিকে পাটের পাতা থেকে চা উদ্ভাবন নিয়ে প্রথম কাজ শুরু করেন। পাট পাতার গুণাগুণ এবং সেটা চা হিসেবে পান করার সময় যথাযথ থাকে কিনা এ নিয়ে তারা দীর্ঘদিন গবেষণা ও পর্যালোচনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা পুরো প্রক্রিয়াটি স¤পন্ন করেছেন। গবেষণা ও পর্যালোচনায় প্রমাণিত হয়েছে পাটের পাতা থেকে চা বানানো সম্ভব এবং চা বানানোর প্রক্রিয়া সহজসাধ্য। পাটের পাতা থেকে চা তৈরিতে পাট গাছে ফুল আসার আগেই গাছ থেকে কচি পাতা সংগ্রহ করতে হবে। পরে সে পাতা সূর্যের আলোতে শুকিয়ে সাইজ মতো গুঁড়ো করে নিতে হবে। পাতা শুকানোর পর সাধারণ চায়ের মতো চা বানিয়ে মধু বা চিনি দিয়ে এ চা পান করা যাবে। আবার মধু বা চিনি ছাড়াও পাটের পাতার চা পান করা যাবে। পাটশাকের যেসব ভেষজ গুণাগুণ রয়েছে সেসব গুণাগুণ পাট পাতা থেকে তৈরি হওয়া চায়েও থাকবে বলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার করার পরে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো একটি পরীক্ষা করে দেখেছেন তৈরি করা গুঁড়োদানায় কোনো ‘টক্সিক’ উপাদান রয়েছে কিনা।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, তোষা পাটের পাতা থেকে তৈরি করা চা হবে অত্যন্ত সুস্বাদু। তবে এ চা দুধ মিশিয়ে পান যাবে না। পাটের পাতা থেকে তৈরি করা চা হবে গ্রিন টির বিকল্প। এটি গুণাগুণের কারণে দ্রুতই দেশের মানুষের কাছে অধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা আশা করছেন। এরই মধ্যে পাটের পাতা দিয়ে তৈরি অর্গানিক চা রফতানি ও বাজারজাতকরণের উদ্যোগ নিয়েছে ‘ওয়ার্ছি অ্যাকুয়া অ্যাগ্রো টেক’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান। আপাতত তারা এ চায়ের নাম দিয়েছেন ‘মিরাকল অর্গানিক গ্রিন টি’। তবে এ নামটি এখনো চূড়ান্ত নয়। নাম চূড়ান্ত হবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্টের জন্য করা আবেদন অনুমোদনের পর। এরই মধ্যে ওয়ার্ছি অ্যাকুয়া এগ্রো টেক পাটের পাতা দিয়ে তৈরি ১৬ কেজি অর্গানিক চা জার্মানিতে পাঠিয়েছেন। এতে বিশাল সাড়া পাওয়া গেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আরো ২০০ কেজি চা জার্মানিতে পাঠানো হবে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রির জন্য ১০০ ও ৫০ গ্রামের দুটি প্যাকেট করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে যার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ গ্রামের প্যাকেট ১৫০ এবং ৫০ গ্রামের প্যাকেট ৯৯ টাকা। সেই হিসাবে মিরাকল অর্গানিক গ্রিন টি প্রতি কাপ চায়ের জন্য খরচ পড়বে এক টাকারও কম।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

"