নিবন্ধ

পরিবারই হোক প্রবীণের শান্তির নীড়

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

সন্তানের কাছে মানুষের বেশি কিছু চাওয়ার থাকে না। থাকে শেষ বয়সে আদরের সন্তানের পাশে থেকে সুখ-দুঃখ ভাগ করার ইচ্ছা। আর এ ইচ্ছা নিয়েই প্রতিটি মা-বাবা প্রহর গণনা করেন। কিন্তু অনেকেরই সেই সন্তানের কাছে আশ্রয় না হয়ে; আশ্রয় হয় আপনজনহীন বৃদ্ধাশ্রমে। শেষ বয়সে মস্ত ফ্ল্যাটের ঘরের কোণেও জনমদুঃখী মা-বাবার এতটুকুও জায়গা মিলে না। তবু প্রতিবাদ দানা বাঁধে না; মন অভিশাপ দেয় না। আজ যারা বৃদ্ধ তারা নিজেদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত বিনিয়োগ করেছিলেন সন্তানের জন্য, নিজের জন্য রাখেননি কিছুই। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের কাছ থেকে এর একটি ক্ষুদ্র অংশও তারা পাচ্ছেন না। কখনো দেখা যায় সন্তান তার নিজের পরিবারের খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে, তাই মা-বাবাকে মনে করছে বোঝা। এমনও দেখা যায়, সন্তানের অর্থের অভাব নেই; কিন্তু মা-বাবাকে নিজের কাছে রাখার প্রয়োজন মনে করছে না, বা বোঝা মনে করছে। হয় নিজেই পাঠিয়ে দিচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে, নয়তো অবহেলা দুর্ব্যবহার করে এমন অবস্থার সৃষ্টি করছে যেন তাদের মা-বাবা নিজেরাই সরে যান তাদের সাধের পরিবার থেকে। একবার বৃদ্ধনিবাসে পাঠাতে পারলেই যেন সব দায়মুক্তি। এভাবে নানা অজুহাতে মা-বাবাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক নামিদামি বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, চাকরিজীবী যারা একসময় খুব বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন, বৃদ্ধ বয়সে এসে নিজের সন্তানের মাধ্যমেই অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে বৃদ্ধাশ্রমের স্থায়ী বাসিন্দা হতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক সন্তান বা আত্মীয়স্বজন আর তাদের কোনো খবরও নেন না। তাদের দেখতে আসেন না।

এমনকি প্রয়োজনীয় টাকা-পয়সা বা জিনিসপত্রও পাঠান না। বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠানে বা ঈদের আনন্দের সময়ও মা-বাবাকে বাড়িতে নেন না। এমনও শোনা যায়, অনেকে বাবা বা মায়ের মৃত্যুশয্যায় বা মারা যাওয়ার পরও শেষবার দেখতে যান না। আমি যেমন সামাজিক মানুষ হিসেবে ‘সামাজিক’ শব্দটিকে ইতিবাচক দেখি, তেমনি আমি একটি সম্প্রদায়ের মানুষ তা অস্বীকার করি না। আমি সম্প্রদায়ের মানুষ বলেই আমি সাম্প্রদায়িক। অসাম্প্রদায়িক শব্দটি ইতিবাচক নয়। সমাজভুক্ত মানুষ যেমন সামাজিক, তেমনি সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ সাম্প্রদায়িক। এখানে সামাজিক মানুষের মতো সাম্প্রদায়িক মানুষ। অসামাজিক মানুষ যেমন ভালো নয়, তেমনি অসাম্প্রদায়িক মানুষকে ইতিবাচক অর্থে দেখার সুযোগ নেই। বরং নিজের সমাজের প্রতি যার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আছে তারা অন্য সমাজের ক্ষতি করতে পারে না; তদ্রƒপ নিজের সম্প্রদায়ের প্রতি সঠিক জ্ঞান নিয়ে যারা আছে, তারাও অন্য সম্প্রদায়কে অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারে না। যে বা যারা নিজ নিজ ধর্ম-কর্ম পালনের পাশাপাশি সব সম্প্রদায়কে সম্মান করে তাদের সু-সাম্প্রদায়িক বলা যায়। অতএব, আমাদের দেশে ‘সাম্প্রদায়িক’ এবং অসাম্প্রদায়িক শব্দের প্রচলিত যে ধারণা আছে, তা ঠিক নয়। সাম্প্রদায়িক ইতিবাচক শব্দ এবং অবশ্যই ‘অসাম্প্রদায়িক’ নেতিবাচক শব্দ। ‘সু-সাম্প্রদায়িক’ শব্দটি হচ্ছে সব সম্প্রদায় মিলে থাকার অর্থাৎ সব ধর্ম এবং বর্ণের মানুষের সহাবস্থানের ক্ষেত্রে উত্তম প্রয়োগ।

বৃদ্ধ কিংবা বৃদ্ধা আমাদের সমাজের সম্মানিত নাগরিক। এখন আমাদের শহরের ব্যস্ত জীবনে অনেক ছোট পরিবারে ছেলে বা মেয়ে এবং একই সঙ্গে পুত্রবধূ ও জামাতা সবাই সারা দিন ঘরের বাইরে কর্মব্যস্ত সময় কাটিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরেন। তাদের সন্তানরা আবার স্কুল-কলেজ এবং কোচিং সেন্টারে দিনের পুরো সময় কাটায়। এমন পরিস্থিতি যে পরিবারের সেখানে দাদা, দাদি বা নানা, নানি ঘরের ভেতর সারা দিন একাই থাকেন। বৃদ্ধকালে এমনিতেই নানা রকম শারীরিক অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। কাজেই একা থাকা মোটেই নিরাপদ নয়। এ ছাড়া একাকিত্ব নানা রকম হতাশার জন্ম দেয়। তাই যেখানে একান্ত প্রয়োজন দেখা দেয়, সেখানে একা না থেকে কোনো হোস্টেলে আরো অনেক মানুষের সঙ্গে ওই সময় কাটালে মন্দ হয় না। নিশ্চয় ওই ধরনের আবাসিক ব্যবস্থায় সঠিক যতেœর আয়োজন থাকবে এবং একাকিত্বের পরিবর্তে বন্ধু জুটবে কথা বলার। নিজের বাসায় বন্দি জীবন কাটানোর চেয়ে বৃদ্ধালয়ে আরো অনেকের সঙ্গে সময় কাটানো ইতিবাচক। হ্যাঁ, অস্বীকার করার উপায় নেই, অধিক আয়-রোজগারে ব্যস্ত না হয়ে বয়স্ক মা-বাবা কিংবা শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি মনোযোগী হওয়া অতি উত্তম এবং এটাই মানবিক। মা-বাবা বৃদ্ধ হলে ছেলে অথবা মেয়ের সান্নিধ্যে থাকা সবচেয়ে সুন্দর। কষ্ট হলেও এমনটিই মহত্তম সহাবস্থান। তাই প্রয়োজনে মানবিক মানুষের তত্ত্বাবধানে বৃদ্ধালয় হতেই পারে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রকে বৃদ্ধ+আশ্রম=বৃদ্ধাশ্রম বলা যায় না; বরং আলয় অর্থ হচ্ছে আবাস অর্থাৎ বসবাসের ঘর বা স্থান।

সেই অর্থে, এখানে আমাদের যারা বয়সকালে প্রায় সমবয়সি অন্যান্য বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার সঙ্গে মনের কথা বলে এবং আশ্রয়কেন্দ্রের পরিচালকের তত্ত্বাবধানে কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে জীবনযাপন করতেই হয়, তাদের এমন আবাসিক হল বা গৃহকে বৃদ্ধাশ্রম না বলে বরং বৃদ্ধ কিংবা বৃদ্ধা+আলয়=বৃদ্ধালয় বললেই সঠিক বলা হবে। সাম্প্রদায়িক; ‘অসাম্প্রদায়িক’, বৃদ্ধাশ্রম’ ইত্যাদি শব্দের গভীর অর্থ খুঁজে প্রয়োগ করতে হবে। হ্যাঁ, অবশ্যই এ কাজটি গবেষণার দাবি রাখে। আসল কথা হচ্ছে যেনতেন শব্দ প্রয়োগে যাচ্ছেতাই বোঝা উচিত নয়। একটা কিছু বলা হয়ে গেছে বলেই যে আমাকে সেটাই মেনে নিতে হবে, এটা কোনো শুভ লক্ষণ নয়। চিন্তা করতে হবে। আমাদের বাংলা ভাষার শব্দের ব্যবহার ঠিক জায়গায় করার ক্ষেত্রে আরো সচেতন হতে হবে। আমরা জানি এবং পেয়েছি বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধানে আছে একটি শব্দ ‘আশ্রম’, যার বহুল প্রচলিত অর্থ : সংসারত্যাগী সাধু-সন্যাসীদের বাসস্থান, সাধনা বা শাস্ত্রচর্চার জন্য নির্দিষ্ট স্থান; মঠ; আস্তানা; আখড়া; হিন্দু শাস্ত্রোক্ত জীবনকালের চতুর্বিধ অবস্থা-ব্রহ্মাচর্য; গার্হস্থ্য; বানপ্রস্থ ও সন্যাস। আরো অনেক অর্থ প্রকাশিত আছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশে অসহায় বৃদ্ধ নারী-পুরুষের জন্য যে আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, সেগুলোকে আশ্রম বলার সুযোগ নেই। কারণ; আমাদের দেশের অসহায় বৃদ্ধ কিংবা বৃদ্ধা যারা সন্তানদের নানা ব্যস্ততার কারণে একা থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, তারা একাকিত্ব ঘুচিয়ে চলতে অনেকে মিলে সময় কাটানোর জন্য একটা সেবাকেন্দ্রে বা আশ্রয়কেন্দ্রে যান। সেখানে ঢালাওভাবে কোনো সংসারত্যাগী সাধু-সন্যাসী হয়ে জীবন কাটাতে যান না।

এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের শতকরা ৮৮ ভাগ প্রবীণেরই কোনো না কোনো সন্তান বাইরে থাকে। অর্থাৎ এদের সঙ্গে বাবা-মায়ের যোগাযোগ খুব কম হয়। এতে করে বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা আর্থ-সামাজিক সমস্যায় ভোগেন। বাংলাদেশে শতকরা ২০ জন হয় একাকী থাকেন অথবা স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে থাকেন। বর্তমান সরকার প্রবীণদের জন্য বয়স্ক ভাতা চালু করেছে। এ কার্যক্রমের আওতায় ১৭ লাখ দরিদ্র প্রবীণ সাহায্য পাচ্ছে। এ ছাড়া সহায়-সম্বলহীন প্রবীণদের জন্য সরকার ৬টি বিভাগে ৬টি বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছে। বেসরকারি পর্যায়ে বৃদ্ধাশ্রম চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা মনে করি, আজ যিনি সন্তান, তিনিই আগামী দিনের বাবা কিংবা মা। বৃদ্ধ বয়সে এসে মা-বাবারা যেহেতু শিশুদের মতো কোমলমতি হয়ে যায়, তাই তাদের জন্য সুন্দর জীবনযাত্রার পরিবেশ তৈরি করাই সন্তানের কর্তব্য। আর যেন কখনো কোনো বাবা-মায়ের ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। উল্লেখ্য, বাবা-মা একসময় নিজে না খেয়ে সন্তানকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন, তারা আজ কোথায়, কেমন আছেন, সেই খবর নেওয়ার সময় যার নেই, তার নিজের সন্তানও হয়তো এক দিন তার সঙ্গে এমনই আচরণ করবে। আমাদের মনে রাখা উচিতÑ আজ যিনি সন্তান, তিনিই আগামী দিনের বাবা কিংবা মা। বৃদ্ধ বয়সে এসে মা-বাবারা যেহেতু শিশুদের মতো কোমলমতি হয়ে যায়, তাই তাদের জন্য সুন্দর জীবনযাত্রার পরিবেশ তৈরি করাই সন্তানের কর্তব্য। কোনো বাবা-মায়ের ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম যাতে না হয়, সে ব্যাপারে আমাদের দায়িত্বশীল ও আন্তরিক হতে হবে। প্রত্যেক বাবা-মায়ের জন্য তৈরি করতে হবে একটি নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"